মালয়েশিয়া
বিদেশি কর্মীদের জন্য কঠোর নিয়ম, দক্ষ জনশক্তি হারানোর শঙ্কা
মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয়দের কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং আয় বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নিয়ে নতুন নীতি আনতে যাচ্ছে দেশটির সরকার। তবে এই সিদ্ধান্তে দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে আল জাজিরা জানিয়েছে, মালয়েশিয়া সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী জুন থেকে বিদেশি কর্মীদের ভিসা পেতে ন্যূনতম বেতনের সীমা প্রায় দ্বিগুণ করা হবে। পাশাপাশি তাদের থাকার মেয়াদ ৫ বা ১০ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হবে।
ভারতের একজন ব্যবসা পরামর্শক সঞ্জিত (ছদ্মনাম), যিনি এক দশকের বেশি সময় ধরে মালয়েশিয়ায় কাজ করছেন, দেশটিকে নিজের বাড়ির মতো মনে করতেন। কিন্তু নতুন নীতির কারণে তার মতো হাজারো প্রবাসীর ভবিষ্যৎ এখন প্রশ্নের মুখে।
বিদেশি কর্মীদের ভিসা পেতে ন্যূনতম বেতন প্রায় দ্বিগুণ করা হবে। একই কর্মীর ভিসা স্পনসর করার সময়সীমা সীমিত করা হবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যেমন বাড়ি বা গাড়ি কেনা, নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
স্বাধীনতার পর থেকে মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে এবং বহু বছর ধরেই বিদেশি শ্রমিকদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য।
বর্তমানে প্রায় ২১ লাখ নথিভুক্ত বিদেশি শ্রমিক দেশটিতে কাজ করছেন। এদের বেশিরভাগই স্বল্প মজুরির শারীরিক শ্রমে নিয়োজিত। প্রায় ১.৪ লাখ উচ্চ বেতনের প্রবাসী পেশাজীবী অর্থনীতি ও কর খাতে বড় অবদান রাখছেন।
২০২৫ সালের জাতীয় নীতি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, স্বল্প দক্ষ বিদেশি শ্রমিকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা প্রযুক্তি গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে এবং উৎপাদনশীলতা কমাচ্ছে।
২০২৪ সালে কর্মক্ষেত্রে বিদেশিদের অংশ ১৪.১% থেকে কমিয়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে ৫% এ নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিন ধরনের কর্মসংস্থান ভিসার জন্য নতুন ন্যূনতম মাসিক বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে: ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার রিঙ্গিত, ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার রিঙ্গিত, ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার রিঙ্গিত।
এছাড়া, ৫ বা ১০ বছরের বেশি একজন বিদেশি কর্মীকে রাখা যাবে না এবং পরে স্থানীয় কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা থাকতে হবে।
এদিকে হঠাৎ এই পরিবর্তনে বিস্মিত ও উদ্বিগ্ন অনেক প্রবাসী।
যুক্তরাজ্যের থমাস মিড বলেন, বেতনের এই বড় বৃদ্ধি ‘অপ্রত্যাশিত ধাক্কা’। সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগকারী ডগলাস গ্যান মনে করেন, এতে কোম্পানির খরচ বাড়বে এবং বিদেশি দক্ষ কর্মী আনা কঠিন হবে।
ইন্দোনেশিয়ার লিওনার্দো জানান, নতুন নিয়মে তার ভিসার মান কমে যেতে পারে, ফলে পরিবার নিয়ে স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনা অনিশ্চিত।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু বিদেশি কর্মী কমালেই হবে না, স্থানীয়দের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।
দক্ষ জনশক্তি না থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয়দের নিয়োগ দিতে পারবে না। নতুন নীতির সুফল নির্ভর করবে প্রশিক্ষণ ও শিল্প উন্নয়নের ওপর।
ভিন্নমতও রয়েছে। কিছু মানুষ এই উদ্যোগকে সমর্থন করছেন। যুক্তরাজ্যের জোশুয়া ওয়েবলি মনে করেন, দক্ষ কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়া এখনও আকর্ষণীয় থাকবে।
তবে সঞ্জিতের মতো অনেকে বলছেন, যদি নীতিগুলো বাস্তবসম্মত না হয়, তাহলে তারা ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডসহ অন্য দেশে চলে যাওয়ার কথা ভাবতে পারেন।
মালয়েশিয়ার এই নতুন নীতি স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে দক্ষ বিদেশি কর্মী হারানোর ঝুঁকিও তৈরি করেছে।
এসএইচএস