সংসদে ঝড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস?

মোস্তফা হোসেইন
মোস্তফা হোসেইন মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত: ১০:০৬ এএম, ০৭ মার্চ ২০২৬

আগামী সংসদ হবে উত্তপ্ত কড়াই। সেই কড়াইয়ে তেল ঢালার মানুষগুলো প্রস্তুত। ক্ষেত্র ও উপলক্ষ্যের ঘাটতি নেই। এই মুহূর্তে প্রাক উত্তাপ ছড়ানোটাও স্পষ্টই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কয়েকদিন আগে একটি দৈনিক পত্রিকায় রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী দল এনসিপি আওয়াজ তুলেছে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব আনতে হবে সংসদের প্রথম অধিবেসনেই। এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সাংবাদিক সম্মেলন মাধ্যমে দাবি করলেন,‘কোনোভাবেই বর্তমান রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হতে পারে না। যদি এটা হয়, আমরা জনগণের পক্ষ থেকে ৩০০ (২৯৯) জন সংসদ সদস্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করব এবং ৩০০ জনকেই এর জবাব দিতে হবে।’

আসিফ মাহমুদের এই বক্তব্য থেকে প্রশ্ন আসে সংসদের শুরুতে এমনকি বছরের প্রথম অধিবেশনে যে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার সাংবিধানিক বিধান আছে এবং এটা বাংলাদেশের সাংবিধানিক রেওয়াজও- তার কী হবে? আসিফ মাহমুদের একই সাংবাদিক সম্মেলনের আরেকটি বক্তব্য এখানে স্মরণযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘প্রকৃত অর্থে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে বর্তমান সংবিধান ছুড়ে ফেলা হবে।’ তার মানে তারা এখনও মনে করেন, বর্তমান সংসদ নির্বাচন ও সরকার গঠন হয়েছে সংবিধানকে ছুড়ে ফেলার মাধ্যমে কিংবা সংবিধান বহির্ভূতভাবে। কিন্তু তাদের দল ও জোটের নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ সংবিধানের আলোকেই শপথ গ্রহণ করেছেন।সংবিধানকে সমুন্নত রাখার কথা অঙ্গীকারও করেছেন।

প্রাসঙ্গিকভাবে এনসিপি এবং তাদের ১১ দলীয় জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়টি শপথ অনুষ্ঠানের সময় থেকেই জোরালোভাবে বলে আসছেন। তাদের কথা সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়াটা জুলাই সনদের সঙ্গে বেইমানি করা। প্রকারান্তরে তারা বলছেন, বর্তমান সংসদও জুলাই সনদের আওতায় নির্বাচিত হয়েছে। যা সরকারি দল বিএনপি মানতে নারাজ। তারা আগোগোড়া বলে আসছে-সংবিধানকে রক্ষা করা, সংবিধানকে মান্য করার কথা। তাদের এই বক্তব্যকে অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে মনে করে এনসিপি।

বিএনপির সামনে আওয়ামী লীগকে উজ্জীবিত করার কৌশলটা কার্যকর হবে বেশি। কারণ আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে এলে তারা জুলাই সনদের নামে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতাকে ঠেকানোর চেষ্টা করবে। একইসঙ্গে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধের আদেশও বাতিলের চেষ্টা করতে পারে। তবে অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, বিএনপি হয়তো একটু নরম হওয়ার দিকেই যাবে। হয়তো আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সুযোগ দেওয়া পর্যন্ত তারা ছাড় দিতে পারে। যার পেছনে তাদের ভাবনা হতে পারে- জামায়াতকে মোকাবিলা করা।

টানাপড়েন শুধু তাই নয় এনসিপি বিএনপিকে দোষারোপ করছে, তারা সংস্কার প্রস্তাবকে সুবিধা অনুযায়ী ব্যবহার করছে বলে। যেমন বিএনপি যখন ডেপুটি স্পিকারের নাম প্রস্তাবের জন্য জামায়াতে ইসলামীকে প্রস্তাব করেছে সেটাও তারা সরলভাবে গ্রহণ করেনি। তাদের কথা সংস্কার প্রস্তাবে এটা বলা ছিলো। তাই বিএনপিকে পুরোপুরিভাবে সংস্কার প্রস্তাব মানতে হবে এবং ইচ্ছামতো পথ গ্রহণ করা বিএনপির জন্য অনুচিত। বিএনপির কথা-এটা সংস্কার প্রস্তাবে যেমন আছে তেমনি তাদের নির্বাচনি ইশতেহারেও আছে। সুতরাং জামায়াতে ইসলামী যদি ডেপুটি স্পিকারের পদে নাম প্রস্তাব করে তাহলে বিএনপির ইশতেহার যেমন মানা হবে তেমনি সংস্কার প্রস্তাবেরও মানা হয়ে যায়। সুতরাং বিএনপি যদি বলে জুলাই সনদ নয় আমরা আমাদের ইশতেহার বাস্তবায়ন করছি, তাহলে কি ব্যত্যয় হবে?

এমন আরও কিছু বিষয় নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের টানাপোড়েন চলাকালে ৩ মার্চ নতুন করে ইস্যু তৈরি হয়েছে উচ্চ আদালতে দায়ের করা দুটি রিট পিটিশন। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোট আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে ইতোমধ্যে রিট পিটিশন করেছেন দুইজন আইনজীবী। আমার মনে হয়, এই ঘটনাটি সংসদীয় সাইক্লোনের সতর্ক সংকেত হিসেবে সহজেই গণ্য হতে পারে। আর এ নিয়ে যেভাবে এনসিপি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তাকে ঝড়ের তাণ্ডবের পূর্বাভাস বলতে হবে।

কারণ সংসদ অধিবেশনের শুরুতে এনসিপি জামায়াত জোট যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্যদের শপথ নেয়ার বাধ্যবাধকতা কিংবা রাষ্ট্রপতিকে অবৈধ গণ্য করে অভিশংসন আনার চেষ্টা করে তখন এই রিট বড় রকমের বাধা হিসেবে দেখা দেবে। সরকারি দল সহজেই সংসদে বলার সুযোগ পাবে, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। সুতরাং বিচারাধীন বিষয়ে আলোচনার সুযোগ নেই। এই ঘোষণা দিয়ে তারা আলোচনা বন্ধ করে দিতে পারে।

অন্যদিকে বিরোধী দল গণভোট সংবিধান সংস্কার বিষয়ে বিতর্কিত জুলাই সনদকে পথনির্দেশক হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে। যার মানে হচ্ছে সংসদে স্পষ্টত দুটি ভিন্ন মত ও পথের দেখা মিলবে প্রথম অধিবেশন থেকেই। এই মুহূর্তে দুই পক্ষের দুটি পথ সমান্তরালে চলবে বলে মনে হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবাদ সংসদ থেকে রাজপথে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়লো।

জুলাই সনদ নিয়ে এই কাজিয়া যখন সংসদ ও রাজপথকে উত্তপ্ত করবে, তখন বিএনপিকে সামাল দিতে হবে দুই স্থানেই। এরমধ্যে শুধু রাজনীতিই নয় ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশের অর্থনীতি, জননিরাপত্তার বেহাল দশা বানিয়ে দিয়ে গেছে তাও সামাল দিতে হবে বিএনপিকেই। ড. মুহাম্মদ ইউনূস এর দেশকে ফোকলা বানানোর অবস্থান পরিবর্তন করতে হলে যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন সেই স্থিতিশীলতাকে ধূলোয় মিশিয়ে দেওয়ার জন্য বিএনপির প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তি একাট্টা এখনই।

এরমধ্যে ইরান-ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির যে প্রভাব বাংলাদেশের জনজীবনে পড়বে তাও বর্তমান সরকারকে তটস্থ করে দেওয়ার মতো। সবদিক সামাল দিয়ে বিএনপির একার পক্ষে কি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে? এমন মনে করার কারণ নেই পাহাড় সমান সংসদীয় বিজয় তাদের তখনও শক্তি জোগাতে পারবে। সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের সামনে ছিলো স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। মানুষ জামায়াত ঠেকাও চিন্তা করে একতরফা ভোট দিয়েছে বিএনপিকে। শাসন ক্ষমতায় আসার পর সেই ভোটাররা যে অন্ধভাবে তাদের সমর্থন দেবে না এটাও ঠিক। তাহলে কি সেই জামায়াত শক্তিই কি আবার জনগণের কাতারে ঢুকে যাওয়ার সুযোগ পাবে? রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে বিরোধী দলের প্রতি সাধারণ মানুষের আকর্ষণ থাকে। সেই আকর্ষণ ডিঙ্গিয়ে বিএনপি কি নিজের ঘর সামাল দিতে পারবে?

পুরোটাই নির্ভর করবে বিএনপি কোন নীতিতে ভবিষ্যৎ রচনা করবে তার ওপর। এখনই তাদের ভাবতে হবে আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গটি। জামায়াত এনসিপি যতই আওয়ামী লীগের বিরোধিতাই করুক না কেন, প্রয়োজনে জামায়াত যদি নতুন মেরুকরণের কথা ভাবে তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এক্ষেত্রে হয়তো জামায়াত জোটে ভাঙন তৈরি হতে পারে। আর সেই কাজটি জামায়াত করতে পিছপা হবে না। তাদের ইতিহাস বলে তারা ক্ষমতার জন্য বিএনপিকে যেমন কাছে টানতে পারে তেমনি আওয়ামী লীগকে কাছে টানতে পারে। আবার একইভাবে বিপরীতে যেতে সময় নেয় না। আর লক্ষ্য অর্জনের জন্য তারা নিজেদের মৌলিকত্বকেও ছাড় দিতে নারাজ। এর প্রমাণ তারা অতীতে যেমন দিয়েছে এবার নির্বাচনের আগেও দিয়েছে।

সুতরাং এবার সংসদের ঝড় যে রাজনৈতিক নয়া মেরুকরণের দিকেও টেনে নেবে না তা হলফ করে বলা যায় না। আবার বিএনপি যদি আওয়ামী লীগকে কাছে টানতে চায় বিরোধী পক্ষ থেকে যে বাধার মুখে পড়তে হবে তা সামাল দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হবে কিনা তাও হয়তো চিন্তায় আসতে পারে। তবে বিএনপির সামনে আওয়ামী লীগকে উজ্জীবিত করার কৌশলটা কার্যকর হবে বেশি। কারণ আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে এলে তারা জুলাই সনদের নামে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতাকে ঠেকানোর চেষ্টা করবে। একইসঙ্গে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধের আদেশও বাতিলের চেষ্টা করতে পারে। তবে অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, বিএনপি হয়তো একটু নরম হওয়ার দিকেই যাবে। হয়তো আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সুযোগ দেওয়া পর্যন্ত তারা ছাড় দিতে পারে। যার পেছনে তাদের ভাবনা হতে পারে- জামায়াতকে মোকাবিলা করা।

সবশেষে বলা যায় জুলাই আন্দোলন পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি সরলপথে যাওয়াটা সন্দেহযুক্ত হয়েই থাকলো। জুলাই আন্দোলনে যাদের বিতাড়িত করা হয়েছে তারাও যে এখনও অপ্রাসঙ্গিক তা মুখ উচিয়ে বলার সুযোগ নেই। এই মুহূর্তে আন্দোলনকারীদের মত ও পথভিন্নতা এতটাই বেশি যে রাজনীতির গতিপথ সম্পর্কে আগাম আভাস দেওয়া কঠিন বৈকি।

লেখক : সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।

এইচআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।