চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ

চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগের নেপথ্যে কি?

আহসান হাবিব বরুন
আহসান হাবিব বরুন আহসান হাবিব বরুন , সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা
প্রকাশিত: ০২:৩০ পিএম, ০৫ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি এই বন্দর ঘিরেই। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বকে ঘিরে যে কোনো অনুসন্ধান কেবল ব্যক্তিগত বা প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি সরাসরি জাতীয় অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক আস্থার প্রশ্নটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

সম্প্রতি বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযোগ দাখিল করেছে। অভিযোগের দুইটি ভিত্তি সামনে এসেছে—প্রথমত, বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি)-এর এমডি হিসেবে জাহাজ ক্রয়ে অনিয়ম; দ্বিতীয়ত, কর্ণফুলী নদীতে ড্রেজিং–সংক্রান্ত দুর্নীতি। কিন্তু তথ্য ও সময়রেখা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে দুদকের এই অভিযোগ গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

দুদকের বক্তব্য—বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন বা বিএসসি-তে জাহাজ ক্রয়ের সময় অনিয়ম হয়েছে তাঁর দায়িত্বকালে। অথচ বাস্তব তথ্য বলছে, সংশ্লিষ্ট ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল তিনি বিএসসি ত্যাগ করার পর। অর্থাৎ যে সময়ের সিদ্ধান্ত, সে সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না। প্রশাসনিক নীতির একটি মৌলিক ভিত্তি হলো—দায়িত্ব যার, জবাবদিহি তার। এই নীতি উপেক্ষা করে কাউকে অভিযুক্ত করা হলে তা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

একইভাবে, কর্ণফুলী নদীতে ড্রেজিং–সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ ২০১৯ সালের ঘটনা। কিন্তু মনিরুজ্জামান চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে যোগ দেন ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। পাঁচ বছর আগের একটি ঘটনার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা প্রমাণের যুক্তিসংগত ভিত্তি কোথায়? সময় ও তথ্যের এই অসামঞ্জস্যতা অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে দেয়।

এখানে উল্লেখ্য যে এস এম মনিরুজ্জামান, বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে সারা জীবন অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে কখনো কোনো আর্থিক অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি। নৌবাহিনীর মতো শৃঙ্খলাবদ্ধ ও কঠোর মূল্যায়নব্যবস্থার প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে দায়িত্ব পালন মানেই বহুমাত্রিক সততা ও পেশাদারিত্বের স্বীকৃতি। এমন একটি পরিষ্কার ও অভিযোগমুক্ত ক্যারিয়ারের পর হঠাৎ করে সময়-অসামঞ্জস্যপূর্ণ অভিযোগ সামনে আসা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে জাতীয় অস্থিরতার সময় যখন বন্দর কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বন্দর কার্যক্রম স্থিতিশীল হয়। জাহাজের গড় অপেক্ষার সময় কমে আসে, সরবরাহচক্র সচল থাকে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বন্দর ৩২,৯৬,০৬৭ টিইইউ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করে নতুন রেকর্ড গড়ে। রাজস্ব আয় বেড়ে ৫,২২৭.৫৫ কোটি টাকা; উদ্বৃত্ত ২,৯১২.৬৯ কোটি টাকা। সদ্য সমাপ্ত বছরে লাভ ৩,১৪২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা—গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সরকারের কোষাগারে ভ্যাট ও কর-বহির্ভূত আয় হিসেবে জমা হয়েছে ১,৮০৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৫.৪১ শতাংশ বেশি।

এমন অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ সুনামের অধিকারী এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ পরিচালনায় ঈর্ষণীয়ভাবে সফল একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা অনেকের কাছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হওয়াই স্বাভাবিক।

দায়িত্ব নেওয়ার পর এসএম মনিরুজ্জামান ই-বিলিং, অনলাইন পেমেন্ট ও ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করেন। এতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমে এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মে আঘাত লাগে। যে সব গোষ্ঠী অনিয়ম থেকে সুবিধা পেত, তাদের স্বার্থে আঘাত লাগা অস্বাভাবিক নয়। ফলে একটি স্বার্থান্বেষী মহল অপসারণের পরিবেশ তৈরিতে সক্রিয়—এমন সন্দেহ উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

দুদকের সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই সংস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে অতীতে বহু প্রশ্ন উঠেছে। অনেক সময় অভিযোগ এসেছে, এটি রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থাকতে পারেনি।

এর একটি আলোচিত উদাহরণ হলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা। এটি ছিল একটি হাস্যকর ভিত্তিহীন মামলা। যেখানে বেগম খালেদা জিয়া এক টাকাও খরচ করেননি। তিনি কেবল এক একাউন্টের টাকা অন্য আরেকটি একাউন্টে স্থানান্তর করেছিলেন।

সমালোচকদের মতে, মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল এবং তিনি কারাভোগও করেছেন। পরবর্তীকালে আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি খালাস পান। এই ঘটনা দুদকের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় সৃষ্টি করে।

শুধু এই ঘটনাই নয়—দুদকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছে যে তারা গণহারে অনুসন্ধানপত্র পাঠায়, অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের প্রতি নমনীয় থাকে, আবার প্রভাবহীনদের ক্ষেত্রে কঠোর হয়। এমনকি সংস্থার কিছু কর্মকর্তা ঘুষ গ্রহণ করতে গিয়ে ধরা পড়ার ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এসব ঘটনা একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

দুর্নীতি নির্মূল করতে হলে প্রথমেই দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ করতে হবে। কর্মজীবনে যাদের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের অভিযোগ নেই—এমন সৎ ও নীতিবান ব্যক্তিদের দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করা জরুরি। তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, সময়রেখা যাচাই এবং প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দুদক নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাবে এবং প্রকৃত দুর্নীতিবাজরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাবে।

শেষ কথা:
এস এম মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সময়সীমা ও দায়িত্বকাল পরস্পর সাংঘর্ষিক। তাঁর দীর্ঘ সুনামের সামরিক ক্যারিয়ার, সংকটকালে কার্যকর নেতৃত্ব এবং বন্দরের দৃশ্যমান অগ্রগতি—সব মিলিয়ে দুদকের অভিযোগ মারাত্মকভাবে বিভ্রান্তিকর।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই লড়াই হতে হবে তথ্যনির্ভর, নিরপেক্ষ এবং ন্যায়সঙ্গত। অন্যথায় এটি রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত হাতিয়ারে পরিণত হবে—যা রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর।

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ভিত্তি। সেই ভিত্তিকে দুর্বল করার মতো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থার উচিত হবে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা এবং আইনের শাসনের প্রকৃত চর্চা নিশ্চিত করা। দুর্নীতির মূল উৎপাটন করতে হলে প্রথমেই দুর্নীতি দমন কমিশনকে সত্যিকার অর্থে দুর্নীতিমুক্ত ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]

এইচআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।