সংখ্যার ভিড়ে চাপা পড়া আর্তনাদ: শুধু শোক নয়, চাই প্রতিকার

শাহানা হুদা রঞ্জনা
শাহানা হুদা রঞ্জনা শাহানা হুদা রঞ্জনা
প্রকাশিত: ১১:০৭ এএম, ০১ এপ্রিল ২০২৬

গত কোরবানি ঈদ গ্রামের বাড়িতে করার পর দুপুরেই বের হয়েছিলাম ঢাকায় ফেরার জন্য। ঘর থেকে বেরিয়ে গ্রামের পথ ধরে সামান্য এগোনোর পরে দেখা গেলো কিছু মানুষের জটলা, তিনটা বাইক পড়ে আছে। বাইকের পাশে পড়ে আছে তিনটি মরদেহ, আহত তিনজন কাতরাচ্ছে। এরা বেরিয়েছিল মোটরসাইকেল রেস করতে। রাস্তা ফাঁকা পেয়ে অস্বাভাবিক স্পিড তোলার পরে ঘটে এই দুর্ঘটনা।

এরপর যখন আমাদের গাড়ি রংপুর-সৈয়দপুর সড়কে উঠলো, তখন গাড়ির স্পিডের কাঁটা ৩০-৪০ এ আটকে গেলো। রাস্তাজুড়ে অসংখ্য মোটরবাইক, অধিকাংশেরই তিন-চারজন করে যাত্রী এবং অসম্ভব জোরে স্পিড তুলে ছুটছে তারা। এর মধ্যেই সেলফি তোলা হচ্ছে, গান বাজছে, কেউ কেউ পথের পাশে দাঁড়িয়ে টিকটকও করছেন। আমরা নিজেদের জান নিয়ে ভয়ে ভয়ে ওই রাস্তা থেকে বের হয়ে এলাম।

আরেকবার ঈদের পরে ভাড়া মাইক্রো নিয়ে শ্রীমঙ্গল যাচ্ছিলাম। আমি চালকের পেছনের আসনে। যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পরে লুকিং গ্লাসের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করলাম চালকের চোখ ঘুমে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমরা তাকে গাড়ি থামিয়ে চা, পানি, পান খেতে অনুরোধ করলাম। বললাম কেন ঠিকমতো না ঘুমিয়ে সকালে গাড়ি নিয়ে বের হলেন? চালককের জবাব শুনে তব্দা খেয়ে গেলাম। উনি নাকি গত ৪-৫ দিন টানা গাড়ি চালাচ্ছেন ঈদ উপলক্ষে। কী একটা অসম্ভব ব্যাপার। এখন তাকে চালাতে দেওয়া ছাড়া আমাদের তো আর কোনো উপায়ও ছিল না। তাই আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে চললাম। কাজেই ঈদ-পরবে গাড়ি ভাড়া করলে চালকের ড্রাইভিং টাইমটা জেনে নিতে হবে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনার হার খুব উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালেও এর ব্যতিক্রম তো হয়নি, বরং আরও বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে, মৃতের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। ১৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত মাত্র ১০ দিনে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন নিহত হয়েছেন (সূত্র: রোড সেফটি ফাউন্ডেশন)। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২৪৯। এই ১০ দিনে প্রায় ৩৪২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।

অন্যদিকে যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রাথমিক তথ্যমতে, এবারের ঈদযাত্রার ১৪ দিনে ৩০৪টি দুর্ঘটনায় ৩০৯ জন নিহত এবং ৯ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। যদিও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বলছেন এবছরের ঈদ যাত্রা খুব নিরাপদ হয়েছে।

মাত্র ১০-১৪ দিনে এতগুলো মানুষের মৃত্যু মানে ২৭৪ টি বা ৩০৯টি পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাওয়া। ঈদের আনন্দ তাদের কাছে হয়ে দাঁড়িয়েছে বিভীষিকা, সারা জীবনের কান্না। আমরা যারা এই মৃতের তালিকায় নেই বা যাদের কেউ আহত হয়নি, তারা হয়তো নির্বাক হয়ে নিজেদের নিরাপদ ভাবছি। ভাবছি যে এই তালিকায় আমি বা আমার কোনো স্বজন নেই।

অন্যান্য অনেক দেশ যদি কিছু নিয়ম চালু করে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাহলে আমরা পারবো না কেন? সবচেয়ে আগে প্রয়োজন গতিসীমা লঙ্ঘনের জন্য অনেক বেশি উচ্চ জরিমানা এবং নিয়ম না মানলে লাইসেন্স বাতিল করা। চালক ও গাড়ির ফিটনেস বারবার চেক করা, স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ক্যামেরা এবং গাড়িতে আধুনিক সেফটি ফিচার বাধ্যতামূলক করা, ব্যস্ত হাইওয়েতে মোটরবাইক চালানো সীমিত করা, মোটর রেস বন্ধ করা। আর সড়ক তৈরির সময় নিরাপদ অবকাঠামোর কথা মাথায় রাখা, যেন মানুষের ভুল হলেও কারও মৃত্যু না হয়।

কিন্তু কতদিন আমরা এই নিরাপদের তালিকায় থাকতে পারবো? কতদিন দুর্ঘটনা এড়িয়ে চলতে পারবো? ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৫৪৬ জন নিহত হয়েছেন। কাজেই এটা স্পষ্ট যে আপনি, আমি যে কোনো সময় দুর্ঘটনার শিকার হতে পারি।

বিশ্বের সব দেশেই উৎসবকালে পরিবহন ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। কিন্তু যেসব দেশে আইনের কঠোর প্রয়োগ আছে ও যাত্রীদের কাছে নিরাপদ ভ্রমণ বেশি মূল্যবান। সেইসব দেশে মাঝে মাঝে শিডিউল বিপর্যয় হলেও, নিয়মিত এত দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি হয় না। সড়ক, রেল, নৌ ও বিমানপথে নিরাপদ যাতায়াতের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হচ্ছে নিয়ম ও নিয়ম মেনে চলার মানসিকতা, যার কোনোটাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ আমরা কিছুই মানি না, মানতে অস্বীকার করি।

আর তাই দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ২৬ প্রাণহানির দুদিনও পার হলো না, এর মধ্যেই দেখা মিললো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আরেকটি ফেরি পারাপারের ঘটনা। এবার জায়গা না থাকায় যাত্রীসহ একাংশ ফেরির বাইরে রেখেই নদী পার হলো একটি বাস। আর এই ঘটনার ছবি আমরা দেখতে পেলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ঘটনাটি ২৮ মার্চ পটুয়াখালীর বাউফলের বগা ফেরিঘাট এলাকার।

ঈদে গ্রামের বাড়ি যাওয়াটা অবশ্যই প্রার্থিত ও আনন্দের বিষয়। কিন্তু বাড়ি যেতে গিয়ে কতটা ঝুঁকি মানুষ নেবে বা নেওয়া উচিত, এদিকটি নিয়ে আমরা একদম সচেতন নই। আর সচেতন নই বলেই অবলীলায় পরিবার-পরিজন ও বাক্সপেটরা নিয়ে দূরের পথে মোটরবাইকে চড়ে যাত্রা করি। এত ব্যস্ত সড়কে রাতেও এই বাইকারদের দেখা যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাইড শেয়ারিং বা ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলে করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় ভারসাম্য হারানো বা বড় গাড়ির সাথে সংঘর্ষের ঘটনা বেশি ঘটছে। মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৩৭-৪০ শতাংশ ছিল মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক। তরুণদের বেপরোয়া গতিতে চালানো এবং নিয়ম না মেনে মহাসড়কে দূরপাল্লার যাত্রা এই মৃত্যু ও দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।

ঠাসাঠাসি করে ট্রেনের ছাদে চড়ে যাত্রা, মই বেয়ে জানালা দিয়ে কামরায় প্রবেশের দৃশ্য খুুব কমন, লঞ্চে জোরজবরদস্তি করে ওঠা, লঞ্চ ঘাটে লাগার আগেই লাফিয়ে জায়গা দখলের চেষ্টা এবং এ ধরনের আরও ডেসপারেট উদ্যোগ আমরা দেখেই আসছি। বাড়ি যাবে এই আনন্দে মানুষ বাসের ছাদে, ট্রাক বা পিকআপ ভ্যানে করে যেভাবে যাতায়াত করেন, তা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

ঈদ এলে অল্প সময়ে লাখ লাখ অথবা কোটিখানেক মানুষ ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহর ছেড়ে গ্রামে রওয়ানা হয়। এই বিশাল চাপ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত গণপরিবহন আমাদের নেই। তখন বাড়তি উপার্জনের আশায় অনেক লক্কড়-ঝক্কর বাস রং করে রাস্তায় নামানো হয়। প্রতি বছর এ নিয়ে ঈদের আগে গণমাধ্যমে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, কিন্তু অবস্থা তথৈবচ। ভাঙ্গা ও ত্রুটিপূর্ণ বাস, ট্রাক, টেম্পো, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস রাস্তায় চলাচল করবে এ যেন আমরা মেনে নিয়েছি।

আগে যেমনটা বলেছিলাম ঈদের সময় বাস ও ট্রাকচালকরা বিরতিহীনভাবে ট্রিপ দেন। টানা ১৮-২০ ঘণ্টা গাড়ি চালানোর ফলে চালকরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। হাইওয়েতে সামান্য তন্দ্রা বা অসতর্কতা ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হয়। খোঁজ নিলে দেখা যাবে এভাবেই যাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায় এবং অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু এটা দেখার কেউ নেই, সবাই লাভ ও লোভের পেছনে ছুটছে।

কে, কার আগে যাবে, কে বেশিবার ট্রিপ মারতে পারবে এই প্রতিযোগিতায় দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য চালকরা বিপজ্জনকভাবে ওভারটেকিং করেন। এমনও অনেক দ্রুতগামী বাস আছে সড়কে, যাদের অন্য কোনো বাহন ওভারটেক করতে পারে না, যে কোনো মূল্যে এরাই অগ্রগামী থাকবে। এরকম একটি বাসের যাত্রী হিসেবে আমি ওদের সাবধান করতে গিয়ে চরম ধাতানি খেয়েছিলাম সুপারভাইজার ও অন্যান্য যাত্রীদের কাছে।

এছাড়া উল্টো পথে গাড়ি চালানো এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা ঈদে চরম আকার ধারণ করে। এই ওভারটেক করতে গিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়, বাস-ট্রাক খাদে পড়ে যায়। মহাসড়কের অনেক জায়গায় বাঁক খুব বিপজ্জনক। এছাড়া হাইওয়েতে ধীরগতির যানবাহন যেমন- ইজিবাইক, নসিমন, করিমন, অটোরিকশা, ভ্যানগাড়ি ও ট্রাক-বাসের সহাবস্থান সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ায়। আসলে দক্ষ চালকের অভাব এবং সড়কের অব্যবস্থাপনা যতটুক না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী যেভাবেই হোক দ্রুত পৌঁছাতে হবে, আমাদের এই মানসিকতা।

এ দুর্ঘটনা ঘটার পেছনে শুধু কি ফিটনেসবিহীন যানবাহনগুলো দায়ী? নাকি অতিরিক্ত স্পিড বা অদক্ষ চালক ও আগে যাওয়ার মানসিকতা দায়ী? অবশ্যই এ বিষয়গুলো দায়ী, তবে আমাদের অর্থাৎ যাত্রীদের অসচেতনতা, ডেসপারেট ভাব, ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে না চলার প্রবণতাও কম দায়ী নয়।

যেমন সেদিন টাঙ্গাইলে রেললাইনে কাটা পড়ে এক শিশুসহ পাঁচজন নিহত হলেন। গাইবান্ধা থেকে ঢাকায় আসার পথে তাদের বাসটির জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় টাঙ্গাইলে দাঁড়িয়েছিল। এই পাঁচজন যাত্রী পাশে থাকা রেললাইনের ওপরে বসে গল্প করছিলেন। হঠাৎ ট্রেন চলে আসায় তারা ট্রেনের নিচে কাটা পড়েন। বিভিন্ন কারণে এরকম ঘটনা পরপর তিনবার ঘটলো। কেন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষগুলো ট্রেনলাইনে বসে গল্প করতে হয়, বিশ্রাম নিতে বা টাকা ভাগাভাগি করতে হয়? মানুষের এই নির্বুদ্ধিতা ও অসচেতনতার জন্য আমরা আর কাকে দায়ী করতে পারি?

হাইওয়েতে প্রায়ই দেখা যায় মানুষ প্রশস্ত সড়কের পাশে বসে হাত-পা ছড়িয়ে গল্প করছেন, ধান, তোশক-বালিশ শুকাতে দিচ্ছেন। মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে হাঁটা, বাচ্চার হাত ধরে আচমকা রাস্তা পার হওয়া, রাতে কালো পোশাক পরে হাইওয়ের পাশ দিয়ে হাঁটা খুব সাধারণ ব্যাপার আমাদের দেশে। এগুলো সবই বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনার কারণ।

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি আমাদের নিজেদেরও সচেতন হওয়াটা জরুরি। সরকারকে প্রথমে মেনে নিতে হবে যে দুর্ঘটনা হচ্ছে, দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। এ সত্যটা না মানলে দুর্ঘটনা থামানোর উপায় বের হবে কীভাবে? পরিবহন খাতের সংস্কারটা খুব দরকার।

অন্যান্য অনেক দেশ যদি কিছু নিয়ম চালু করে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাহলে আমরা পারবো না কেন? সবচেয়ে আগে প্রয়োজন গতিসীমা লঙ্ঘনের জন্য অনেক বেশি উচ্চ জরিমানা এবং নিয়ম না মানলে লাইসেন্স বাতিল করা। চালক ও গাড়ির ফিটনেস বারবার চেক করা, স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ক্যামেরা এবং গাড়িতে আধুনিক সেফটি ফিচার বাধ্যতামূলক করা, ব্যস্ত হাইওয়েতে মোটরবাইক চালানো সীমিত করা, মোটর রেস বন্ধ করা। আর সড়ক তৈরির সময় নিরাপদ অবকাঠামোর কথা মাথায় রাখা, যেন মানুষের ভুল হলেও কারো মৃত্যু না হয়।

জনসংখ্যাধিক্যের এই দেশে যদিও এতগুলো সংস্কারের কথা স্বপ্নের মতো শোনায়, তাও কিছু উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এভাবে মৃতের সংখ্যা গণনা ও মৃত মানুষের জন্য শুধু শোকপ্রকাশ আর কতদিন?

লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক।

এইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।