যেখানে বারুদ পোড়ে, সেখানে প্রেম গুমরে মরে

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
প্রকাশিত: ১১:৩২ এএম, ০৩ এপ্রিল ২০২৬

যুদ্ধের ইতিহাস যত পুরোনো, ততই পুরোনো তার নির্মমতা। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে মানুষ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও মানবাধিকারের নানা ধারণা তৈরি করেছে; আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক নীতি এবং শান্তির নানা চুক্তিও হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে এই মানবিকতার কথা অনেক সময়ই হারিয়ে যায়। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন তার প্রথম শিকার হয় নিরীহ মানুষ। বিশেষ করে নারী ও শিশু।

সাম্প্রতিক বিশ্ব রাজনীতির সংঘাতগুলো দেখলে একটি ভয়াবহ বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু সৈন্যদের মধ্যে লড়াই হয় না; বরং বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস হয় শহর, হাসপাতাল, স্কুল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেল শোধনাগার এবং পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। শিশুরা প্রাণ হারায়, পরিবারগুলো আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে, আর একটি পুরো সমাজ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এই বাস্তবতা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যুদ্ধ কখনও মানবিকতার গল্প নয়। এটি মানবতার জন্য এক গভীর ট্র্যাজেডি।

যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার শিশু। যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলোর একটি হলো শিশুদের ওপর এর প্রভাব। শিশুরা কোনো যুদ্ধের কারণ নয়, তারা কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশও নয়। তবু যুদ্ধ শুরু হলে তার নির্মমতা সবচেয়ে বেশি তাদেরই স্পর্শ করে।

বোমা হামলায় ধ্বংস হয়ে যায় স্কুল, হাসপাতাল ও বসতবাড়ি। অনেক শিশু সরাসরি হামলায় প্রাণ হারায়, আবার অনেকেই আহত হয়ে দীর্ঘদিন শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে। যারা বেঁচে থাকে, তাদের অনেকেই পরিবার হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি হয়।

শিশুদের জন্য যুদ্ধ শুধু প্রাণহানির ঝুঁকি নয়; এটি তাদের শৈশব, শিক্ষা এবং স্বপ্নকেও ধ্বংস করে দেয়। যুদ্ধক্ষেত্রে বড় হওয়া শিশুরা সহিংসতা ও ভয়কে জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে দেখতে শেখে। ফলে একটি প্রজন্মের মানসিক ও সামাজিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

যুদ্ধ অবকাঠামো ধ্বংসের নির্মম কৌশল। আধুনিক যুদ্ধের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা। তেল শোধনাগার, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গ্যাসক্ষেত্র কিংবা পানি শোধনাগারের মতো স্থাপনাগুলো এখন অনেক সময় হামলার লক্ষ্য হয়।

আধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশলের কারণে যুদ্ধ এখন আরও ভয়াবহ এবং বিস্তৃত হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই বাস্তবতার মধ্যেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হলো মানবিক নীতিমালা ও আইনকে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কারণ যুদ্ধের শেষে যে পৃথিবীটি থেকে যায়, সেখানে মানুষকেই আবার নতুন করে জীবন গড়তে হয়। আর সেই মানুষদের মধ্যেই থাকে শিশুরা, যাদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা মানবতার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

এই কৌশলকে সামরিক ভাষায় “স্ট্র্যাটেজিক টার্গেটিং” বলা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও যুদ্ধক্ষমতাকে দুর্বল করে দেওয়া। একটি দেশের জ্বালানি ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা অচল হয়ে গেলে তার শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ব্যবস্থা এবং সামরিক কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কিন্তু এই কৌশলের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের ওপর। কারণ এসব অবকাঠামো ধ্বংস হলে লক্ষ লক্ষ মানুষ জ্বালানি ও পানির সংকটে পড়ে।

তেল শোধনাগার ধ্বংসের প্রভাব খুবই মারাত্মক, যা আমরা বাংলাদেশে বসেই টের পাচ্ছি। তেল আধুনিক অর্থনীতি ও সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, যুদ্ধজাহাজ, এমনকি সাধারণ পরিবহন ব্যবস্থাও জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে তেল শোধনাগার ধ্বংস হলে একটি দেশের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।

কিন্তু এর প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। জ্বালানি সংকট হলে শিল্প উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, পরিবহন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে এবং খাদ্য সরবরাহেও সমস্যা দেখা দেয়। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

পানি শোধনাগার ধ্বংসের ভয়াবহতা হিসাব করা কঠিন। তেল অবকাঠামোর পাশাপাশি পানি শোধনাগার ধ্বংসের ঘটনা আরও ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি করে। পানি মানুষের মৌলিক জীবনের অপরিহার্য উপাদান। পানীয় পানি ছাড়া কোনো সমাজ দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।

পানি শোধনাগার ধ্বংস হয়ে গেলে শহরের লক্ষ লক্ষ মানুষ পানির সংকটে পড়ে। হাসপাতাল, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, খাদ্য উৎপাদন, সবকিছুই পানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে দ্রুত রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

বিশেষ করে শিশুদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক। অপুষ্টি, পানিবাহিত রোগ এবং স্বাস্থ্যসেবার অভাবে অনেক শিশুর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে।

এসকল মানবিক বিপর্যয়ের বিস্তার শুরু হয়ে গেছে। যখন শিশু হত্যা, অবকাঠামো ধ্বংস এবং খাদ্য ও পানির সংকট একসঙ্গে দেখা দেয়, তখন যুদ্ধ দ্রুত একটি বৃহৎ মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়। মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।

লক্ষ লক্ষ মানুষ শরণার্থী হয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেয়। শরণার্থী শিবিরগুলোতে খাদ্য, পানি ও চিকিৎসার অভাব দেখা দেয়। একটি যুদ্ধ তখন শুধু একটি দেশের সমস্যা থাকে না; এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মানবিক সংকটে রূপ নেয়।

এসব যুদ্ধের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক আইন ও বাস্তবতা ভিন্ন। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধের সময় বেসামরিক জনগণকে রক্ষা করা এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতাল, স্কুল, পানি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার মতো মৌলিক অবকাঠামোকে সুরক্ষিত রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো, যুদ্ধের উত্তেজনা ও রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে এসব নীতি অনেক সময় উপেক্ষিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে সামরিক ও বেসামরিক উভয় কাজে ব্যবহৃত অবকাঠামোকে “দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য” হিসেবে দেখিয়ে হামলার যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়।

কিন্তু এসব যুক্তির আড়ালে যে মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়, তার সবচেয়ে বড় শিকার হয় সাধারণ মানুষ এবং শিশুরা।

যুদ্ধের নৈতিক প্রশ্ন কেউ করার সাহস দেখাচ্ছে না। যখন যুদ্ধের ময়দানে শিশুদের মৃত্যু ঘটে, পানি ও খাদ্যের মতো মৌলিক প্রয়োজনীয়তা ধ্বংস হয়ে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে এই যুদ্ধের নৈতিকতা কোথায়?

যুদ্ধের লক্ষ্য যদি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হয়, তবে মানুষের মৌলিক জীবনব্যবস্থাকে ধ্বংস করা সেই লক্ষ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যুদ্ধের মাধ্যমে কোনো রাষ্ট্র হয়তো সামরিক বিজয় অর্জন করতে পারে, কিন্তু সেই বিজয়ের মূল্য যদি হয় হাজারো শিশুর জীবন, তবে সেই বিজয় আসলে মানবতার জন্য এক গভীর পরাজয়।

ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা  ‍যুদ্ধবাজরা নেয় না। বিশ্ব ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত শান্তির পথ তৈরি করে না; বরং নতুন সংঘাতের বীজ বপন করে। যুদ্ধের ক্ষত শুধু ধ্বংসস্তূপে নয়, মানুষের স্মৃতি ও সমাজের ভেতরেও থেকে যায়।

বিশেষ করে শিশুদের ওপর যুদ্ধের যে প্রভাব পড়ে, তা দীর্ঘদিন ধরে সমাজে প্রতিফলিত হয়। তাই যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনীতি, সংলাপ ও সহযোগিতার পথ খুঁজে বের করাই মানবতার জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। শিশু হত্যা, তেল ও পানি শোধনাগার ধ্বংসের মতো ঘটনা আমাদের স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেয় যে এসব ধ্বংস যুদ্ধ কখনও মানবিকতার গল্প নয়। এটি মানুষের জীবন, সমাজ ও ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে দিতে পারে।

আধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশলের কারণে যুদ্ধ এখন আরও ভয়াবহ এবং বিস্তৃত হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই বাস্তবতার মধ্যেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হলো মানবিক নীতিমালা ও আইনকে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কারণ যুদ্ধের শেষে যে পৃথিবীটি থেকে যায়, সেখানে মানুষকেই আবার নতুন করে জীবন গড়তে হয়। আর সেই মানুষদের মধ্যেই থাকে শিশুরা, যাদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা মানবতার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন।

 [email protected]

এইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।