তেল মজুত প্রতিহত করার দায়িত্ব সবার
দেশ আজ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে প্রকৃত সংকটের চেয়ে অনেক সময় ‘সংকটের আতঙ্ক’ই বড় হয়ে ওঠেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, সরবরাহ ব্যবস্থাপনার সংকট—সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি যখন টালমাটাল, তখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও তার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।
কিন্তু এই বাস্তবতার মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—যেখানে সরকার বলছে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, সেখানে বাজারে সংকটের আবহ তৈরি হচ্ছে কেন?
জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬৪৪ টন ডিজেল মজুত রয়েছে এবং আরও ১ লাখ ৩৮ হাজার টন এপ্রিলের মধ্যেই যোগ হবে। অকটেনের মজুত ১০ হাজার ৫০০ টন, যা এপ্রিলের মধ্যে আরও ৭১ হাজার ৫৪৩ টন বৃদ্ধি পাবে। পেট্রোলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র—১৬ হাজার টন মজুত রয়েছে এবং আরও ৩৬ হাজার টন আসার কথা। অর্থাৎ, সরবরাহের দিক থেকে রাষ্ট্র প্রস্তুত এবং সংকট মোকাবিলায় যথেষ্ট সক্ষম।
এমনকি আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। যেখানে পাকিস্তান জ্বালানির দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে বাধ্য হয়েছে, শ্রীলঙ্কা রেশনিং চালু করেছে এবং কর্মঘণ্টা কমিয়ে দিয়েছে, সেখানে ভারত, নেপাল, ভুটান, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপ ইতোমধ্যে দাম বাড়িয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার জনগণের জীবনযাত্রা ও শিল্প উৎপাদনের স্বার্থে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি দায়িত্বশীল ও জনবান্ধব সিদ্ধান্ত।
তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়—এই পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও বাজারে কেন অস্থিরতা? এর আসল কারণ—মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং অসাধু মুনাফাখোরদের দৌরাত্ম্য।
আজকের বাস্তবতায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগী নিজেদের স্বার্থে পুরো বাজার ব্যবস্থা জিম্মি করে ফেলছে। তারা গোপনে জ্বালানি তেল মজুত করছে, সরবরাহে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করছে এবং পরে সেই সংকটকে পুঁজি করে অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি করছে। এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক অপরাধ নয়—এটি সরাসরি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা।
অবৈধ মজুত বন্ধে, ৩ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার ৩৪২টি অভিযান পরিচালনা করেছে। এতে উদ্ধার করা হয়েছে ৪০ লাখ ৪৮ হাজার ৪৫৬ লিটার জ্বালানি। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে, এ সংকটের মধ্যেও মজুতদাররা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
জ্বালানি ও সয়াবিন তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও যদি বাজারে সংকট তৈরি হয়, তবে তার দায় আমাদের সবার। তবে সবচেয়ে বড় দায় মজুতদারদের, যারা নিজেদের স্বার্থে পুরো জাতিকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। এই বাস্তবতায় আমাদের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া উচিত—মজুতদারির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নিতে হবে। ন্যায্য বাজার ব্যবস্থার পক্ষে দৃঢ় অঙ্গীকার করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কোনো কৃত্রিম সংকট, কোনো অসাধু চক্র আমাদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে পারে না।
আরও দুঃখজনক হলো, এই মজুতদারির সংস্কৃতি কেবল ব্যবসায়ীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; অনেক সাধারণ ভোক্তাও অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত কেনাকাটায় লিপ্ত হচ্ছেন। ফলে বাজারে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায় এবং সরবরাহ চেইনে চাপ সৃষ্টি হয়।
একজনের অতিরিক্ত মজুত অন্যজনের জন্য বঞ্চনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রবণতা সমাজে এক ধরনের ‘অদৃশ্য বৈষম্য’ তৈরি করে, যেখানে শক্তিশালী ও সচ্ছলরা সুবিধা পায়, আর দুর্বলরা বঞ্চিত হয়।
সরকার ইতোমধ্যে এই অনিয়ম ঠেকাতে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। অবৈধ মজুত রোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, জেলা প্রশাসকদের সক্রিয় করা হয়েছে। সেচ মৌসুমে কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ১৪ এপ্রিল অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যাতে কৃষকরা নিরবচ্ছিন্নভাবে ডিজেল পেতে পারেন। এই উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
তবে বাস্তবতা হলো—শুধু প্রশাসনিক অভিযান দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, যদি না সমাজের প্রতিটি স্তরে নৈতিকতার পুনর্জাগরণ ঘটে।
মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া এখন সময়ের দাবি। যারা সংকট পুঁজি করে মানুষের কষ্টকে ব্যবসার সুযোগে পরিণত করে, তারা কেবল আইনভঙ্গকারী নয়— তারা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি শক্তি।
তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও আইনি উভয় ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে একটি শক্ত বার্তা দিতে হবে—বাংলাদেশে সংকট পুঁজি করে মুনাফাখোরির কোনো স্থান নেই।
প্রাসঙ্গিকভাবে এখানে একটি প্রশ্ন ওঠে যে—একজন ব্যবসায়ীর উদ্দেশ্য কি শুধু মুনাফা অর্জন, নাকি সমাজের প্রতি তার কোনো দায়িত্বও রয়েছে? একটি সুস্থ অর্থনীতি কেবল লেনদেনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; বরং এটি বিশ্বাস, ন্যায়বিচার এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধের ওপর নির্ভরশীল।
যখন এই মূল্যবোধগুলো নষ্ট হয়ে যায়, তখন বাজারও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। জ্বালানি ও সয়াবিন তেলের সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি একটি নৈতিক সংকটও বটে। এই সংকট আমাদের শিখিয়ে দেয় যে—আইন যতই শক্তিশালী হোক, যদি মানুষের মন পরিবর্তন না হয়, তবে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
আমাদের সামনে আজ একটি বড় সুযোগ রয়েছে—এ সংকটকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার। যেখানে সরকার কঠোর হবে, ব্যবসায়ীরা সৎ হবে এবং ভোক্তারা সচেতন হবে। গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সচেতনতা বাড়াতে হবে, মানুষকে বোঝাতে হবে যে—অপ্রয়োজনীয় মজুত মানে অন্যের অধিকার হরণ।
পরিশেষে বলা যায়, জ্বালানি ও সয়াবিন তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও যদি বাজারে সংকট তৈরি হয়, তবে তার দায় আমাদের সবার। তবে সবচেয়ে বড় দায় মজুতদারদের, যারা নিজেদের স্বার্থে পুরো জাতিকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়।
এ বাস্তবতায় আমাদের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া উচিত—মজুতদারির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নিতে হবে। ন্যায্য বাজার ব্যবস্থার পক্ষে দৃঢ় অঙ্গীকার করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কোনো কৃত্রিম সংকট, কোনো অসাধু চক্র আমাদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে পারে না।
সুতরাং আসুন আমরা সবাই মজুতদারির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]
এইচআর/এমএস