ষড়ঋতুর দেশে ছন্দপতন: কৃষি ও পরিবেশের ভবিষ্যৎ কী

ড. রাধেশ্যাম সরকার
ড. রাধেশ্যাম সরকার ড. রাধেশ্যাম সরকার , লেখক: কৃষিবিদ, গবেষক।
প্রকাশিত: ০৯:৪৫ এএম, ০৭ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশ একসময় তার ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যময় রূপের জন্য পরিচিত ছিল, যেখানে প্রতিটি ঋতু নিজস্ব ছন্দ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আবির্ভূত হতো। কৃষকরা এই প্রাকৃতিক ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফসলের বপন, পরিচর্যা এবং কাটার সময়সূচি নির্ধারণ করত। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে সেই প্রাকৃতিক ছন্দে দৃশ্যমান ব্যত্যয় ঘটেছে। ঋতুচক্রের স্বাভাবিকতা ভেঙে গিয়ে আবহাওয়ার আচরণে অনিশ্চয়তা, চরমতা এবং অসামঞ্জস্য ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। এর প্রভাব শুধু প্রকৃতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং জনস্বাস্থ্য, কৃষি উৎপাদন এবং সামগ্রিক পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপর গভীর ছাপ ফেলছে।

বাংলাদেশের আবহাওয়ার সাম্প্রতিক প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগজনক চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেখানে ২০২৪ সালের একাধিক তাপপ্রবাহে তা ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এপ্রিলের শুরুতেই দেশের বহু অঞ্চলে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ শুরু হয়ে দ্রুত বিস্তৃতি লাভ করেছে এবং একপর্যায়ে তা ২৮টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৯.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে।

একই সময়ে খুব অল্প ব্যবধানে তাপমাত্রার হঠাৎ বৃদ্ধি লক্ষণীয়, যেমন এক থেকে দুই এপ্রিলের মধ্যে কোথাও কোথাও সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা প্রায় সাড়ে চার ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়ে গেছে, যা আবহাওয়ার অস্বাভাবিক অস্থিরতার ইঙ্গিত বহন করে। অন্যদিকে শীতকালেও তীব্র শৈত্যপ্রবাহ সমানভাবে উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। ২০২৫ সালে দেশের উত্তর ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহ, ঘন কুয়াশা এবং তাপমাত্রা ৫ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসার ঘটনা এ পরিবর্তনের একটি প্রকট দৃষ্টান্ত। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও শীতকাল তুলনামূলকভাবে স্বল্পস্থায়ী হলেও প্রথম সপ্তাহে তীব্র ঠান্ডা অনুভূত হয়েছে, যার পরপরই বসন্তের শুরুতেই তাপমাত্রা দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে, ফলে ঋতুর স্বাভাবিক রূপান্তর প্রক্রিয়ায় একটি স্পষ্ট অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সমগ্র পরিস্থিতি বিবেচনায় স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ একটি জটিল পরিবেশগত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই সংকট মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা, সবুজায়ন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার একক পরিকল্পনা অপরিহার্য। সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অনিশ্চিত ও প্রতিকূল পরিবেশ রেখে যাওয়া ছাড়া বিকল্প থাকবে না।

এই তাপমাত্রার ওঠানামা কৃষির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের মতে, দেশের ২৮ জেলায় তাপপ্রবাহ বিস্তৃত হয়েছে, যেখানে চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৯.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এক ও দুই এপ্রিলের মধ্যে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা প্রায় সাড়ে চার ডিগ্রি পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ধান ও আমের মতো প্রধান ফসলের ক্ষেত্রে এই তাপমাত্রার বৃদ্ধি ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করেছে।

ধানের জন্য আদর্শ তাপমাত্রা দিনের বেলায় ৩৫ ডিগ্রির নিচে, রাতের বেলায় ২৬ ডিগ্রির নিচে থাকলে উৎপাদন ভালো হয়। ৩৫ ডিগ্রির ওপরে তাপমাত্রা থাকলে ধান চিটা হয়ে যেতে পারে, তাই মাঠে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখার প্রয়োজন পড়ছে। আমের ক্ষেত্রে, গাছে গুটি অবস্থায় থাকা আমের জন্য ২৫–৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস আদর্শ। এর চেয়ে উষ্ণ বা তীব্র তাপপ্রবাহ হলে গুটি ছোট হয়ে যেতে পারে এবং ঝরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের ফসলচাষে ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে এবং কৃষকের উৎপাদন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করছে।

অস্বাভাবিক তাপমাত্রার ওঠানামা কেবল কৃষি উৎপাদনের জন্যই নয়, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং জনস্বাস্থ্যের জন্যও ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। গ্রীষ্মকালে তীব্র তাপপ্রবাহ এবং শীতকালে হঠাৎ শৈত্যপ্রবাহের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সর্দি, জ্বর, তাপজনিত অসুস্থতা, হঠাৎ সংক্রমণ এবং বিভিন্ন শ্বাসনালীর সমস্যা সম্প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং স্থানভেদে ভারী বৃষ্টিপাতের অসম সময়কাল ভূমির আর্দ্রতা হ্রাস করছে, যা কৃষি উৎপাদন, সেচ ও জল সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থার দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্যকে গভীরভাবে বিঘ্নিত করছে। বরেন্দ্র অঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা এবং নদীপথ অঞ্চলে এই অস্বাভাবিক আবহাওয়ার প্রভাব আরও প্রকট এবং এসব অঞ্চলে ফসলের ক্ষয়, পানির অভাব এবং মৃত্তিকার উর্বরতা হ্রাসের মতো সমস্যার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই ধরনের জলবায়ুগত চরমতা নিয়ন্ত্রণে আনা না হলে কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি এবং বহুমাত্রিক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে না। একসময় যে ছয়টি ঋতুর স্বতন্ত্রতা স্পষ্টভাবে দেখা যেত, তা ক্রমশ ম্লান হয়ে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন ঋতুর প্রভাব পরস্পরের সঙ্গে মিলেমিশে ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। কখনো শীত বিলম্বিত হচ্ছে, কখনো বর্ষা অনিয়মিত হয়ে পড়ছে, আবার কখনো অসময়ে ভারী বৃষ্টিপাত অথবা দীর্ঘস্থায়ী খরার প্রকোপ পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল করে তুলছে। এর ফলে ঋতুভিত্তিক জীবনযাপন ও কৃষি পরিকল্পনা উভয়ই এখন আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই অনিশ্চয়তার সবচেয়ে প্রত্যক্ষ এবং গভীর অভিঘাত পড়ছে দেশের কৃষি ব্যবস্থার ওপর, যা বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ জীবিকার মূলভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। অনিয়মিত জলবায়ু ফসলের বপন, পরিচর্যা এবং কাটার সময়সূচি ব্যাহত করছে, উৎপাদন কমাচ্ছে এবং কৃষকের ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি করছে, ফলে তাদের আর্থিক চাপও ক্রমশ বাড়ছে।

বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি পরিস্থিতি বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জপূর্ণ। নওগাঁ, রাজশাহী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিয়ে গঠিত এই অঞ্চলে গত এক দশকে জলবায়ুর চরমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৭ সালের শীতে তাপমাত্রা প্রায় হিমাঙ্কের কাছাকাছি নেমে আসে এবং ২০১৮ সালে গ্রীষ্মে তা ৪০–৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে। ২০২২ সালে তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি এবং ২০২৩ সালের এপ্রিলে ৩৯–৪০ ডিগ্রি রেকর্ড করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে ৩৮–৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রা বিরাজ এবং বৃষ্টিপাতের ঘাটতি মরুকরণের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। এ প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক গবেষণায় দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান খরাপ্রবণতা এবং বৃষ্টিপাতের ঘাটতির বিষয়টি ইতোমধ্যেই তুলে ধরা হয়েছে।

এই সংকট মোকাবেলায় সুস্পষ্ট পদক্ষেপ জরুরি। কার্বন নিঃসরণ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, সামাজিক বনায়ন সম্প্রসারণ, বৃক্ষনিধন রোধ এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। নদী দখল ও জলাশয় ভরাট বন্ধ করতে হবে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে। পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার, কারণ ক্ষুদ্রতম জীব থেকে বৃহত্তম প্রাণী পর্যন্ত সবাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হতে পারে, যার ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। নদীবাহিত পলির কারণে কিছু নতুন চর জেগে উঠলেও লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা কৃষি ও পানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ক্রমশ বাড়াচ্ছে।

সমগ্র পরিস্থিতি বিবেচনায় স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ একটি জটিল পরিবেশগত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই সংকট মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা, সবুজায়ন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার একক পরিকল্পনা অপরিহার্য। সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অনিশ্চিত ও প্রতিকূল পরিবেশ রেখে যাওয়া ছাড়া বিকল্প থাকবে না।

লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, কলামিস্ট ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।
[email protected]

এইচআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।