সংরক্ষিত নারী আসন এবং কোটার তর্ক

আমীন আল রশীদ
আমীন আল রশীদ আমীন আল রশীদ , সাংবাদিক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১০:২৪ এএম, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

‘কোটা না মেধা’র তর্কে যে দেশে একটি বিরাট গণ-অভ্যুত্থান হয়ে গেলো এবং যে অভ্যুত্থানের মুখে বাংলাদেশের ইতিহাসে এ যাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী সরকারের পতন হলো, সেই দেশে সংসদের সংরক্ষিত আসনের এমপি হওয়ার জন্য মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন হাজারের বেশি নারী—যে সংরক্ষিত আসন মূলত একটি কোটা সিস্টেম!

গণমাধ্যমের খবর বলছে, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরুর প্রথম দুদিনে সরকারি দল দল বিএনপির নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১ হাজার ২৫টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের এককক্ষবিশিষ্ট আইন সভায় মোট সদস্যের সংখ্যা সাড়ে তিনশো—যাদের মধ্যে ৫০টি আসন পরোক্ষ ভোটে ‘নির্বাচিত’ হয়।

সংরক্ষিত আসনে কারা মনোনয়ন পাবেন সেটি একান্তভাবেই দলের সিদ্ধান্ত। এখানে সাধারণ ভোটারদের কোনো অংশগ্রহণ নেই। তবে এক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। যেমন, জোটভিত্তিক ভোটের কারণে মনোনয়নবঞ্চিত দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা; দলের দুঃসময় ও আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা আছে; দলে গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন কিন্তু মূল নির্বাচনে কোনো আসন থেকে বিশেষ কারণে মনোনয়ন পাননি; প্রয়াত এমপির স্ত্রী বা কন্যা; জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তির স্ত্রী বা কন্যা; নানা কারণে খ্যাতিমান বা পরিচিত মুখ, বিনোদন জগতের তারকা ইত্যাদি। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যোগ্যতা, সামাজিক সুনাম, শিক্ষা, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন–সংগ্রামে প্রচেষ্টা দৃশ্যমান ছিল—এমন নারীদেরকে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দেওয়া হবে।

আগামী ১২ মে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন হবে। এটিকে নির্বাচন বলা হলেও এটা মূলত সিলেকশন বা মনোনয়ন। কারণ নির্বাচন বললে সেখানে প্রতিটি পদে একাধিক প্রার্থী থাকার কথা এবং সেখানে ভোটারের ভোটদানের সুযোগ থাকার কথা।

প্রতি ছয়জন সাধারণ সদস্যের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন করা হয়। সে অনুযায়ী এবার বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াত জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্ররা মিলে একটি সংরক্ষিত আসন পাবে।

দল ও জোটের বরাদ্দ পাওয়া আসনের সমান প্রার্থী হলে আর ভোটের প্রয়োজন হয় না। নির্ধারিত দিনে যারা মনোনয়নপত্র জমা দেন, বাছাইয়ে বৈধ হলে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়ের পর বিনাপ্রতিন্দ্বিতায় তাদের নির্বাচিত ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়।

সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা বাতিল করে এর বিকল্প হিসেবে সংসদের মূল আসন সংখ্যা ৩০০-এর সঙ্গে সংরক্ষিত ৫০টিকে বিভিন্ন জেলায় ভাগ করে সব দল যদি কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী দিতে বাধ্য হয়, তখন দেখা যাবে সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়বে এবং সরাসরি নির্বাচিত হয়ে আসার ফলে তাদের মর্যাদা ও গুরুত্বও বাড়বে। কোন কোন আসনগুলো নারীদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হবে, সেটি দলের নীতিনির্ধারকরা সিদ্ধান্ত নেবেন। কিছু আসনে হয়তো জটিলতা সৃষ্টি হবে, বিশেষ করে যেখানে দলের পুরুষ প্রার্থী অনেক বেশি ক্ষমতাবান, সেখানে তুলনামূলক কম ক্ষমতাবান নারীকে প্রার্থী করলে দলীয় কোন্দল বেড়ে যাওয়া কিংবা ওই নারী প্রার্থীর হেরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

প্রশ্ন হলো, যখন দেশের রাজনীতি-প্রশাসনসহ সর্বত্রই নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে এবং জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকার এবং বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনে নারীরা পুরুষের সঙ্গে সরাসরি  প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হয়ে আসছেন—সেখানে এখনও ৫০টি আসন শুধু নারীদের জন্য বরাদ্দ রাখা এবং জনগণের অংশগ্রহণের বাইরে দলীয় প্রধানের পছন্দ-অপছন্দের ওপরে বিষয়টি নির্ভরশীল রাখা কতটা যৌক্তিক? তাছাড়া যে পদ্ধতিতে এই ৫০টি আসন বণ্টন করা হয়, সেটি স্পষ্টতই একটি কোটা সিস্টেম। কেননা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর আসনের অনুপাতে সংরক্ষিত আসনগুলো বণ্টন করা হয়। এটি মূলত একটি বিলি-বণ্টন ব্যবস্থা। কোনো অর্থেই নির্বাচন নয়। কেননা, দলগুলো কাদেরকে মনোনয়ন দেবে, সেটি একান্তই দলের এখতিয়ার। এখানে সরাসরি ভোটের কোনো ব্যাপার নেই। ভোট হয় পরোক্ষ। অর্থাৎ দলে কার কী অবদান বা কে কতটা অনুগত, সেটি যেমন বিবেচনায় নেয়া হয় তেমনি তিনি কার কন্যা, স্ত্রী বা বোন—সেটিও বিবেচনায় থাকে। অনেক সময়ই ব্যক্তির যোগ্যতা ছাপিয়ে এইসব পারিবারিক পরিচয় ‍মুখ্য হয়ে ওঠে।

এবারও সরকারি দল বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সম্ভাব্য এমপি হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে অনেকেই এই পারিবারিক লিগ্যাসির সুযোগ নিতে চাচ্ছেন। যেমন মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস—যিনি বিএনপির সিনিয়র নেতা মির্জা আব্বাসের স্ত্রী। শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের স্ত্রী নাজমুন নাহার বেবী,  বিএনপির প্রয়াত নেতা মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা জসিমউদ্দিন মওদুদ, দলের প্রয়াত মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদারের মেয়ে সালিমা বেগম অরুনি, বিএনপি সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে শাকিলা ফারজানা, সাবেক মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পুত্রবধূ খাদিজাতুল কোবরা সুমাইয়া, বিএনপির প্রয়াত এমপি নাসিরুদ্দিন পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনা, গোপালগঞ্জ-১ আসনের বর্তমান এমপি সেলিমুজ্জামান সেলিমের স্ত্রী সাবরিনা শুভ্র, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও এমপি আব্দুল মঈন খানের মেয়ে মাহারীন খান, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি প্রয়াত শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন, গাজীপুর জেলা বিএনপি সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ রিয়াজুর হান্নানের স্ত্রী ফাতেমা বিনতে দোহা, লন্ডন বিএনপি সাবেক সভাপতি প্রয়াত কমর উদ্দিন আহমেদের মেয়ে সাবরিনা খানও আছেন এবারের সম্ভাব্যদের তালিকায়। তাদের সবাই হয়তো সংরক্ষিত আসনের এমপি হওয়ার যোগ্য। কিন্তু দুয়েকজন ব্যতিক্রম বাদ দিলে অধিকাংশেই ‍মূল পরিচয় আসলে পারিবারিক—যে পরিচয় না থাকলে তারা হয়তো মনোনয়ন ফরম নেওয়ারই সাহস করতেন না।

এবার বিএনপি জোটের অন্যতম দল গণসংহতি আন্দোলনের শীর্ষ নেতা ও এমপি জোনায়েদ সাকির স্ত্রী তাসলিমা আখতারের নামও শোনা যাচ্ছে সংরক্ষিত আসনের এমপি হিসেবে। তিনি নিজেও গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা। এছাড়া জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সহসভাপতি তানিয়া রব এবং নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার স্ত্রী মেহের নিগার এবং তার মেয়ে নিলম মান্নার নামও শোনা যাচ্ছে। এই নামগুলোও আসছে পারিবারিক কারণে। তবে গণসংহতি আন্দোলন বা অন্য কোনো দল থেকে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পাওয়ার সুযোগ কম বলেই মনে হয়। কেননা বিএনপিতেই আগ্রহীর সংখ্যা অনেক বেশি। বরং সেখান থেকেই কাকে রাখাহবে আর কাকে বাদ দেওয়া হবে, তা নিয়ে বিএনপিকে অনেক অঙ্ক কষতে হবে।

মজার ব্যাপার হলো, সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে এসে শনিবার সকালে দলীয় নেত্রীদের ক্ষোভের মুখে পড়েন রোমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা (কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা)। কনকচাঁপা মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে গেলে সেখানে থাকা অন্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হইচই শুরু করেন। তারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থেকেও হঠাৎ করে মনোনয়নপ্রত্যাশী হওয়া সুবিধাবাদিতার শামিল। যদিও কনকচাঁপার দাবি, তিনি পুরো আওয়ামী লীগ আমলে নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছেন। বঞ্চিত হয়েছেন। অর্থাৎ সংসদের ৩৬টি সংরক্ষিত আসনের বিপরীতে বিএনপির নিজেদের ভেতরেই ব্যাপক প্রতিযোগিতা।

যদিও এই প্রতিযোগিতাকেও আখেরে কোনো নির্বাচন বলার সুযোগ নেই। বরং দিন শেষে সংরক্ষিত আসন মূলত একটি কোটা সিস্টেম। যে সিস্টেমের বিরুদ্ধে চব্বিশের জুলাই মাসে দেশে একটি বিরাট গণ-অভ্যুত্থান হয়ে গেছে। শুধু সংসদের এই কোটা সিস্টেম নয়। বরং ওই অভ্যুত্থানে যুক্ত অনেকের জন্যও কোটা বহালা রাখা হয়েছে বা নতুন কোটা প্রবর্তন করা হয়েছে। অর্থাৎ যে কোটা সিস্টেমের বিরুদ্ধে একটি বড় অভ্যুত্থান হলো, সেই সিস্টেমের ভেতরেই দেশের সকল সিস্টেম এখনও ঘুরপাক খাচ্ছে!

প্রসঙ্গত, আইন প্রণয়নে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সংবিধানে সংরক্ষিত নারী আসন চালু হয়েছিল ১৯৭২ সালে। ওই বছর গৃহীত সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে সংরক্ষিত আসনের বিধান রাখা হয়েছিল। শুরুতে এই সংখ্যা ছিল ১৫। ধাপে ধাপে যা পঞ্চাশে উন্নীত হয়। ২০১৮ সালে সংবিধানের সবশেষ ১৭তম সংশোধনীর মধ্য দিয়ে আরও ২৫ বছর তথা ২০৪৩ সাল পর্যন্ত সংসদে নারীদের জন্য এই ৫০টি আসনে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।

সংরক্ষিত আসনের এমপিদের কাজ ও এখতিয়ার, প্রয়োজনীয়তা, নারী উন্নয়নে সংরক্ষিত আসনগুলো আসলেই কতটা ভূমিকা রাখছে, তা নিয়ে বিভিন্ন সময়েই বিতর্ক হয়েছে বা এখনও হচ্ছে। বিশেষ করে নবম সংসদে প্রধান দুটি দলের সংরক্ষিত আসনের বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যের আচরণ ও কথাবার্তায় এই পদটি যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছে। অনেক সময় এমন কথাও উঠেছে যে সংরক্ষিত আসনগুলো আসলে আলংকারিক।

প্রশ্ন হলো, নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন কেন থাকতে হবে? নারীরা সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ, তাই তাদের জন্য সংসদের সংরক্ষিত আসন থাকা উচিত, এর পাল্টা যুক্তিও রয়েছে। যেমন, সমাজ ও রাষ্ট্রের আরও যে-সব পিছিয়ে পড়া অংশ, যেমন আদিবাসী (ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী), ধর্মীয় সংখ্যালঘু, শারীরিক প্রতিবন্ধী, দলিত- তাদের জন্য সংসদে আসন কেন সংরক্ষিত থাকবে না?

সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যরা কোনো নির্বাচনি এলাকা থেকে প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত হন না। তারপরও তাদের সাংবিধানিক মর্যাদা সরাসরি নির্বাচিত এমপিদের মতোই। প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিতদের মতোই তারা বিশেষ সুবিধা ভোগ করেন। বিল পাস ও সংসদের অন্যান্য প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন। এমনকি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিও হতে পারেন। তাদের বেতন-ভাতা-সম্মানী এবং শুল্কমুক্ত গাড়ি আনার সুযোগও সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মতো। কিন্তু তা সত্ত্বেও সামাজিকভাবে সংরক্ষিত আসনের এমপিদের খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কারণ তাদের নির্দিষ্ট কোনো নির্বাচনি এলাকা নেই। কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় তাদের দায়িত্ব দেওয়া হলেও সেই এলাকায় যেহেতু সরাসরি নির্বাচিত এমপি রয়েছেন, ফলে ভোটার ও অন্যান্য মানুষের কাছে সংরক্ষিত আসনের এমপিরা ‘দ্বিতীয় শ্রেণির’ জনপ্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হন। বড় কোনো সমস্যার সমাধান বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সংরক্ষিত আসনের এমপিদের বিবেচনা করা হয় না।

প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত এই ৫০ জন নারী সাংবিধানিকভাবে আইনপ্রণেতা, কিন্তু তারপরও শাসনকাজে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত নগণ্য। একজন নারী সদস্যকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, গত ৫ বছরে আপনি কী কী করেছেন, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় কী ভূমিকা রেখেছেন, তাতে সন্তোষজনক কোনো উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা—এমন কথা বলা হলেও বাস্তবতা হলো এর দ্বারা লাভবান হয় মূলত দল। অর্থাৎ ৩০০ আসনে জয়ের আনুপাতিক হারে দলগুলো যেহেতু সংরক্ষিত আসন পায়, ফলে জাতীয় নির্বাচনে যে দল সবচেয়ে বেশি আসন পায়, তারাই আবার আনুপাতিক হারে সবচেয়ে বেশি সংরক্ষিত আসনের মালিক হয়। এটা অনেকটা ক্ষমতাবানকে আরও ক্ষমতায়িত করার একটা কায়দা।

সংরক্ষিত আসনে কারা মনোনয়ন পাবেন, কী তাদের যোগ্যতা—সে বিষয়ে দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। সব মিলিয়ে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সংরক্ষিত আসনের কথা বলা হলেও আদতে এর দ্বারা নারীর ক্ষমতায়ন কতটুকু নিশ্চিত হয়েছে বা হচ্ছে সেই তর্কের অবসান হয়নি।

তাহলে সমাধান কী? সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা বাতিল করে এর বিকল্প হিসেবে সংসদের মূল আসন সংখ্যা ৩০০-এর সঙ্গে সংরক্ষিত ৫০টিকে বিভিন্ন জেলায় ভাগ করে সব দল যদি কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী দিতে বাধ্য হয়, তখন দেখা যাবে সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়বে এবং সরাসরি নির্বাচিত হয়ে আসার ফলে তাদের মর্যাদা ও গুরুত্বও বাড়বে। কোন কোন আসনগুলো নারীদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হবে, সেটি দলের নীতিনির্ধারকরা সিদ্ধান্ত নেবেন। কিছু আসনে হয়তো জটিলতা সৃষ্টি হবে, বিশেষ করে যেখানে দলের পুরুষ প্রার্থী অনেক বেশি ক্ষমতাবান, সেখানে তুলনামূলক কম ক্ষমতাবান নারীকে প্রার্থী করলে দলীয় কোন্দল বেড়ে যাওয়া কিংবা ওই নারী প্রার্থীর হেরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। কিন্তু এটি নারীদের ব্যাপারে আমাদের সামগ্রিক রাজনীতির যে বিবেচনা ও দৃষ্টিভঙ্গি, সেটিও পরিবর্তন করা দরকার। নারী মানেই তার জন্য বিশেষ সুবিধা রাখতে হবে, এই ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসারও সময় হয়েছে। তাছাড়া শিক্ষিত নারী কারও করুণা চায় বলেও মনে হয় না।

জুলাই সনদের ২১ নম্বর ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব ক্রমান্বয়ে ১০০ আসনে উন্নীত করা হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে সনদটির ২২ নম্বর ধারায় পদ্ধতিগত সংস্কারের বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। প্রথমত, বিদ্যমান সংরক্ষিত ৫০টি আসন বহাল রেখে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৫(৩)-এ প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে। একইসঙ্গে, জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ স্বাক্ষরের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে প্রতিটি রাজনৈতিক দল বিদ্যমান ৩০০ (তিনশ) সংসদীয় আসনের জন্য প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে ন্যূনতম পাঁচ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে। এর পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে এই হার ন্যূনতম ১০ শতাংশে উন্নীত হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সনদে স্বাক্ষরকারী কোনো দল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই ৫ শতাংশ নারী প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি। এমনকি যারা এখন সংসদের প্রধান বিরোধী দল সেই জামায়াত একজন নারীকেও মনোনয়ন দেয়নি।

লেখক : সাংবাদিক ও লেখক।

এইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।