শিক্ষার সময়চক্রের পাশাপাশি যে সংস্কারটি জরুরি
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের এক মৌলিক অসংগতি নতুন করে সামনে এনে দিয়েছেন বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তাঁর বক্তব্যে যে বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে, তা কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতার বিষয় নয়; বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার দীর্ঘসূত্রিতা বিশেষ করে শিক্ষাবর্ষের সঙ্গে পরীক্ষার সময়সূচির অসামঞ্জস্য; বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের শিক্ষাজীবনকে অনর্থক দীর্ঘ করে তুলছে এবং জাতীয় উন্নয়নের গতিকেও ব্যাহত করছে।
বর্তমান ব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থী দশম বা দ্বাদশ শ্রেণির পাঠক্রম শেষ করার পরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে বাধ্য হয় শুধু পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য। এর ফলে শিক্ষাজীবনের মূল্যবান সময় কার্যত স্থবিরতায় কাটে। এই সময়টিতে শিক্ষার্থীরা নতুন কিছু শেখার সুযোগ পায় না, আবার পুরোপুরি বিশ্রামেও থাকে না। এই অপেক্ষার সংস্কৃতি এক ধরনের মানসিক ক্লান্তি তৈরি করে, যা তাদের শেখার আগ্রহ ও সৃজনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের দ্রুত, কার্যকর ও সময়োপযোগী দক্ষতায় গড়ে তোলা। কিন্তু যখন একটি শিক্ষার্থীকে একই স্তরের শিক্ষা শেষ করতে প্রয়োজনের তুলনায় এক থেকে দুই বছর বেশি সময় ব্যয় করতে হয়, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। বিশ্বের অনেক দেশেই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ করা হয় এবং দ্রুত পরবর্তী ধাপে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা হয়। সেখানে বাংলাদেশের এই দীর্ঘসূত্রিতা আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
শিক্ষা যদি সত্যিই জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে সেই মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী ও কার্যকর রাখতে সময়ের অপচয় নয়, বরং সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য। বাংলাদেশের তরুণদের সামনে যে সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত, তা কাজে লাগাতে হলে এখনই সাহসী ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার এই দীর্ঘসূত্রিতা দূর করা শুধু একটি প্রশাসনিক সংস্কার নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
পরীক্ষা ডিসেম্বরে সম্পন্ন করার যে প্রস্তাব সামনে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে একটি যুগোপযোগী চিন্তা। যদি জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারির মধ্যেই এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করা যায়, তবে শিক্ষার্থীরা দ্রুত ফলাফল পেয়ে পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হতে পারবে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়াও সময়মতো সম্পন্ন করা সম্ভব হবে, যা বর্তমানে প্রায়ই পিছিয়ে যায়। ফলস্বরূপ একটি শিক্ষার্থীর পুরো অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার শৃঙ্খলার মধ্যে আসবে। তবে শুধু পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনা যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন। প্রথমত, শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রশ্নপত্র প্রস্তুত, পরীক্ষা গ্রহণ এবং মূল্যায়ন সম্পন্ন করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ফলাফল প্রকাশের সময়সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং একটি অপরিহার্যতা। এছাড়া বিষয় সংখ্যা হ্রাসের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটিও গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। শিক্ষার্থীদের উপর অতিরিক্ত বিষয় চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তাদের মৌলিক দক্ষতা; যেমন বিশ্লেষণী চিন্তাভাবনা, সমস্যা সমাধান, এবং সৃজনশীলতা উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কম বিষয়, কিন্তু গভীরতর শিক্ষা এই নীতিই হতে পারে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি।
শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষকদের জাতির মেরুদণ্ডের চিকিৎসক হিসেবে যে উপমা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষকরা শুধু পাঠদান করেন না; তারা একটি প্রজন্মের চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা গড়ে তোলেন। কিন্তু শিক্ষকদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হলে তাদের কাজের পরিবেশ, প্রশিক্ষণ এবং প্রণোদনা ব্যবস্থাও উন্নত করতে হবে।
অন্যথায় কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্যে থেকে তারা কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবেন না। বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক সুবিধার পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির চালিকাশক্তি হতে পারে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী ও দক্ষ করতে হবে। দীর্ঘসূত্রিতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং পরিকল্পনার অভাব; এই তিনটি বড় বাধা দূর না করলে আমরা এই সুযোগ হারানোর ঝুঁকিতে পড়ব।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখনও পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার গণ্ডি থেকে বের হতে প্রস্তুত? যদি শিক্ষা শুধু পরীক্ষা এবং ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সময়সূচির সামান্য পরিবর্তন হয়তো কিছু সমস্যার সমাধান করবে, কিন্তু মূল সমস্যার নয়। আমাদের প্রয়োজন একটি সামগ্রিক সংস্কার, যেখানে শিক্ষার্থীর শেখার অভিজ্ঞতা, দক্ষতা অর্জন এবং বাস্তবজীবনের প্রস্তুতি; এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। এই প্রেক্ষাপটে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনা এবং দ্রুত ফলাফল প্রকাশ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে। তবে এটিকে একটি বৃহত্তর সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
শিক্ষা যদি সত্যিই জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে সেই মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী ও কার্যকর রাখতে সময়ের অপচয় নয়, বরং সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য। বাংলাদেশের তরুণদের সামনে যে সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত, তা কাজে লাগাতে হলে এখনই সাহসী ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার এই দীর্ঘসূত্রিতা দূর করা শুধু একটি প্রশাসনিক সংস্কার নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
লেখক : ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েট এন্ড কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ (বাংলাদেশ), আইএসএইচআর।
এইচআর/এএসএম