পশুপাখির প্রতি নিষ্ঠুরতা : আমরা কবে মানবিক হবো?

শান্তা মারিয়া
শান্তা মারিয়া শান্তা মারিয়া , কবি ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০২:৪৬ পিএম, ১১ এপ্রিল ২০২৬

বাগের হাটে খান জাহান আলীর (রহ) মাজারে সম্প্রতি একটি জীবন্ত কুকুরকে কুমিরের মুখে ছেড়ে দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বেশ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকা এ নিয়ে রিপোর্ট করেছে যেখানে মাজারের কর্মীদের কিছু ব্যাখ্যাও শোনা গেছে। তারা বলেছে কুকুরটি নাকি পাগল ছিল। তবে ভিডিওতে কিন্তু একবারও মনে হয়নি কুকুরটি পাগল। বরং মনে হয়েছে তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে পা ভেঙে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কুকুরটি যদি পাগলও হয়ে থাকে তাহলেও তো তাকে কুমিরের মুখে ফেলে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বাগেরহাটের এই ঘটনা আজকে ফেসবুকে আসাতে সবাই জানতে পারছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো এমন ঘটনা ওখানে বহুবছর ধরেই ঘটে চলেছে। এই মাজারে শত শত বছর ধরে ধলা পাহাড় ও কালা পাহাড় নামে কুমির পোষা হয়। প্রাকৃতিকভাবে একটি কুমির মারা গেলে আবার অন্য কুমির নিয়ে আসা হয়। সেই কুমিরের খাদ্য হিসেবে জীবন্ত মুরগি ও ছাগল ছুঁড়ে দেওয়ার রীতিও বহু বছর ধরেই চলছে। কুমিরকে বাজার থেকে কিনে আনা মাংস খাওয়ানো এক কথা। আর জীবন্ত প্রাণী তার মুখে ছুঁড়ে দেওয়া আরেক কথা।
এখানে একটু ব্যক্তিগত কথা বলি।

আমি ছোটোবেলায় একবার বাগেরহাট বেড়াতে গিয়েছিলাম। তখন দেখেছিলাম ওখানে জীবন্ত মুরগি কুমিরের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হয়। একটি না, একের পর এক। এটা একটা খেলা। ঘটনাটি আমার মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কারণ আমার বাড়িতে বেশ কিছু পোষা মুরগি ছিল যেগুলোকে আমি খেলার সাথী ভাবতাম। আমি কান্নাকাটি করার পর, আমার বাবা সাথে সাথে গিয়ে প্রতিবাদ করেন। কিন্তু প্রবল ক্ষমতাধর মাজার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তিনি কিছুই করতে পারেননি।

তখন শুনেছিলাম, অনেক মানুষ নাকি ওখানে জীবন্ত প্রাণী মানত করে। এটা নাকি বহুযুগ ধরে চলে আসা রীতি।

সেসময় মানুষের পশুপাখির প্রতি কোনো মমতাই ছিল না। এখন তো তবু অল্প কিছু মানুষ হলেও প্রতিবাদ করছে। ঢাকা চিড়িয়াখানায় কিছুদিন আগেও অজগর সাপের খাওয়ার জন্য জীবন্ত প্রাণী যেমন- খরগোশ, ইত্যাদি দেওয়া হয়েছে।

আমার কথা হলো, বাংলাদেশের মানুষ পশুপাখির প্রতি এত নিষ্ঠুর আচরণ কীভাবে করে?

এগুলো আজকের নতুন কোনো ঘটনা নয়। অনেকবারই দেখেছি গলির নিরীহ কুকুরের লেজে বাজি পটকা আটকে দিয়ে মজা দেখা কিংবা কুকুরকে মেরে কোমর বা পা ভেঙে দেওয়া অনেক মানুষের(পড়ুন অমানুষ) কাছে একটা খেলা। বস্তির বা রাস্তার ছিন্নমূল অনেক শিশুকিশোরকে দেখেছি বিড়াল বা বিড়ালের ছানাকে গলায় দড়ি দিয়ে পুকুরে ডুবাতে।

আমি ছোটোবেলায় একবার বাগেরহাট বেড়াতে গিয়েছিলাম। তখন দেখেছিলাম ওখানে জীবন্ত মুরগি কুমিরের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হয়। একটি না, একের পর এক। এটা একটা খেলা। ঘটনাটি আমার মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কারণ আমার বাড়িতে বেশ কিছু পোষা মুরগি ছিল যেগুলোকে আমি খেলার সাথী ভাবতাম। আমি কান্নাকাটি করার পর, আমার বাবা সাথে সাথে গিয়ে প্রতিবাদ করেন। কিন্তু প্রবল ক্ষমতাধর মাজার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তিনি কিছুই করতে পারেননি।

ছোটোবেলায় দেখেছি আমার মা সবসময় তার সাধ্যমতো প্রতিরোধ করতেন এবং পাড়ার শিশুকিশোরদের বুঝিয়ে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করতেন। শুধু পথশিশু বা বস্তির শিশু কিশোরদের নয়, অনেক বড় মানুষকেও দেখেছি বিড়ালের ছানা বস্তায় ভরে পানিতে ফেলতে। আমি বুঝতে পারি না, মানুষ এত নিষ্ঠুর হয় কীভাবে।

আরও একটা নিষ্ঠুরতা খুব বেশি দেখা যায়। সেটা হলো কোনো বিড়াল বা কুকুরের বাচ্চা কয়েকদিন বাড়িতে পুষে তারপর শখ মিটে গেলে ফেলে দেয়। আবার অনেকে বাড়ি বদলানোর সময় পোষা প্রাণীকে রাস্তায় ফেলে চলে যায়।

গ্রামে আরেকটা বিষয় খুব দেখা যায়। প্রতিবেশীকে জব্দ করতে তার কুকুর, বিড়াল, গরু, ছাগলকে বিষ খাইয়ে বা অন্য কোনোভাবে মেরে ফেলা। এরা মানুষ না অমানুষ।

বনের বানরকে ঢিল ছোঁড়া, তাকে বাগে পেলে হত্যা করার ঘটনাও অনেক শুনেছি।

কিছুদিন আগে বেশ কয়েকটি কুকুর ছানাকে পানিতে ডুবিয়ে মারার ঘটনা ভাইরাল হয়। ওই ঘটনায় খুনি মহিলার কি শাস্তি হয়েছিল আমার অবশ্য জানা নেই।

অতিথি পাখি বিষটোপ দিয়ে মারা তো কয়েক বছর আগেও ছিল খুবই স্বাভাবিক। এখন অতিথি পাখি শিকার বন্ধ হলেও সেটা কতজন মানছেন, কতটা মানছেন সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ।

একটি দেশ বা সমাজ কতটা মানবিক সেটা বোঝার একটি মানদণ্ড হলো অবলা প্রাণীর প্রতি তাদের আচরণ।

অশিক্ষিত, কুশিক্ষিত, বর্বর জনগোষ্ঠী পশুপাখির প্রতি চরম নিষ্ঠুরতা করে। তাদের মানুষের প্রতিই কোনো মমতা নেই, প্রাণী তো দূরের কথা।
বাংলাদেশের মানুষ কবে সত্যিকারের মানবিক মানুষ হবে জানি না।

আমার মতে, পশুপাখির প্রতি নিষ্ঠুরতার ঘটনার কঠোর বিচার এবং অপরাধীর শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। দুয়েকটি ঘটনার কঠোর বিচার, শাস্তি ও সাজা কার্যকর হলেই অন্যরা সাবধান হবে। টিভিতে সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপনও প্রচার হওয়া দরকার।

লেখক : চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কবি, কলামিস্ট।

এইচআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।