এভাবে চলে যেতে নেই

হাবীবাহ্ নাসরীন
হাবীবাহ্ নাসরীন , কবি ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: ১২:৪৮ পিএম, ২২ জানুয়ারি ২০১৮
এভাবে চলে যেতে নেই

যে বাবা ঘরের দরজা ভেঙে সন্তানের মৃতদেহ ঝুলতে দেখলেন, যে মা নিজ হাতে দড়ি কেটে সন্তানের ঝুলন্ত মৃতদেহটি নামালেন, আমি তাদের কথা ভাবি। কতটা ব্যথা, কতটা দহন নিয়ে তারা বাকি জীবনটা কাটাবেন সেটি ভাবলেই আমি শিউরে উঠি! পিতার কাঁধে সন্তানের লাশকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বস্তু, তবুও তো তা স্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে। কিন্তু সন্তান যখন স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বেছে নেয়; মায়ের ভালোবাসা, বাবার স্নেহ, বোনের খুনসুটি সবকিছুকে তুচ্ছ করে মৃত্যুকেই তার আপন মনে হয়, তখন বাকি মানুষগুলো- যারা এই ব্যথা সহ্য করেই বাকি জীবন বেঁচে থাকবেন তাদের অসহায়ত্বের কথা ভেবে আমার ভীষণ মন খারাপ হয়।

আপনি কি জানেন, আত্মহত্যার মাধ্যমে আপনি কী প্রমাণ করলেন? আপনি প্রমাণ করলেন, আপনি হচ্ছেন পৃথিবীর নিকৃষ্টতম স্বার্থপর মানুষটি! যে শুধু নিজের 'মুক্তি'র কথা ভেবে বাকি সবাইকে কষ্ট দিয়ে গেল। খুব জানতে ইচ্ছে করে, বেঁচে থাকতে আপনি কী করতেন যখন কেউ আপনার মায়ের চোখে জল ঝরাতো, যখন আপনার বাবার অসহায় মুখটি দেখতেন? আপনি কি এর শোধ নিতেন না? অথচ সেই মানুষটিই আপনি! আপনার কারণেই আপনার মা-বাবার চোখে জল ঝরছে! তারা অসহায় বোধ করছেন! এর মানে কিন্তু এই নয় যে, যার জন্য কেউ কাঁদার নেই তিনি স্বেচ্ছামৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন! যে শরীর আপনি নিজে তৈরি করেননি, তাকে কষ্ট দেয়ার অধিকারও আপনার নেই।

একটু চারপাশে তাকান। রাস্তার কুকুরের সঙ্গে ডাস্টবিনের খাবার ভাগ করে খাওয়া ছেলেটি তো আত্মহত্যা করছে না! মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো কিশোরীটি তো আত্মহত্যা করছে না! এর কারণ সুখ নয়, স্বপ্ন! পরের বেলার খাবার জোগার করাটাই ওদের স্বপ্ন, বেঁচে থাকাটাই ওদের আকাঙ্ক্ষা। স্বপ্নের তো কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। বুঝলাম আপনার একটি স্বপ্ন শেষ হয়ে গিয়েছে। আরো দশটা স্বপ্ন তৈরি করে নিন না! আপনার মাথার ওপর ছাদ আছে, পেটে খাবার আছে, মাথায় বুদ্ধি আছে। আপনি যথেষ্ট সৌভাগ্যবান। আপনার সুযোগ রয়েছে নিজের জন্য, মানুষের জন্য ভাবার। নিজের জন্য বেঁচে থাকার কারণ খুঁজে না পেলে মানুষের জন্য বাঁচুন। যখন আপনি জানবেন আমাদের জন্ম নেয়ার উদ্দেশ্য এবং কর্তব্য, আপনার আর কোনোদিন মরতে ইচ্ছে করবে না!

বুঝলাম, আপনার বুক ভরা অভিমান। আপনার চোখ ভরা জল মুছে দেয়া কেউ নেই। একটু ভাবুন তো, আপনি নিজেই নিজেকে ভালোবাসেন কি না? সম্ভবত বাসেন না। যাকে ভালোবাসে তাকে কেউ শেষ করে দেয়? আপনি নিজেই যদি নিজেকে ভালো না বাসেন আরেকজনের কী এমন দায় পড়েছে আপনাকে ভালোবাসার! নিজেকে দামী এবং মূল্যবান করে রাখলেই কেবল আরেকজনের কাছ থেকে মূল্যায়ন আশা করতে পারেন।

আপনি মরে গিয়েছেন। বিশ্বাস করুন, সবকিছু আগের মতোই আছে। আজ সকালেও পাখি ডেকেছে। মোড়ের মুচি লোকটি প্রতিদিনের মতোই তার পসরা সাজিয়ে বসেছে। আপনার বারান্দার টবে নতুন ফুল ফুটেছে প্রকৃতির নিয়মে। শুধু আপনি নেই। কারোই কোনো ক্ষতি হয়নি। অথবা ভুল বললাম, ক্ষতি হয়তো হয়েছে। আপনার হাত ধরে যে পৃথিবী বদলে যেতে পারতো, সেই যাত্রা হয়তো কিছু ধীর হয়ে গেল। পৃথিবী আগাবেই। তারুণ্য হচ্ছে পৃথিবীর প্রাণ। আপনার বয়সী কোনো তরুণ যখন পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বসে নতুন কোনো সম্ভাবনার রহস্য উন্মোচন করছে আপনি তখন ফ্যানের সঙ্গে দড়ির গিট্টু বাঁধছেন- কী লজ্জাজনক, না? নিজেকে ভালোবেসে বাঁচুন। এই বিশাল মহাবিশ্বের আপনিও সমান অংশীদার। অকারণে অধিকার কেন ছেড়ে দেবেন?

লেখক : কবি, সাংবাদিক।

এইচআর/পিআর

আপনি কি জানেন, আত্মহত্যার মাধ্যমে আপনি কী প্রমাণ করলেন? আপনি প্রমাণ করলেন, আপনি হচ্ছেন পৃথিবীর নিকৃষ্টতম স্বার্থপর মানুষটি! যে শুধু নিজের 'মুক্তি'র কথা ভেবে বাকি সবাইকে কষ্ট দিয়ে গেল। খুব জানতে ইচ্ছে করে, বেঁচে থাকতে আপনি কী করতেন যখন কেউ আপনার মায়ের চোখে জল ঝরাতো, যখন আপনার বাবার অসহায় মুখটি দেখতেন? আপনি কি এর শোধ নিতেন না?