ডাকসু নির্বাচন ও ছাত্ররাজনীতি

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা , প্রধান সম্পাদক, জিটিভি
প্রকাশিত: ০৯:৫৬ এএম, ১২ জানুয়ারি ২০১৯

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ - ডাকসু নির্বাচন তাহলে হতে চলেছে? জানা গেল, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তে নির্বাচনের ওপর বিধিনিষেধ উঠে গেছে। সেই কবে স্বৈরাচারের আমলে সবশেষ হয়েছিল, তারপর গণতন্ত্রের যাত্রা শুরুর পর এ পথে হাঁটেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এমনকি ছাত্র সংগঠনগুলোও। ডাকসু হয়নি, তাই আর কোন বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজেও ক্যাম্পাস গণতন্ত্র আসেনি।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা চায়, চায় সমাজের নানা শ্রেণি পেশার মানুষও। কারণ তারা মনে করেন ভবিষ্যতের জাতীয় নেতৃত্ব তৈরি করতে এই ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলো বড় ভূমিকা রাখবে। তাছাড়া নির্বাচন না হওয়ায় সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি থাকছে না, ক্যাম্পাসে কোন গণতান্ত্রিক চর্চা হচ্ছে না। যখন যে দল রাষ্ট্র ক্ষমতায় সেই দলে ছাত্র সংগঠন ও শিক্ষক সংগঠনের একচ্ছত্র আধিপত্য সবাইকে মেনে নিতে হচ্ছে।

কিন্তু ক্যাম্পাস রাজনীতির আজকের প্রেক্ষাপটের সাথে স্বৈরাচার পূববর্তী সময়ের তুলনা আর টিকছে না। নব্বইয়ের গণ–আন্দোলনে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর ছাত্ররাজনীতির ধারাবাহিকতা আর বজায় থাকেনি। একটা দাবি ছিল ছাত্র সংগঠনগুলো জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি যেন না করে। কারণ এমন অবস্থায় নির্বাচন হলেও এখানে সুস্থ কোন কিছু হবে সেটা আর মনে করছে না কেউ।

ক্যাম্পাসে ক্ষমতাসীন দলের বিশাল মিছিল হয়। হ্যাঁ মিছিলে যেতে হয় ছাত্রছাত্রীদের, কিন্তু এই ছাত্র ছাত্ররাজনীতি সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে কতজন ছাত্রছাত্রী জড়িত এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নতি প্রসঙ্গে তাদের সত্যিকারের ভূমিকা কী এমন প্রশ্নের উত্তর একদমই অজানা।

গণতান্ত্রিক দেশে গণতান্ত্রিক চেতনা তৈরি ও অধিকার রক্ষার জন্যই ছাত্ররাজনীতির গুরুত্ব অনেক। কিন্তু বাস্তব অন্য কথা বলে। আমার নিজের ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে কথা বলে যেটুকু বুঝি, সেটা হল অধিকাংশ শিক্ষার্থী ছাত্র রাজনীতি পছন্দ করেনা এবং তাদের অভিভাবকরাও চান না তাদের সন্তানরা রাজনীতির সাথে জড়িত হোক।

আমার শিক্ষার্থীরা আমাকে বলেছে, ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে এসে ক্যাম্পাস রাজনীতিকে পরিচালিত করার যে জাতীয় রাজনীতি আছে তাতে ছাত্রসংগঠনগুলো কেবল ব্যবহৃতই হয়, কোন গঠনমূলক ভূমিকা তাদের থাকেনা।

নির্বাচন হলে সিনেটে কথা বলবে, নবীনবরণ উৎসব হবে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে, পত্রিকা প্রকাশ হবে। কিন্তু শিক্ষক রাজনীতির যে করুণ দশা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক যে অবক্ষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাতে, এই নির্বাচিতরা সত্যিকার অর্থে কি ভূমিকা রাখবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে।

আসলে সামগ্রিকভাবেই একটা প্রশ্ন বারবার উঠছে সমাজে। ছাত্র রাজনীতির কি আদৌ কোনও দরকার আছে? সমাজ মনে করে, শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা মনে করে, ছাত্র রাজনীতিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলির কাছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখলের সুবর্ণ সুযোগ তারা পেয়ে বসে। এ ব্যাপারে সব দলই সমান দায়ী। ভাবনাটা এমন যে, ক্যাম্পাস দখলকে কেন্দ্র করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে।

আঠারোর পরে সকলেই তো ভোটের অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক। তাহলে তারা রাজনীতি করবে না কেন? অবশ্যই করবে। তবে সে রাজনীতি কেমন হবে, সেটাই ভাবনা। দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি তার আঠারোর স্বাধীন ভাবনাকে সমর্থন করে না। একজন চাইলে দলও করতে পারে, কিন্তু দলের দ্বারা ব্যবহৃত রাজনীতি, যে রাজনীতি পুরোটাই চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও রক্তারক্তি নির্ভর। সেই রাজনীতি করবে কিনা সেটা তার উপরই ছেড়ে দেয়া যদি যেত তাহলে বোঝা যেত তারা আমলে কী চায়।

নব্বই সালে সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে এই নির্বাচনটি ঝুলে ছিল। এর সপক্ষে বহু দাবিদাওয়া জানানো হয়েছে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা বিবেচনায় নেয়নি। সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায়ের পর এখন এই নির্বাচন অনুষ্ঠান একটি বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনকে অর্থপূর্ণ করার অন্যতম শর্ত ছিল বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় নির্বাচিত ছাত্রপ্রতিনিধির অংশগ্রহণ। কিন্তু এখন স্বায়ত্তশাসনের ধারণায় ব্যাপক ধস নেমেছে। সিনেটে শিক্ষক প্রতিনিধিদের নির্বাচন যেভাবে হয়, বা রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচন যেভাবে হয়, তা কোন সুস্থতার লক্ষণ নয়।

এই সংস্কৃতির কারণে দলীয় রাজনীতিতে যোগ দিয়ে ছাত্ররা বিদ্বেষ আর হিংসার চর্চা করতে শেখে। এটি একটি সংকট। কিন্তু সবাই কি তা করে, নিশ্চয়ই নয়। ভাল ছাত্র রাজনীতিকও আছে, তবে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য নয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর অংশ ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হতে চায় না।

যেখানে রাজনৈতিক প্রচার এত ব্যাপক, দলে টানার চেষ্টা এত প্রবল, সেখানে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী যে দলীয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে, তার কারণ এই নয় যে তারা অরাজনৈতিক। বরং সেটা তাদের সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। রাজনীতি সম্বন্ধে তারা অজ্ঞ নয়, বাস্তব রাজনীতির ভাল-মন্দ দুটোই তাদের অভিজ্ঞতায় আছে। দলীয় সংগঠনের বশংবদ হতে চায় না বলেই দলে যোগ দেয় না।

তাই ডাকসু নির্বাচন হোক, কিন্তু এই বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হোক। ক্যাম্পাস গণতন্ত্রকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে যদি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় তবে তাহবে সবচেয়ে কাঙ্খিত। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করুক যাতে উৎসবমুখর পরিবেশে সবার অংশগ্রহণে ও কোনো রকম অনিয়ম ছাড়াই ছাত্ররা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারে।

সব ক্যাম্পাসেই এই পরিবর্তন আনা যায়, যদি শিক্ষকরা মিলে তাদের স্বশাসনের অধিকার এবং ছাত্রদের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেন। এর জন্য রাজনৈতিক দলের সম্মতি প্রয়োজন হয় না, সরকারের কাছেও যাওয়ার দরকার হয় না। দরকার শুধু নিজেদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি মমতা, নিজেদের আর তাদের ছাত্রছাত্রীর ওপর আস্থা। শিক্ষক হয়ে যদি শিক্ষাকে তারা ভালবাসেন তবে তারা অগ্রসর হবেন নিশ্চয়ই।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, জিটিভি।

এইচআর/এমএস

‘সব ক্যাম্পাসেই এই পরিবর্তন আনা যায়, যদি শিক্ষকরা মিলে তাদের স্বশাসনের অধিকার এবং ছাত্রদের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেন। এর জন্য রাজনৈতিক দলের সম্মতি প্রয়োজন হয় না, সরকারের কাছেও যাওয়ার দরকার হয় না। দরকার শুধু নিজেদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি মমতা, নিজেদের আর তাদের ছাত্রছাত্রীর ওপর আস্থা।’

আপনার মতামত লিখুন :