ধূসর জীবনের গল্প

ফারহানা মোবিন
ফারহানা মোবিন ফারহানা মোবিন , লেখক এবং চিকিৎসক
প্রকাশিত: ১০:১৭ এএম, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯

 

সবার উত্তেজনামিশ্রিত মধুর প্রতীক্ষাটি শেষ হলো। অপারেশন থিয়েটারের লাল লাইটটি নিভে গেল। চিকিৎসক বয়ে আনলেন মেয়েসন্তান জন্মের বার্তা। মেয়ে জন্মানোর দুঃখে পাষাণ বাবা গৃহত্যাগ করলেন। সেই বাবা আজও ফিরে আসেন নি। চরম দুর্দশা ও নির্যাতনের শিকার হলেন মা ও শিশুটি।

ফুল হয়ে সুরভি ছড়ানোর আগেই অকালে ঝরে যাচ্ছেন অনেক নারী। এ দেশের অজস্র নারী এখানো বিভিন্নভাবে পারিবারিক, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে নির্যাতিত হচ্ছেন। যা কখনোই কাম্য নয়। আর এই পরিসংখ্যান শহরের তুলনায় গ্রামে খুব বেশি ভয়ানক। শুধু শহরের নারীরা এগিয়ে গেলে হবে না, গ্রামাঞ্চলের নারীদেরকেও এগিয়ে যেতে হবে। পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নারী মানে দেশের সুযোগ্য নাগরিক, একটি সন্তানের সুযোগ্য মা, একটি শিশুকে সুযোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কারিগর।

প্রতিবছর ২৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিবাদ দিবস পালন করা হয়। দিবসটির উদ্দেশ্য সফলের জন্য বিভিন্ন সভা, সেমিনার, পরিকল্পনা প্রণয়ন হয়। আমাদের সবার উচিত সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ গড়ে তোলা। তা না হলে নির্যাতন মহামারির রূপ নেবে। আর সেই আগুনে জ্বলে যাবে আমাদেরই প্রিয়জনের ঘর। প্রিয় পাঠক, আজ আমরা শুনব এমনই কয়েকজন ভাগ্যহীনার কথা, যাদের ধূসর জীবন হয়ে গেছে ঝরাপাতা।

কেস স্টাডি-০১
ওষুধ কোম্পানিতে চাকরিরত শান্তা (ছদ্মনাম) বলেন, ‘এম এ পাসের দীর্ঘ তিন বছর পর অনেক কষ্টে চাকরি পেয়েছি। আমার চরিত্রহীন বসের কুদৃষ্টি, নোংরা আচরণ সত্ত্বেও চাকরি ছাড়তে পারছি না। মৃত বাবার সংসারে আমিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। স্কুল-কলেজগামী চার ভাইবোনের খরচ আমাকেই চালাতে হয়। সামান্য বেতনে কলুর বলদের মতো কাজ করি।

বসের আতঙ্কে কাজে মনোযোগ দিতে পারি না। অকারণে বস আমাকে তাঁর রুমে বারবার ডেকে পাঠায়। ভয়ে আমার রক্ত জমাট বেঁধে যায়। মানুষ নামের ওই প্রাণীটি অসংখ্য বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ক্ষমতার জোরে আমার মতো অসংখ্য অসহায়কে নির্যাতন করেন তিনি। নতুন কোথাও চাকরির জন্য প্রতিদিন পথ চেয়ে থাকি।’

কেস স্টাডি-২
কাজের বুয়া মোমেনার (ছদ্মনাম) বাবা বলেন, ‘পেটের দায়ে কাজ করতে গিয়ে গৃহকর্তার নির্যাতনের শিকার হয় আমার মেয়ে। গৃহকত্রীর চোখের আড়ালে তাকে গর্ভবতী বানিয়ে দেয়। পাঁচ মাসের গর্ভস্থ শিশুকে নষ্ট করতে গিয়ে আমার মেয়ে চলে গেল না ফেরার দেশে।

অর্থাভাবে আমাদের ভাগ্যে মেলেনি আইনের আশ্রয় অথচ বুকে আশ্রয় নিয়েছে ব্যথার জগদ্দল পাথর।’ সেই চরিত্রহীন পুরুষটা সবাইকে বলে বেড়াচ্ছে, আমার মেয়ে নাকি চরিত্রহীন। জানি, মানুষের আদালতে ঐ পশুটার কোনদিন বিচার হবে না, আল্লাহ আদালতে তার বিচার হবেই।

কেস স্টাডি-৩
রাজধানীর রায়ের বাজারের মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীর স্ত্রী মহুয়া সেন (ছদ্মনাম) বলেন, ‘দীর্ধ পাঁচ বছরের প্রেমে বসেছিলাম বিয়ের পিঁড়িতে। অথচ বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই দুচোখ ভরা স্বপ্নগুলো ভেঙে গেল বালির বাঁধের মতো। যৌতুকের জন্য স্বামীর কাছে থেকে পেতাম অশ্রাব্য ভাষার গালি আর শারীরিক নির্যাতন। এতে তার মা, ভাইবোনদেরও সমর্থন ছিল। অথচ প্রেম করে, পরিবারের অমতে বিয়ে করেছিলাম। আমার পঙ্গু বাবার সংসারে আমিই বড় সন্তান।

আমার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আমার মা তার শাশুড়ির দেওয়া একমাত্র সীতাহারটি (গলার মালা) গোপনে বিক্রি করে দিয়েছেন। সীতাহারের পুরো টাকাটা স্বামীর হাতে তুলে দিয়েছি। তবু লোভের শেষ নেই, আরও চায়। আমার স্বামীর ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বাসায় কাজের বুয়া রাখতে দেয় না, দোতলা বাড়ির পুরো কাজ আমাকেই করতে হয়।

রাতে খাই দুপুরের খাবার আর গভীর রাতে খাই স্বামীর মার। লজ্জায়-দুঃখে মুখ গুঁজি বালিশে। আমার কান্না দেখে তিন বছরের কন্যাসন্তানটিও কাঁদতে থাকে। এমন অত্যাচারী মানুষের কাছে আমার একদিনও ইচ্ছা করে না, শুধু আমার সন্তানের জন্যই থাকি। আমি অষ্টম শ্রেণি পাস। চাকরিও তো পাব না, পঙ্গু বাবার সংসারে আমি আর বোঝা হতে চাই না। আমি চাই, আমার মেয়েটা লেখাপড়া শিখে শক্ত-সমর্থ হোক, এ সমাজ তাঁকে সম্মান করুক। কোনো নারীকে যেন আমার মতো নির্যাতন সহ্য করতে না হয়।’

কথাগুলো বলতে গিয়ে নির্যাতিতা মহুয়া সেনের দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল শ্রাবণধারা। দুচোখের রক্তিম বর্ণ কপালের সিঁদুরকেও হার মানিয়েছিল।

আজকের নারী আগামী দিনের মা, একটা পরিবারের মূল চালিকাশক্তি। জাতির স্বার্থেই নারী নির্যাতন রোধ করতে হবে। আমরা চাই নারী নির্যাতনমুক্ত বাংলাদেশ এবং নারী-পুরুষের সমান অধিকার। সমাজের সঠিক বিকাশ।’ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মতামতের ভিত্তিতে নির্যাতন প্রতিরোধে আমার করণীয়-

১. সরকারি ও বেসরকারি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সংস্থাগুলোকে আরও কার্যকর হতে হবে। নির্যাতন প্রতিরোধ সংক্রান্ত আইন ও তার প্রতিকার বিষয়ক লিফলেট বিতরণ করতে হবে।
২. নারী নির্যাতন বিষয়ে গবেষণা বাড়িয়ে জনমত তৈরি করতে হবে। নারীর জীবনের নানা তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করে সমাজে নারীবান্ধব নীতি বাড়াতে হবে।
৩. গণযোগাযোগ মাধ্যম যেমন- টিভি, রেডিও, সংবাদপত্রগুলোকে প্রচুর পরিমাণে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।
৪. অশিক্ষিত ও দরিদ্র নারীরাই নির্যাতনের শিকার হন বেশি। তারা যেন বিনামূল্যে নির্যাতনের প্রতিকার ও আইনের সুবিধা পায় তার জন্য সরকারকে আরও কর্মতৎপর হওয়া প্রয়োজন।
৫. জাত, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে প্রতিটি নারীকে শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হওয়া একান্ত জরুরি। প্রতিটি মানুষের উচিত নারীকে সর্বপ্রথমে মানুষ হিসেবে গণ্য করা এবং পুরুষের সমপর্যায়ে সুযোগ দেওয়া।
৬. আজকাল পাঁচ বছরের শিশুও নির্যাতিত হচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মধ্যে প্রতিরোধমূলক মনোভাব গড়ার জন্য মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ বইয়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ বিষয়ক পাঠ্যসূচি থাকা অপরিহার্য।
৭. স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যে নিয়মিত গোলটেবিল বৈঠক হওয়া প্রয়োজন, এতে দ্রুত গণসচেতনতা বাড়বে।

এদেশ থেকে নির্মূল হোক নারী নির্যাতন, আমরা কোনো নারীর ধূসর জীবন চাই না। প্রতিটি নারীর সাফল্য হোক আগামী সূর্যোদয়ের মতো উজ্জ্বল। নারী পুরুষের সম্মিলিত সফলতায় গড়ে উঠুক সোনার বাংলাদেশ।

লেখক : চিকিৎসক।

এইচআর/এমএস

‘এদেশ থেকে নির্মূল হোক নারী নির্যাতন, আমরা কোনো নারীর ধূসর জীবন চাই না। প্রতিটি নারীর সাফল্য হোক আগামী সূর্যোদয়ের মতো উজ্জ্বল। নারী পুরুষের সম্মিলিত সফলতায় গড়ে উঠুক সোনার বাংলাদেশ।’

আপনার মতামত লিখুন :