মধ্যপ্রাচ্য কী আরও উত্তাল হবে?

প্রশান্ত কুমার শীল
প্রশান্ত কুমার শীল প্রশান্ত কুমার শীল , গণমাধ্যম শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
প্রকাশিত: ০৮:৪৪ এএম, ০১ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও ধোঁয়া জমছে। যুদ্ধের গন্ধ বাতাসে। একদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এর দ্বন্দ্ব। অন্যদিকে চলমান ইসরায়েল ও হামাস সংঘাত। এই উত্তপ্ত সময়েই তেল আভিভে পৌঁছেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সফরটি যেন কেবল সফর নয়, বরং একটি বার্তা। একটি অবস্থান। আর সেই অবস্থানই নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে খোদ ভারত নিজেই। তবে কি এবার সত্যি ভারত ধীরে ধীরে এক মেরুর দিকে ঝুঁকছে?

তেল আভিভ বিমানবন্দরে স্বাগত জানাতে হাজির ছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। উষ্ণ আলিঙ্গনের ছবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বমাধ্যমে। এই আলিঙ্গন কূটনীতির ভাষায় প্রতীক। আবার সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা দেখানোর দৃশ্যমান উপায়ও বটে। বৈঠকের আলোচনায় উঠে আসে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, কৃষি ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা। কিন্তু দৃশ্যের আড়ালে ছিল বড় প্রশ্ন—এই ঘনিষ্ঠতা কতটা কৌশল, আর কতটা আসক্তির?

ইসরায়েল বহুদিন ধরেই আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ার কথা বলছে। নেতানিয়াহু এবার ‘ষড়ভূজ’ নামে একটি জোটের ধারণা সামনে এনেছেন। লক্ষ্য হলো চরমপন্থার মোকাবিলা। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল নিরাপত্তা উদ্যোগ নয়; বরং সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক এর সম্ভাব্য ‘ইসলামিক ন্যাটো’ ভাবনার পাল্টা কৌশল। এই প্রস্তাবে ভারতকে পাশে চাইছে ইসরায়েল। প্রশ্ন এখানেই, ভারত কি সেই আহ্বানে সাড়া দেবে এবার?

এটা ঠিক মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ভারতের অবস্থান সহজ নয়। ইসরায়েল ভারতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সহযোগী। আধুনিক প্রযুক্তি, অস্ত্র, গোয়েন্দা সহযোগিতা সব ক্ষেত্রেই সম্পর্ক গভীর রয়েছে এই দুই দেশের সাথে। কিন্তু একই সঙ্গে ভারতের অর্থনীতি, জ্বালানি ও প্রবাসী শ্রমবাজার গভীরভাবে নির্ভরশীল এই উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর। ভারতের রেমিট্যান্সের সিংহভাগ আসে এই মধ্য প্রাচ্য থেকে। এখানে ভারতের শ্রমবাজারের পাশাপাশি বিশাল বাণিজ্য জড়িত। আর ইরানের সাথে রয়েছে ভারতের কৌশলগত দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। শুধু চাবাহার বন্দর নয়, রয়েছে বহু অবকাঠামো ও বাণিজ্যে বিনিয়োগ। এই চাবাহার বন্দর হলো মধ্য এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যের বাণিজ্যপথ। এই পথ ভারতের জন্য ও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অতিরিক্ত ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতা নয়াদিল্লির জন্য সুযোগ যেমন তৈরি করবে, তেমনি ঝুঁকিও বাড়াবে দ্বিগুণ।

ইসলামাবাদের প্রতিক্রিয়া এই উদ্বেগকে আরও স্পষ্ট করছে। পাকিস্তান সংসদে নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে এটি নিয়ে। ইসরায়েলের জোট প্রস্তাবকে মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে উদ্যোগ বলা হয়েছে। এই প্রতিক্রিয়া দেখানোর মধ্যে, ‘ষড়ভূজ’ ধারণাটি ইতিমধ্যেই ভূরাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে। অর্থাৎ বিষয়টি কেবল একটি সফর নয়; বরং এটি শক্তির নতুন মানচিত্র আঁকারও সম্ভাবনা।

মোদির কূটনীতি গত এক দশকে বাস্তববাদী হয়েছে। তিনি বহুক্ষেত্রে সফল ও হয়েছেন। আবার কিছু জায়গায় পরাস্ত হয়েছেন। তিনি একই সঙ্গে ইসরায়েল ও আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়েছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। যুদ্ধ, জোট রাজনীতি ও মেরুকরণ—সব মিলিয়ে সিদ্ধান্তের মূল্য বেশি। যদি ভারত স্পষ্টভাবে এক মেরুর দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভারসাম্য নতুনভাবে নড়তে পারে। আর সেই নড়াচড়ার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়াতেও পৌঁছাবে।

শেষ পর্যন্ত কিন্তু প্রশ্নটি থেকেই যায়—মোদির ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতা কি কৌশলগত ভারসাম্যের অংশ, নাকি ধীরে ধীরে একপাক্ষিক ঝোঁক? কূটনীতিতে ঘনিষ্ঠতা দরকার, কিন্তু আসক্তি বিপজ্জনক। মধ্যপ্রাচ্য আজ এমন এক অঞ্চলে দাঁড়িয়ে, যেখানে ছোট সিদ্ধান্তও বড় উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। তাই ভারতের প্রতিটি পদক্ষেপ উপর এখন নজরে সবার। সরু সুতোয় হাঁটার এই মুহূর্তেই নির্ধারিত হবে—মধ্যপ্রাচ্য আরও উত্তাল হবে, নাকি ভারসাম্যের নতুন গল্প লেখা হবে।

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মিলে একদিকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ কথা ভাবছে দেশগুলো। ইসলামিক ন্যাটো' হলো মূলত ইসলামিক এবং আরব দেশগুলোর সমন্বয়ে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর আদলে একটি প্রস্তাবিত বা আলোচিত সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার জোট। অন্যদিকে নেতানিয়াহু নেতৃত্ব 'ষড়ভূজ' নামক নতুন জোটের ডাক এসেছে। এই জোটে নেতানিয়াহু ভারতকে পাশে চান। এছাড়া গ্রিস ও সাইপ্রাসকেও যুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তিনি। মূলত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মধ্যপ্রাচ্যে নিজের প্রভাব টিকিয়ে রাখতে এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটাতে ‘হেক্সাগন’ (ষড়ভুজ) আকৃতির এক নতুন আঞ্চলিক জোটের পরিকল্পনা পেশ করেছেন। তাইতো ভারতকে নিয়ে তার এতো মেগা পরিকল্পনা।

বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মধ্যপ্রাচ্য শুধু দূরের ভূরাজনীতি নয়; বরং এটি অর্থনীতি, প্রবাসী আয়ের উৎস ও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই ভারতের অবস্থান আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। মেরুকরণ বাড়লে উত্তেজনা বাড়বে, আর উত্তেজনা বাড়লে তার অভিঘাত সীমান্ত পেরিয়ে এখানেও আসতে পারে। আমরা কোন বিচ্ছিন্ন দেশ নয়। এর প্রভাব সরাসরি আমাদের উপর পরবে এটা দ্রুব সত্য।

শেষ পর্যন্ত কিন্তু প্রশ্নটি থেকেই যায়—মোদির ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতা কি কৌশলগত ভারসাম্যের অংশ, নাকি ধীরে ধীরে একপাক্ষিক ঝোঁক? কূটনীতিতে ঘনিষ্ঠতা দরকার, কিন্তু আসক্তি বিপজ্জনক। মধ্যপ্রাচ্য আজ এমন এক অঞ্চলে দাঁড়িয়ে, যেখানে ছোট সিদ্ধান্তও বড় উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। তাই ভারতের প্রতিটি পদক্ষেপ উপর এখন নজরে সবার। সরু সুতোয় হাঁটার এই মুহূর্তেই নির্ধারিত হবে—মধ্যপ্রাচ্য আরও উত্তাল হবে, নাকি ভারসাম্যের নতুন গল্প লেখা হবে।

লেখক : গণমাধ্যম শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
[email protected]

এইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।