গোষ্ঠীস্বার্থের রাজনীতি এখন অচল

মাসুদা ভাট্টি
মাসুদা ভাট্টি মাসুদা ভাট্টি , সাংবাদিক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০১:০৬ পিএম, ২৬ জানুয়ারি ২০১৯

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম উন্মুক্ত হওয়ার কারণে দেশে-বিদেশে চেনা ও অচেনা মানুষের ভাবনা সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে। বাংলাদেশে সদ্য সমাপ্ত সাধারণ নির্বাচন ও নবগঠিত সরকার সম্পর্কে পক্ষে-বিপক্ষে কে কি বলছেন বা ভাবছেন তাও এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকেই জানা যাচ্ছে। এ এক মহা সুযোগ সমাজ বা রাষ্ট্রের মানসচরিত জানার বা বোঝার।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রচরিত্র নিয়ে আমরা প্রায়শঃই দ্বিধায় পড়ে যাই যে, বাংলাদেশ আসলে কি? একটি গণপ্রজাতন্ত্রী সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে দেশটি প্রতিষ্ঠিত হলেও ক্রমশঃ দেশটি যে সাম্প্রদায়িক ও সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মের নির্দেশে পথ চলতে শুরু করেছে তা এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। বরং বিষয়টি এতোটাই প্রকাশিত যে, এ বিষয়ে বরং ভিন্নকিছু বলতে গেলেই তাকে কখনও ‘নাস্তিক’ কখনও বা ধর্মহীন আখ্যা দেওয়া হয় কিংবা চাপাতির কোপ খাওয়ার শঙ্কাও তৈরি হয়।

দীর্ঘ চল্লিশ বছরেও বেশি সময় ধরে ধীরে ধীরে বাংলাদেশ এই চরিত্র অর্জন করেছে। বলাই বাহুল্য দেশের রাজনীতিও এই চরিত্র অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচন আমাদের একথা জানাচ্ছে যে, বাংলাদেশ নিয়ে আশাহত হওয়ার আসলে ততোটা কারণ নেই, যতোটা এতোদিন ধরে অনেকেই হচ্ছিলেন।

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত শাসনভার গ্রহণ করার পর থেকে বাংলাদেশে নতুন এক ধর্মাশ্রয়ী শাসন কায়েম হয়। আজকে যারা দেশে গণতন্ত্র নেই, ইনসাফ নেই বলে চেঁচিয়ে চলেছেন তারা সেই শাসনব্যবস্থাকে কী নজরে দেখেন সে বিষয়ে যদিও স্পষ্ট করে কিছু বলেন না, কিন্তু কিছু একেবারেই দলীয় সদস্য ছাড়া বাকি সবাই মনে মনে হলেও একথা স্বীকার করেন যে, দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় ২০০১-এর শাসনব্যবস্থা ভয়ঙ্কর এক দানবীয় অনুপ্রবেশের মতো, যার ফলে বাংলাদেশের ধর্মাশ্রয়ী শক্তিটি (যারা একই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীও) রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদারীত্ব লাভ করেছিল। এমনকি নির্বাচন ব্যবস্থার যে ত্রুটি নিয়ে আজকে বিশিষ্ট বাঙালি পণ্ডিতগণ তাদের এবংবিধ তত্ত্ব হাজির করছেন তারা কিন্তু ২০০১-এর নির্বাচনকে বৈধ মনে করেন, যদিও সেই নির্বাচনে সেনাবাহিনীসহ আমলারা মিলে একটি রাজনৈতিক দলকে চরমভাবে পর্যুদস্ত করেছিল কারণ তারা মনে করেছিল যে, সে সময় রাজনৈতিক দলটি ক্ষমতায় এলে তাদের স্বার্থে আঘাত আসতে পারে।

তারা রাষ্ট্রের কথা ভাবেনি, গণতন্ত্রের কথা ভাবেনি। নির্বাচন ব্যবস্থাকে ত্রুটিপূর্ণ করার শুরু জেনারেল জিয়াউর রহমানের হাতে হলেও ২০০১ সালের নির্বাচন আসলে বাংলাদেশকে পরাজিত করার নির্বাচন। এবং তারপর কোটিখানিক ভুয়া ভোটার তালিকায় সংযুক্ত করার মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার ষড়যন্ত্র ১/১১-র সরকার ব্যর্থ করে দিয়েছিল তা না করতে পারলে বাংলাদেশ আজকে হয় সোমালিয়া, নাহয় আফগানিস্তানের কাতারে নেমে আসতো। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে ত্রাণের বস্তা আসতো, কিন্তু তেমনটি হয়নি, বরং পাকিস্তান এখন মনে-প্রাণে বাংলাদেশের মতো হতে চাইছে।

মজার ব্যাপার হলো, নির্বাচন ব্যবস্থার ত্রুটি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে ব্যর্থ করার প্রকৃত দায় যাদের তাদেরকে দায়মুক্তি দিয়ে এই পণ্ডিতকূল কোনো এক বিচিত্র কারণে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে এর জন্য দায়ী করে থাকেন। কোনো ভাবেই তারা এ প্রশ্ন তুলতে চান না যে, কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সকল দলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতে পারেনি?

কেনই বা বিরোধী দল হিসেবে সংসদে সর্বোচ্চ সংখ্যক দিন অনুপস্থিত থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রকে কার্যতঃ অচল করে তোলা হয়েছিল এবং কারা সেটা করেছিল? জানি, অনেকেই ভাবছেন যে, এসব অতীতের কথা কেন তুলছি নতুন করে, তাইতো? তুলছি এ কারণে যে, তাতে আলোচনা করতে সুবিধে হয়। রাষ্ট্র যদি একটি শক্তিশালী রেলগাড়ির ইঞ্জিন হয় তাহলে রাজনৈতিক দলগুলি তার চালক। বাংলাদেশে অবৈধ ক্ষমতা দখল করে সেনা বাহিনী থেকে জেনারেলরা এসে জোর করে এই ইঞ্জিনের চালকের আসনে বসেছেন, অবৈধভাবে রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন।

নীতি ও আদর্শহীন হওয়ায় এসব রাজনৈতিক দলের কাছে ক্ষমতাটাই বড়, ফলে বিরোধী দল হিসেবে তারা সকল সুবিধাদি ভোগ করলেও সংসদে উপস্থিত থাকাটা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি প্রায়শঃই। অথচ গণতন্ত্র কেবল সরকারের দায় নয়, রাজনৈতিক দলগুলোর সকলের ওপরই এর দায় বর্তায়। জনগণের সামনে যদি ‘চয়েস’ হিসেবে এরকম রাজনৈতিক দল থাকে তাহলে কোনো না কোনো সময় তারা ক্ষমতায় বসে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় বাধা তৈরি করতে পারে এবং সেটা যে করেও থাকে তার প্রমাণ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত চলা বিএনপি-জামায়াতের অপশাসন।

বাংলাদেশ আর কোনো ভাবেই আগের মতো নেই। নতুন প্রজন্ম এখন বাংলাদেশকে ভিন্ন চোখে ও ভিন্ন ভাবে দেখতে শুরু করেছে। তাদের সামনে আমাদের ‘চয়েস’ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা যাকেই বেছে নিক না কেন, তারা যেনো বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুসহ সকল মৌলিক প্রশ্নে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী কোনো রাজনৈতিক দলের খপ্পরে না পড়ে। যেনো তারা যাকেই বেছে নিক না কেন তারা সকলেই যেন মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে কোনো ভাবেই খাটো না করতে পারে কোথাও।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, একুশ শতকের পৃথিবীর সঙ্গে যুঝবার জন্য যে নৈতিক সাহস ও সক্ষমতা, তা যেনো রাজনৈতিক দলগুলির থাকে নাহলে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে লড়ে বাংলাদেশের পক্ষে দাবি আদায়ে তারা পিছিয়ে পড়তে বাধ্য।

আমরা লক্ষ্য করে থাকি যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে বিদেশিদের কাছে উন্মুক্ত করে দেওয়ায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক শক্তিসমূহ সব সময় ভূমিকা রেখে আসছে। গত এক দশকে আওয়ামী লীগ এ ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান বদলালেও বিএনপি’র পক্ষে সেটা সম্ভব হয়নি। এটা না হওয়ার মূল কারণ হয়তো এটাই যে, দলটি কখনওই জনগণের শক্তির ওপর ভরসা করতে পারেনি।

শুরু থেকেই তাদের নির্ভরতা কখনও দেশের ভেতরকার অপশক্তি ও কখনও বিদেশি শক্তিগুলির হাতে গচ্ছিত ছিল। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার চেয়ে নির্বাচনী-ব্যবস্থাকে কী করে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসা যায় সে লক্ষ্য নিয়েই তারা হয় সেনা বাহিনী, নয় আমলাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ব্যাপক অর্থ ছড়িয়ে নির্বাচনী ফলাফলকে তাদের অনুকূলে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছে। সেটা ১৯৯১ সালেই হোক কি ২০০১ সালেই হোক।

আগেই বলেছি যে, বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে আসলে সামরিক শাসক ও তাদের হাতে তৈরি রাজনৈতিক দলগুলির হাতে। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ তাদেরই অনুসৃত পথে হেঁটেছে বা বলা ভালো হাঁটতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশকে অরক্ষিত ও অপশক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে একটি পরক্ষীত দেশপ্রেমিক ও রাজনৈতিক শক্তির হাতে থাকাটা জরুরি। কিন্তু সেটা দীর্ঘকালের জন্য নয়, বরং দেশের মানুষকে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ প্রশ্নে আপোস না করা রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে নিজেদের পছন্দের দলটি বেছে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়াই হবে আগামীর বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য।

এ লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়েছে, সমাজ ও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে তার সুর শোনা যাচ্ছে। একথাই এখন জোর দিয়ে বলবার সময় যে, বাংলাদেশ প্রশ্নে যারা কারো সঙ্গেই আপোস করবে না সেরকম রাজনৈতিক শক্তিই এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের দোহাই পেড়ে কেউ কেউ একথাই বলতে চাইছেন যে, বাংলাদেশে প্রকৃত গণতন্ত্র(?) নেই, যদিও প্রকৃত গণতন্ত্র বলতে তারা ঠিক কী বোঝাতে চান সেটাও বোধগম্য নয়। নিন্দুকেরা অবশ্য বলে যে, বিএনপি-জামায়াতকে ক্ষমতায় দেখতে পেলেই তাদের সেই কাঙ্খিত প্রকৃত গণতন্ত্র অর্জিত হবে, অন্যথায় বাংলাদেশ গণতন্ত্রহীন থেকে যাবে। রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ক্ষীয়মান এই প্ল্যাটফরমটি যে আধুনিক বাংলাদেশ তথা বিশ্বের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে চলতে ব্যর্থ হয়ে এখন উল্টোরথে উঠে নিজেদেরকে ও বাংলাদেশকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে সেকথা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই।

একুশ শতকের উপযুক্ত রাজনীতি ও বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনীতি তারা এখনও করছে না বা বলা ভালো তারা এ সম্পর্কে এখনও ওয়াকিবহাল নয়। নিজেদের কোটারি স্বার্থ রক্ষাই এখনও তাদের মূল রাজনীতি, বাংলাদেশ যা থেকে দশ বছর আগেই বেরিয়ে পড়েছে। এদের পক্ষে চোঙাধারীরা যতোক্ষণ এই সত্যটি তাদেরকে বোঝাতে সক্ষম হবেন যে, বদলে যাওয়া বাংলাদেশে তাদের গোষ্ঠীস্বার্থের রাজনীতি আর চলবে না, কৌশল ও উদ্দেশ্য দু’টোই বদলাতে হবে, ততোক্ষণ আর তাদের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না, বাংলাদেশের মানুষই সেটা আর চাইবে না বা চাইছে না।

মানুষের বিপক্ষে গিয়ে এদেশে কেন কোনো দেশেই রাজনীতি করা যায় না, সেই সত্যটাই এই সময়ের সবচেয়ে আরাধ্য উপলব্ধি হওয়া উচিত সকলের জন্য। এটা যেমন দেশের রাজনৈতিক দলগুলির বোঝা দরকার তেমনই বোঝা দরকার সরকারেরও।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
[email protected]

এইচআর/জেআইএম

বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে আসলে সামরিক শাসক ও তাদের হাতে তৈরি রাজনৈতিক দলগুলির হাতে। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ তাদেরই অনুসৃত পথে হেঁটেছে বা বলা ভালো হাঁটতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশকে অরক্ষিত ও অপশক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে একটি পরক্ষীত দেশপ্রেমিক ও রাজনৈতিক শক্তির হাতে থাকাটা জরুরি।

আপনার মতামত লিখুন :