মচকাবে কিন্তু ভেঙ্গে যাবে না

সাইফুল হোসেন
সাইফুল হোসেন সাইফুল হোসেন
প্রকাশিত: ০৮:১৩ এএম, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি কখনও কঠোরতার মধ্যে থাকে না, বরং থাকে নমনীয়তার মধ্যে। যে গাছ ঝড়ের সময় শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, সেটিই প্রথম ভেঙে যায়। আর যে গাছ বাতাসের সঙ্গে দুলতে জানে, সে বেঁচে থাকে। মানুষের জীবনও ঠিক তেমনই। আপনি যদি সব সময় কঠিন হতে চান, অটল হতে চান, অনড় থাকতে চান—তাহলে বাস্তবতার ঝড় একদিন আপনাকে ভেঙে দেবে। কিন্তু আপনি যদি শিখতে পারেন কীভাবে মচকাতে হয়, কীভাবে পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়—তাহলে আপনি হয়তো ক্লান্ত হবেন, আহত হবেন, কিন্তু ভেঙে পড়বেন না।

জাপানি প্রবাদে বলা হয়, “The bamboo that bends is stronger than the oak that resists.” বাঁশ ঝড়ে দুলে যায়, কিন্তু টিকে থাকে, শক্ত ওক গাছ ভেঙে যায়। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে এই ধারণাকে বলা হয় resilience বা মানসিক স্থিতিস্থাপকতা। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা মানসিকভাবে নমনীয়, তারা বড় জীবনের আঘাত থেকেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কঠোর মানসিকতার মানুষদের তুলনায় তাদের ডিপ্রেশন বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের ঝুঁকি প্রায় ৪০% কম।

আমরা প্রায়ই মনে করি শক্ত মানুষ মানে যে কখনও কাঁদে না, ভাঙে না, থামে না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সত্যিকারের শক্তি হলো—ভেঙে না পড়ে বেঁচে থাকা, এমনকি যখন সবকিছু ভেঙে পড়ছে বলে মনে হয় তখনও। নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, “Do not judge me by my successes, judge me by how many times I fell down and got back up again.” এই কথার মধ্যে লুকিয়ে আছে মানবিক স্থিতিস্থাপকতার মূল দর্শন। পড়ে যাওয়া সমস্যা নয়, সমস্যা হলো পড়ে থাকার সিদ্ধান্ত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, জীবনের কোনো না কোনো সময়ে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন মানুষ মানসিক চাপে ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। অথচ একই সাথে গবেষণা বলছে, মানুষের ভেতরে একটি স্বাভাবিক পুনর্গঠন ক্ষমতা আছে—যাকে বলা হয় psychological elasticity। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির দীর্ঘমেয়াদী একটি স্টাডিতে দেখা গেছে, যারা জীবনের বড় ধাক্কা—চাকরি হারানো, সম্পর্ক ভাঙা, আর্থিক সংকট—এসবের পরেও নিজেদের পুনর্গঠন করতে পেরেছে, তাদের অধিকাংশই কোনো অসাধারণ প্রতিভাধর ছিল না। তাদের একমাত্র পার্থক্য ছিল—তারা নিজেদের কঠিন না করে নমনীয় রেখেছিল।

জীবন কখনও সরলরেখায় চলে না। কখনও হঠাৎ করে পরিকল্পনা ভেঙে যায়, সম্পর্ক বদলে যায়, পরিচিত বাস্তবতা অপরিচিত হয়ে ওঠে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময় লক্ষ লক্ষ মানুষ চাকরি হারিয়েছিল। কিন্তু একই সময়ে LinkedIn-এর একটি পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, যারা সেই ধাক্কার পর নতুন দক্ষতা শেখার দিকে ঝুঁকেছিল, তাদের প্রায় ৬০% পাঁচ বছরের মধ্যে আগের চেয়েও ভালো অবস্থানে পৌঁছায়। তারা ভেঙে পড়েনি, তারা মচকেছিল, তারপর নতুনভাবে দাঁড়িয়েছিল।

ব্রুস লি একবার বলেছিলেন, “Be water, my friend.” পানি কখনও দেয়ালের সঙ্গে লড়াই করে না, সে পথ খুঁজে নেয়। সে রূপ বদলায়, কিন্তু অস্তিত্ব হারায় না। মানুষও যদি নিজের পরিচয় ধরে রেখে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শেখে, তাহলে সে টিকে থাকতে পারে। কঠোরতা প্রায়ই অহংকারের ফল, আর নমনীয়তা আসে আত্মজ্ঞান থেকে।

স্ট্যানফোর্ডের মনোবিজ্ঞানী ক্যারল ডুয়েকের গবেষণায় দেখা যায়, যাদের মধ্যে “growth mindset” থাকে, তারা ব্যর্থতাকে চূড়ান্ত হিসেবে নয়, পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখে। এই মানসিকতার মানুষরা প্রতিকূলতার মুখে গড়ে ওঠে। তারা জানে, চাপ এড়ানো যায় না, কিন্তু চাপের নিচে ভেঙে পড়া এড়ানো যায়। এই মানসিকতা তাদের শেখায়—“আমি এখন পারছি না” মানে “আমি কখনও পারব না” এমন নয়।

ইতিহাসে এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে যেখানে মানুষ ভেঙে পড়ার বদলে নমনীয় হয়েছে। থমাস এডিসন তাঁর হাজারো ব্যর্থতার পর বলেছিলেন, “I have not failed. I've just found 10,000 ways that won't work.” এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করেছিল। ব্যর্থতা তার জন্য শেষ নয়, ছিল শেখার প্রক্রিয়া।

আধুনিক কর্মক্ষেত্রেও এই নীতি সমানভাবে প্রযোজ্য। McKinsey-এর একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হবে adaptability—পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। প্রযুক্তি বদলাবে, বাজার বদলাবে, কাজের ধরন বদলাবে। যারা কঠোরভাবে পুরোনো পরিচয়ে আটকে থাকবে, তারা পিছিয়ে পড়বে। আর যারা নিজেদের পুনর্গঠন করতে পারবে, তারা এগিয়ে যাবে।

ব্যক্তিগত জীবনেও একই সত্য কাজ করে। সম্পর্ক, স্বাস্থ্য, ক্যারিয়ার—সব ক্ষেত্রেই স্থিতিস্থাপকতা জরুরি। গবেষণা বলছে, যারা বড় জীবনের ধাক্কার পর সামাজিক সংযোগ বজায় রাখে, নতুন লক্ষ্য তৈরি করে এবং নিজের পরিচয় পুনর্নির্মাণ করে, তাদের জীবনের সন্তুষ্টি সূচক দীর্ঘমেয়াদে ৩০% পর্যন্ত বাড়ে।

রুমি লিখেছিলেন, “Where there is ruin, there is hope for a treasure.” ধ্বংসের মধ্যেও সম্ভাবনা থাকে—যদি আমরা ভেঙে না পড়ে নিজেদের নতুনভাবে গড়তে পারি।

জীবন আপনাকে কখনও না কখনও মচকাবে। পরিকল্পনা বদলে যাবে, বিশ্বাস নড়বড়ে হবে, পথ হারিয়ে যাবে। কিন্তু সেটিই শেষ নয়। কারণ মানুষের শক্তি তার কঠোরতায় নয়, তার পুনর্গঠনের ক্ষমতায়। আপনি যদি শিখতে পারেন নমনীয় থাকতে, নিজের ভেতরের স্থিতিস্থাপকতাকে জাগিয়ে তুলতে, তাহলে ঝড় আসবে, আঘাত আসবে, কিন্তু আপনি টিকে থাকবেন।

শেষ পর্যন্ত, জীবনের আসল শক্তি হলো এই উপলব্ধি— আপনি হয়তো মচকাবেন, কিন্তু ভেঙে যাবেন না।

লেখক: দ্য আর্ট অফ পার্সোনাল ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট, দ্য আর্ট অফ কর্পোরেট ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট, দ্য সাকসেস ব্লু প্রিন্ট, আমি কি এক কাপ কফিও খাব না ইত্যাদি বইয়ের লেখক, ফাইন্যান্স এন্ড বিজনেস মেন্টর।

এইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।