সিন্ডিকেটমুক্ত বাজার ব্যবস্থাপনাই হতে পারে নতুন সরকারের প্রথম সাফল্য

সম্পাদকীয় ডেস্ক
সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:১৭ পিএম, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

রায়হানুল ইসলাম

নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে জনগণের প্রত্যাশা থাকে দৃশ্যমান পরিবর্তনের। অবকাঠামো উন্নয়ন, বড় প্রকল্প, বিদেশনীতি—এসব গুরুত্বপূর্ণ হলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে বাজার। চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ—নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামই নির্ধারণ করে মানুষের স্বস্তি না অস্বস্তি। তাই নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে দ্রুত এবং বাস্তব অর্থে জনআস্থা অর্জনের ক্ষেত্র হতে পারে বাজার ব্যবস্থাপনা। আর সেই ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি বহুল আলোচিত শব্দ—সিন্ডিকেট।

বাজারে সিন্ডিকেট বলতে আমরা বুঝি এমন এক অদৃশ্য সমন্বয়, যেখানে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা গোষ্ঠী সরবরাহ ও দামের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। কখনো কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়, কখনো অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, আবার কখনো আমদানি-রপ্তানির সিদ্ধান্তের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা আদায় করা হয়। ভোক্তার পকেট থেকে অতিরিক্ত যে অর্থ বেরিয়ে যায়, সেটিই সিন্ডিকেটের লাভ। এই বাস্তবতা নতুন নয়; বরং দীর্ঘদিনের অসুস্থ বাজার সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে।

নতুন সরকারের সামনে তাই বড় প্রশ্ন—এই সংস্কৃতি কি বদলানো সম্ভব? সম্ভব, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দৃঢ়তা একসঙ্গে কাজ করে। বাজার নিয়ন্ত্রণ মানে দাম বেঁধে দেওয়া নয়; বরং প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা। যেখানে একচেটিয়া প্রভাব থাকবে না, তথ্য গোপন থাকবে না, এবং নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা থাকবে।

প্রথমত, সরবরাহ চেইনকে স্বচ্ছ করা জরুরি। কৃষক যে দামে পণ্য বিক্রি করেন, শহরের ভোক্তা সেই পণ্য কেনেন কয়েকগুণ বেশি দামে—এই ব্যবধানের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে। সরকার যদি উৎপাদক থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত তথ্যভিত্তিক নজরদারি জোরদার করে, তবে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা কঠিন হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মজুত ও সরবরাহের তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এতে বাজারে গুজবের সুযোগ কমবে।

দ্বিতীয়ত, প্রতিযোগিতা কমিশন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল—এই অভিযোগ বহুদিনের। নিয়মিত বাজার মনিটরিং, হঠাৎ অভিযান নয় বরং ধারাবাহিক নজরদারি, এবং বড় মুনাফাকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা—এসব পদক্ষেপ দৃশ্যমান হলে বাজারে বার্তা যাবে যে সময় বদলাচ্ছে। শাস্তি কেবল ছোট ব্যবসায়ীর জন্য নয়; বড় গোষ্ঠীর জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে।

তৃতীয়ত, আমদানি-নির্ভর পণ্যে নীতিগত স্থিরতা জরুরি। হঠাৎ শুল্ক পরিবর্তন, অনুমতি বিলম্ব বা নীতিগত অস্পষ্টতা অনেক সময় কিছু গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়। নীতির ধারাবাহিকতা ও আগাম ঘোষণা বাজারে পূর্বানুমানযোগ্যতা তৈরি করে, যা সিন্ডিকেটের সুযোগ কমায়। একই সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে প্রণোদনা দিলে সরবরাহ বাড়বে, ফলে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হবে।

চতুর্থত, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাজার তদারকি অপরিহার্য। বহু সময় অভিযোগ ওঠে—কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে দায়মুক্তি পান। নতুন সরকার যদি সত্যিই বাজার সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে চায়, তবে এই সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। প্রশাসনের বার্তা হতে হবে স্পষ্ট: বাজার কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি জনস্বার্থের ক্ষেত্র।

তবে কেবল দমনমূলক ব্যবস্থা নিলেই সমাধান আসবে না। ব্যবসায়ী সমাজকে অংশীদার করাও জরুরি। নীতিনির্ধারণে তাঁদের মতামত নেওয়া, বাস্তব সমস্যাগুলো বোঝা এবং যৌক্তিক মুনাফার নিশ্চয়তা দেওয়া—এসব সমন্বয় করলে বাজার স্থিতিশীল থাকে। সরকারের ভূমিকা হওয়া উচিত ন্যায়সঙ্গত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, অযৌক্তিক লাভ রোধ করা এবং ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করা।

নতুন সরকারের প্রথম সাফল্য সবসময় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে মাপা হয় না। বরং যখন সাধারণ মানুষ অনুভব করেন যে মাসের শেষে বাজার করতে গিয়ে আগের মতো চাপ পড়ছে না, তখনই সরকারের প্রতি আস্থা জন্মায়। বাজারে স্বস্তি মানে শুধু অর্থনৈতিক স্বস্তি নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতারও পূর্বশর্ত। মূল্যবৃদ্ধি অসন্তোষ বাড়ায়, আর ন্যায্যমূল্য স্বস্তি আনে।

সিন্ডিকেটমুক্ত বাজার গড়া সহজ কাজ নয়। এতে স্বার্থের সংঘাত থাকবে, প্রতিরোধ থাকবে, হয়তো সাময়িক অস্থিরতাও তৈরি হবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতিকে স্বাস্থ্যবান করবে। প্রতিযোগিতা বাড়লে মান উন্নত হবে, বিনিয়োগ বাড়বে, এবং ভোক্তা সুরক্ষিত থাকবে। নতুন সরকার যদি এই চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করে এবং ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেয়, তবে এটি হতে পারে তাদের প্রথম দৃশ্যমান ও জনমুখী সাফল্য।

অবশেষে মনে রাখতে হবে, বাজার সংস্কার কোনো একদিনের অভিযান নয়; এটি একটি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা—এই তিনটির সমন্বয় জরুরি। জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিলে তার প্রতিফলন সবচেয়ে আগে দেখা উচিত বাজারে। কারণ বাজারই সাধারণ মানুষের জীবনের আয়না। সেই আয়নায় যদি স্বস্তির প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে, তবে নতুন সরকারের সাফল্যের গল্প সেখান থেকেই শুরু হবে।

এইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।