লিবিয়া একটি ফাঁদের নাম

আবু তালহা
আবু তালহা আবু তালহা , লেখক
প্রকাশিত: ০৬:২০ পিএম, ১৮ মে ২০১৯
ফাইল ছবি

জীবন সংগ্রামের তাগিদেই মানুষকে এক দেশ থেকে অন্য একটি দেশে যেতে হয়। আর এ জন্য দরকার পড়ে ভিসা বা ইনডোর্সমেন্ট। ভিসা হলো একটি দেশে প্রবেশের প্রবেশপত্র যা আপনাকে নির্দিষ্ট একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে অর্জন করতে হয়।

বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশ। বর্তমানে দেশকে অনেক নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। আর এই মুহূর্তে লিবিয়ায় ঘটে যাওয়া বাংলাদেশি মানুষদের অপমৃত্যুকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি নস্যাৎ করে দিচ্ছে। আমরা নিরাপদ অভিবাসনের ক্ষেত্রে কতটা সফল হয়েছি তা এখন ভাববার বিষয়।

বাংলাদেশের অন্যতম আয়ের উৎস বিদেশে যাওয়া কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। ২০১৭ সালের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে প্রায় ১১ লক্ষ কর্মী দেশের বাইরে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে ১ কোটি ৩ লক্ষ মানুষ দেশের বাইরে ১৬২টি দেশে কাজ করছে। প্রতি বছর প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশি রেমিট্যান্স দেশে পাঠানো হচ্ছে, যার আর্থিক অবকাঠামোর উপর ভিত্তি করে দাড়িয়ে আছে আমাদের এ উন্নয়শীল বাংলাদেশ।

এই উন্নয়নশীল দেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে বিদেশি রেমিট্যান্স। এই জন্য আমাদের ইংরেজি ভাষা ও কাজে দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। ভাষা ও কাজে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারলেই উন্নত দেশগুলি আমাদের দেশ থেকে কর্মী নিতে আগ্রহ প্রকাশ করবে। বর্তমানে আমাদের দেশ থেকে যে সমস্ত কর্মীরা দেশের বাইরে যায় তারা অধিকাংশই কনস্ট্রাকশন, ফ্যাক্টরি ও ক্লিনিং প্রতিষ্ঠানগুলিতে কাজ করে থাকেন। শুধুমাত্র ভাষা ও কাজে দক্ষতার অভাবেই আমাদের দেশের কর্মীরা প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় অনেক অনেক কম বেতন পেয়ে থাকেন। ফলে বাংলাদেশ অনেক বড় ধরনের রেমিট্যান্স থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

নিরাপদ অভিবাসনের ক্ষেত্রে আমার তেমন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারিনি। আসল বিষয়টি হলো আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ জানেনা কিভাবে দেশের বাইরে বৈধ উপায়ে বৈধ ভিসা নিয়ে যেতে হয়। আদিম প্রথাগত চিন্তা চেতনার আলোকে অভিভাবক ও বিদেশ গমন ইচ্ছুরা দালালের মাধ্যমে দেশের বাইরে যাওয়াকেই নিরাপদ মনে করেন। কিন্তু আসলেই কি তা নিরাপদ?

আমি বলবো অবশ্যই না। দালালরা অধিক কমিশনের লোভে ৯০% মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকে। (থাকা, খাওয়া ও চিকিৎসা ফ্রি, লাখ টাকা বেতন, বোনাস ওভারটাইম, অটোমেটিক নগরিকত্ব ইত্যাদি)। এই ধরনের মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে থাকে গ্রামের সহজ সকল অভিভাবক ও যুবকদেরকে। গ্রামের সহজ সরল ও অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী দালালের কথাকেই ১০০% সত্য মনে করে নিজের পালিত স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য আগুনে বা সাগরে ঝাঁপ দেয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। কিন্তু কখনো কি আপনি ভেবে দেখেছেন বা মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করছেন দালালের কথাগুলি সত্য না মিথ্যা? তাছাড়া এটাই কি দেশের বাইরে যাওয়ার সঠিক পথ?

আমি বলবো কখনোই না। দালালের মাধ্যমে দেশের বাইরে যাওয়ার কোনো নিরাপদ পথ হতে পারে না। কারণ দালালরা অসাধু, অশিক্ষিত, লোভী ও প্রতারক। তারা নিজেরাও জানে না কিভাবে সঠিকভাবে দেশের বাইরে বৈধ উপয়ে বৈধ ভিসা নিয়ে যেতে হয়। আর এই দেশীয় অসাধু চক্র এখন আন্তর্জাতিক চোরা কারবারি ও পাচারকারিদের সাথে হাত মিলিয়েছে। এই চক্র কতটা হিংস্র ও ভয়ানক তা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। সুতরাং আপনি তাদের কাছে নিরাপদ নন।

দেশের প্রত্যান্ত অঞ্চলের ৯০% মানুষ জানেনা যে, দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য সরকারের একটি মন্ত্রণালয় (প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়) আছে এবং কর্মীদের দেখভাল করার জন্য দেশের বাইরে বাংলাদেশ অ্যাম্বাসি বা দূতাবাস আছে। এছাড়াও দেশে ম্যানপাওয়ার ব্যুরো আছে। বেসরকারি সংস্থা হিসেবে বিআইআরএ (বাইরা) আছে। এছাড়াও বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা নিরাপদ অভিবাসন নিয়ে কাজ করছে।

অসাধু দালাল চক্রের হাতে থেকে এই সকল সহজ সরল বিদেশ গমনেচ্ছু জনগোষ্ঠীকে বাঁচাতে হলে অবশ্যই সচেতনতা তৈরি করতে হবে। গ্রামের প্রতিটি মানুষ যাতে দেশের বাইরে যাওয়ার নিরাপদ উপায় অন্তর জানতে পারে ও দালাল, অনিরাপদ অভিবাসনের ক্ষতিকারক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। প্রতিটি স্কুল কলেজ, মাদরাসা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিরাপদ অভিবাসন নিয়ে কথা বলা বাধ্যতামূলক করতে হবে। বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ অভিবাসনের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়ায় ঘটে যাওয়া অপমৃত্যু নামক যে কলঙ্ক বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপেছে তার প্রথম ও প্রধান অজ্ঞতা ও অসচেতনতা। এই মানুষগুলো যদি জানতে ভিসা না থাকা কত বিপদজনক বা অনিরাপদ অথবা অবৈধভাবে গেলে কাজ পাওয়া যায় না, অবৈধ অনুপ্রেবেশের কারণে জেল খাটতে হয়, এমনকি দেশে ফেরত পাঠানো হয় ইত্যাদি (অভিবাসনের কুফল সম্পর্কে), তাহলে তারা হয়তো বর্তমান এই সভ্য সময়ে বোকামির মতো অসভ্য কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারতো না। সঠিক তথ্য ও সচেতনতা বর্তমান সময়ে টিকে থাকার অন্যতম হাতিয়ার।

সচেতনতার বিকল্প কিছুই হতে পারে না। একজন বিদেশ যেতে ইচ্ছুক কর্মী যদি সচেতনতার সাথে সঠিকভাবে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে পারে, তাহলেই সে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে পারবে।

সর্বোপরি দালাল এড়িয়ে চলুন। ইদানিং অনেক এজেন্সি প্রতারণার পসরা খুলে বসেছেন। প্রতারণার হাত থেকে বাঁচতে হলে অবশ্যই আপনাকে সঠিক এজেন্সি বা প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করতে হবে। যেই এজেন্সির সাথে কাজ করতে চান সেই এজেন্সি সম্পর্কে ভালোভাবে জানুন, সরাসরি এজেন্সির মালিকের সঙ্গে কথা বলুন। আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করুন। নিরাপদ অভিবাসন সংস্থাগুলো খুঁজে বের করুন। প্রয়োজনে জেলা প্রশাসক অফিসে যোগাযোগ করুন। কোনো প্রতিষ্ঠান প্রকৃতভাবে সঠিক কাজ করে, তা খুঁজে বের করা আপনার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। কারণ জীবন আপনার, সিদ্ধান্ত আপনার।

তবে এখনই উপযুক্ত সময় দেশি-বিদেশি অসাধুচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করা। আমরা চাই সুস্থ্য ও নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা। যদি সমাজ ও রাষ্ট্র নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তবে লিবিয়ার মতো অংসখ্য অপমৃত্যু নামক কলঙ্ক বাংলাদেশের অর্জিত সাফল্যকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলবে।

[email protected]

এসএইচএস/এমএস

যদি সমাজ ও রাষ্ট্র নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তবে লিবিয়ার মতো অংসখ্য অপমৃত্যু নামক কলঙ্ক বাংলাদেশের অর্জিত সাফল্যকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলবে।

আপনার মতামত লিখুন :