টাকায় আট মণ চাল বালিশে ১১ মণ ধান

মোস্তফা কামাল
মোস্তফা কামাল মোস্তফা কামাল , সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৯:৫৭ এএম, ২২ মে ২০১৯

কৃষকরা ন্যায্যমূল্য না পেয়ে পাকা ধানে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। আর সরকারি ভাবনা বিদেশে চাল রফতানির। নিজের ধানক্ষেতে কৃষকের আগুন দেওয়ার ঘটনাকে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বলেছেন এক মন্ত্রী। আরেক মন্ত্রী জানালেন, ফ্রান্সে বেশি ফসল হলে কৃষকরা তা পুড়িয়ে ফেলে।

অর্থাৎ বাংলাদেশেও বাম্পার ফলনের জের চলছে। ইতিহাসে রয়েছে, শায়েস্তা খাঁর আমলে টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। সেটা স্রেফ ইতিহাস। হাল আমল বা নিকট অতীতের কাছে আস্ত গল্প। গল্পের সঙ্গে এখন ধান-চাল নিয়ে চলছে নির্মম রসিকতা। যে যা পারছেন বলছেন।

কৃষক কেনো তার ক্ষেতে আগুন দেয়? একসময় শোনা যেত কৃষক পানির দামে ফসল বিক্রি করে। এখন পানির চেয়ে কম দামে ফসল বিক্রি হচ্ছে। এক কেজি ধানের দাম সাড়ে বারো টাকা আর এক লিটার পানির দাম পনেরো টাকা। আর সেই ধানের চালের কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা। এক মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়ে আট’শ টাকার ওপরে। সেই ধান মণপ্রতি বিক্রি হয় ৫০০-৬০০ টাকা। ধান নিয়ে বাৎচিতের মধ্যেই এলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার জন্য নির্মিত ভবনের জন্য কেনা বালিশের দামের খবর। যা দেখে চোখ কপালে উঠেছে দেশবাসীর।

এই প্রকল্পের আওতায় মূল প্রকল্প এলাকার বাইরে হচ্ছে গ্রিনসিটি আবাসন পল্লী। সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্রেটির কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার জন্য ১১টি ২০ তলা ও ৮টি ১৬ তলা ভবন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ২০ তলা ৮টি ভবন ও ১৬ তলা একটি ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। এই ৯টি ভবনে তৈরি হয়েছে ৯৬৬টি ফ্ল্যাট। সেই ৯৬৬টি ফ্ল্যাটের জন্য আসবাবপত্র কিনেছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বালিশের ক্রয়মূল্য ও এসব বালিশ ওপরে তোলার খরচের বিষয়টি। প্রতিটি বালিশ কেনা হয়েছে ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা দরে। মোট ১৩২০টি বালিশ কেনার পর প্রতিটি ওঠাতে খরচ দেখানো হয় ৭৬০ টাকা। ওই ভবনের জন্য ১ হাজার ৩২০টি বালিশ কেনা হয়েছে। এর প্রতিটির দাম দেখানো হয়েছে ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা। আর সেই প্রতিটি বালিশ নিচ থেকে ভবনের ওপরে তুলতে খরচ দেখানো হয়েছে ৭৬০ টাকা। একটা বালিশের দাম ৬ হাজার টাকা আর সেটা ঘরে নেবার জন্য খরচ হবে সাত শ’ টাকা। যা ১১ মণ ধানের সমান।

এছাড়া, একটা ফ্রিজের দাম ৯৪ হাজার টাকা আর সেটা ঘরে তুলতে খরচ ১৪ হাজার টাকা। সাত হাজার টাকার প্রতিটি চুলা ঘরে আনতে খরচ ৬ হাজার নয়শ’ টাকা। শুধু বালিশ নয় প্রকল্পের আসবাবপত্র কেনা ও ফ্ল্যাটে তোলার খরচেও হরিলুটের যতো কায়কারবার। এর মধ্যে ২০ তলা একটি ভবনের ১১০টি ফ্ল্যাটের আসবাবপত্র কেনা ও তা ভবনে ওঠাতে সব মিলে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৫ কোটি ৬৯ লাখ ৯২ হাজার ২৯২ টাকা। ওই ১১০টি ফ্ল্যাটের জন্য কেনা টিভি, ফ্রিজ ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রো ওয়েভ কেনা হয়েছে। সেসব আসবাবের ক্রয় মূল্য ও সেগুলোকে ফ্ল্যাটে তুলতে যে ব্যয় দেখানো হয়েছে তা রীতিমতো অস্বাভাবিক।

একইভাবে ১ লাখ ৩৬ হাজার ১১২ টাকা দরে মোট এক কোটি ৫০ লাখ টাকায় ক্রয় করা ১১০টি ওয়াশিং মেশিন ওঠাতে খরচ দেখানো হয় ৩৩ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। প্রতিটি মাইক্রোওয়েভ ওভেন কেনা হয়েছে ৩৮ হাজার ২৭৪ টাকায় যার প্রতিটি ফ্ল্যাটে ওঠাতে খরচ দেখানো হয় ৬ হাজার ৮৪০ টাকা করে। এছাড়াও প্রতিটি কেটলি ভবনে ওঠাতে ২ হাজার ৯৪৫ টাকা, প্রতিটি ইলেক্ট্রিক আয়রন ফ্ল্যাটে ওঠাতে ২ হাজার ৯৪৫ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।

প্রতিটি চুলার ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে ৭ হাজার ৭৪৭ টাকা। তা আর তা ওঠানোর খরচ দেখানো হয় ৬ হাজার ৬৫০ টাকা। খাট, সোফা, টেবিল, তোশক, চেয়ারসহ জন্য অন্যান্য আসবাব ক্রয় ও এসব আসবাব ফ্ল্যাটে তোলার ক্ষেত্রেও বিপুল অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে। ১১০টি ফ্ল্যাটের জন্য প্রতিটি খাট ৪৩ হাজার ৩৫৭ টাকায় কিনে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪৭ লাখ ৫৯ হাজার ২৭০ টাকা। আর প্রতিটি খাট ওপরে ওঠানের পেছনে খরচ দেখানো হয়েছে ১০ হাজার ৭৭৩ টাকা।

প্রতিটি সোফা কেনা হয়েছে ৭৪ হাজার ৫০৯ টাকায়, আর তা ওঠাতে খরচ হয় ২৪ হাজার ২৪৪ টাকা করে। ১৪ হাজার ৫৬১ টাকায় ক্রয় করা প্রতিটি সেন্টার টেবিল ওঠাতে খরচ দেখানো হয় ২ হাজার ৪৮৯ টাকা। ছয়টি চেয়ারসহ ডাইনিং টেবিলের একেকটি সেট ক্রয় করা হয় ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৭৪ টাকায়, আর প্রতিটি ডাইনিং টেবিল ওঠানোর খরচ দেখনো হয় ২১ হাজার ৩৭৫ টাকা।

একেকটি ওয়ারড্রব কিনে ফ্ল্যাটে ওঠাতে ১৭ হাজার ৪৯৯ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। ৩৩০টি মেট্রেস ও তোশকের ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে ১ কোটি ১৯ লাখ টাকা। প্রতিটি তোশক ফ্ল্যাটে ওঠাতে খরচ দেখানো হয়ে ৭ হাজার ৭৫২ টাকা করে।

রূপপুরের কুলি হওয়াও ভাগ্যের ব্যাপার। মালী ও রাঁধুনির বেতন ৬৩ হাজার ৭০৮ টাকা । ড্রাইভারের বেতন ৭৩ হাজার ৭০৮ টাকা। সচিবদের বেতনের কাছাকাছি । প্রধানমন্ত্রী যে সন্মানী পান তার চেয়ে রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিচালকের বেতন বেশি। প্রকল্প পরিচালক পাবেন ৪ লাখ ৯৬ হাজার টাকা একই সাথে তিনি আরো কিছু দায়িত্ব পালন করবেন বলে বাড়তি দুই লাখ টাকা পাবেন সব মিলিয়ে তিনি মাসে পাবেন ৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকা।

রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প ব্যয় ১ লাখ কোটি টাকার বেশি। দুই হাজার চারশ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই প্রকল্পের জন্য রাশিয়া ৯১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। এর জন্য তাদের সুদ দিতে হবে ৬৯ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। আগামি দশ বছর পর এই সুদ দেয়া শুরু হবে এবং ৬০ বছরের ভেতরে এটা পরিশোধ করতে হবে। ঋণের সাত হাজার টাকার বালিশে কর্মকর্তারা বৌ বাচ্চা নিয়ে ঘুমাবেন। কিন্তু এই টাকা শোধ করতে হবে কৃষকসহ দেশের মানুষের। কয়েক দিন আগে বিদ্যুৎ এর দাম বাড়ানো নিয়ে এক রিট আবেদন এর শুনানির সময় উচ্চ আদালতের এক বিচারক বলেছিলেন, জ্বালানি খাতের দুর্নীতি যদি ৫০ পার্সেন্ট কমানো যায় তাহলে গ্যাসের দাম বাড়ানো লাগে না। কোথায় গিয়ে ঠেকেছে দুর্নীতির ধরনটা?

রূপপুরের মতো ধেয়ে আসা উন্নয়নের এমন ঠেলা চলছে বিভিন্ন সেক্টরেই। অপ্রতিরোধ্য গতির এমন অগ্রগতির কয়টার খবর আসে পত্রিকা বা গণমাধ্যমে? পাঁচ টাকা নিয়ে ঝগড়াঝাটি করে এখানে মানুষ খুন হয়, বিশ হাজার টাকার অভাবে কারো বাবার চিকিৎসা হয় না, ঘুষ দিয়ে চাকরি নেবার ক্ষমতা নেই বলে পালিয়ে বিদেশ যেতে গিয়ে গণকবরে এদেশের যুবকের ঠাঁই হয়- ভূমধ্যসাগরের বড় ভাইএর হাত ছেড়ে ছোট ভাই লাশ হয়ে ভেসে যায়।

বছর দুয়েক আগে বিটিসিএলের এক প্রকল্পে একটি সিলিং ফ্যানের দাম এক লাখ এক হাজার টাকা ধরা নিয়ে সমালোচনার ঝড় বয়েছে। এরকম ৪৫০টি ফ্যান কিনতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার মার্কিন ডলার। বাংলায় প্রায় চার কোটি ৫৫ লাখ টাকা। পরে বিটিসিএল ওই সংবাদের প্রতিবাদ করে বলেছিল, এটি যেনতেন ফ্যান নয়। সেটি আইভিএস ফ্যান। একে সিলিং ফ্যান বলা যাবে না। রূপপুর কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত বালিশের কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। বলেনি, এটি ভিন্ন জাতের বা ভিন্ন নামের কোনো বালিশ।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

এইচআর/জেআইএম

প্রধানমন্ত্রী যে সন্মানী পান তার চেয়ে রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিচালকের বেতন বেশি। প্রকল্প পরিচালক পাবেন ৪ লাখ ৯৬ হাজার টাকা একই সাথে তিনি আরো কিছু দায়িত্ব পালন করবেন বলে বাড়তি দুই লাখ টাকা পাবেন সব মিলিয়ে তিনি মাসে পাবেন ৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকা।

আপনার মতামত লিখুন :