স্বপ্ন পাচার

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা , প্রধান সম্পাদক, জিটিভি
প্রকাশিত: ০৯:৪৮ এএম, ০১ জুন ২০১৯

সপ্তা দুয়েক আগের ঘটনা। বিশ্বজুড়ে সংবাদ শিরোনাম। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার পথে নৌকা ডুবে ৩৭ জন বাংলাদেশিসহ অন্তত ৬৫ জন মারা গেছেন। তিউনিসিয়ার উপকূলে ডুবে যাওয়া নৌকায় মোট ৮১ জন যাত্রী ছিলেন। এর মধ্যে ৫১ জনই বাংলাদেশি। স্থানীয় জেলেরা ১৪ জন বাংলাদেশিসহ মোট ১৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা রেডক্রসের সহযোগিতায় দেশে ফিরেছেন সম্প্রতি। তারা দালালদের মাধ্যমে গিয়েছিলেন নকল পাসপোর্টে।

এরকম অসংখ্য অসংখ্য মানুষ এদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যায়, ইরাক যায়, লিবিয়া যায় এবং এদের শেষ গন্তব্য থাকে ইউরোপের কোন দেশ। এই যাত্রা ভয়ানক যাত্রা। বহুবার আমরা জাহাজ বা নৌকা ডুবির খবর শুনেছি, বরফের গাড়িতে করে লুকিয়ে ইউরোপ ঢুকতে গিয়ে প্রাণ যাওয়ার কথা শুনেছি। এ ধরনের খবরের শেষ নেই। কিন্তু যাওয়ারও শেষ নেই।

মানব পাচার হচ্ছে সংঘবদ্ধ অপরাধ। পাচারকারী ও সংশ্লিষ্টরা পাচারের শিকার একজন ভিকটিমের সঙ্গে কয়েক ধরনের অপরাধ করে। ভিকটিমের সঙ্গে প্রতারণা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায়, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করা, শ্রমদাসে বাধ্য করা, শরীরের অঙ্গ বিক্রি করা, যুদ্ধে ব্যবহার, এমনকি মেরে ফেলতেও দ্বিধা করে না।

মানব পাচার এক নতুন ধরনের দাস প্রথা। মানব পাচার অত্যধিক লাভজনক ব্যবসা। আইএলও এর ২০১৪ সালে প্রকাশিত অন্য একটি রিপোর্টে বলা হচ্ছে, মানব পাচারের মাধ্যমে পাচারকারীরা বছরে ১৫০ বিলিয়ন ডলার আয় করে। যার মধ্যে ৯৯ বিলিয়ন ডলার আয় হয় যৌন পেশায় বাধ্য করার মাধ্যমে।

আমার পরিচিত একজন ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসা করেন। তিনি বলেন, “আমরা অনেক সময় পাসপোর্ট দেখেই বুঝতে পারি। সুযোগ পেলে বলি, সতর্ক করার চেষ্টা করি। কিন্তু মানুষ মরিয়া। আপনারা এত যে খবর করেন, টকশো করেন, কোন লাভ নাই। এরা যাবেই। মরবে জেনেও যায়’। এদের কোন বৈধ কাগজপত্র থাকে না। কিন্তু এ নিয়ে ভ্রুক্ষেপ নেই। এমনও লোক আছে যে বারবার প্রতারিত হয়েও যাওয়ার চেষ্টা করছে। বাঁচুক আর মরুক তাদের ইউরোপ যেতেই হবে।

সহজ সরল সাধারণ মানুষকে দালালরা অনেক আশা দেয়। ভাল বিমানে যাবে, ভাল সুযোগ সুবিধা থাকবে পথে এবং সুন্দরভাবে, নিরাপদে ইতালি বা গ্রীসে পৌঁছে যাবে। ঢাকা থেকে বিমানে করে ইস্তাম্বুল, ইরাক বা দুবাই নিয়ে গিয়ে তুলে দেয়া হয় ছোট ছোট সব ট্রলারে। ৮০/৯০ জনের এই ট্রলার পথে বদলায়, কখনো পৌঁছে, কখনো ডুবে যায়, ডুবে যায় এই পরিবারগুলোর স্বপ্ন।

এক সময় প্রচুর বাংলাদেশি লিবিয়াতে কাজ করতো। লিবিয়াতে যুদ্ধ শুরু হলে অনেকেই বাংলাদেশে চলে আসেন। আর একটা বড় অংশ যারা আসতে পারেননি তারা কোন না কোনভাবে ইউরোপ ঢোকার চেষ্টা করে। তখন থেকেই ওই পথটা পরিচিত হয়ে ওঠে। মানব-পাচার চক্র বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া হয়ে ইউরোপ নিয়ে যাওয়ার ব্যবসা শুরু করে। আধুনিক নৌযানে যাওয়াই যেখানে কঠিন, তখন এই পাচারকারীরা মানুষকে তুলে দিচ্ছে ছোট নৌযানে।

মানব পাচার রোধে কঠোর আইন রয়েছে। কিন্তু সেই আইন মোতাবেক তদন্ত, বিচার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে শাস্তি ঘোষণার হারের নিরিখে বাংলাদেশের সক্রিয়তা খুব কম। ২০১৭ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর মানব পাচারের বিশ্বব্যাপী একটি বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যা ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস (টিআইপি) রিপোর্ট ২০১৭’। এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কেও তথ্যউপাত্ত রয়েছে। মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ সফলতা দেখাতে পারেনি বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

কেন এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ বাইরে যায়? একটা বড় কারণ বেকারত্ব। দেশে কাজের বড় অভাব। তরুণরা যেকোনো মূল্যে দেশ ছাড়তে চান। তারা ভাবে ইউরোপ যেতে পারলেই ভাগ্য খুলে যাবেই। অনেকেই হয়তো বলবেন, যে টাকা খরচ করে তারা বাইরে যাচ্ছে তা দিয়ে দেশে অনেক কিছুই করা সম্ভব। হ্যাঁ সম্ভব হয়তো, আবার সম্ভব নাও। ব্যবসা করার মত পরিবেশ, সুযোগ সব ক্ষেত্রে থাকেনা, সবার দক্ষতাও থাকে না। ব্যবসা করতে গিয়ে চাঁদাবাজিসহ যেসব হয়রানির মুখোমুখি হতে হয় একজনকে, এতে করেও অনেকে উৎসাহ পান না।

মানব পাচারের মামলা হয় অনেক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শাস্তি হয় খুব কম লোকের। অনেক সময় পুলিশ প্রতিবেদন সঠিকভাবে আসে না। সে ক্ষেত্রে আদালতের কিছুই করার থাকে না। ঘটনা এখানে রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতার কথা ভেবে সাত বছর আগে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান করা হয়েছিল। কিন্তু বিচারকের স্বল্পতা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা না থাকায় এই ট্রাইব্যুনাল এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

মানব পাচারের ব্যাপকতা রোধ করতে হলে দেশের অর্থনীতির দিকে নজর দিতে হবে। আমাদের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, কিন্তু সাথে বেকারত্ব ব্যাপক আকার নিচ্ছে। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব একসাথে চলে। কিন্তু প্রবৃদ্ধি আর বেকারত্ব একসাথে চলতে থাকলে এরকম প্রলুব্ধ হয়ে জীবনে ঝুঁকি নিয়েই দেশ ছাড়বে তরুণরা।

বেকারত্বের যন্ত্রণা বোঝা দায়। তবুও বিপদ জেনে তরুণদের এমনভাবে যাওয়া মেনে নেয়া যায় না। এই অসচেতন অপরিণামদর্শী মানুষদের যাওয়া ঠেকাতে হবে। কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি না হলে এ কতে হবে আমাদের। গত এক দশকেরও বেশি সময়ে দেশ থেকে চার লাখ কোটি টাকার বেশি পাচার হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যারা বড় অর্থের মালিক তারা এদেশের বিনিয়োগে ভরসা পাচ্ছেন না।

প্রবৃদ্ধি আর মাথাপিছু আয়ের গড় যে হিসাব বাড়ছে, তার সাথে তরুণদের স্বপ্ন দেখাতে হবে- জীবনের নিশ্চয়তা এখানেও আছে।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, জিটিভি।

এইচআর/জেআইএম

দেশে কাজের বড় অভাব। তরুণরা যেকোনো মূল্যে দেশ ছাড়তে চান। তারা ভাবে ইউরোপ যেতে পারলেই ভাগ্য খুলে যাবেই। অনেকেই হয়তো বলবেন, যে টাকা খরচ করে তারা বাইরে যাচ্ছে তা দিয়ে দেশে অনেক কিছুই করা সম্ভব। হ্যাঁ সম্ভব হয়তো, আবার সম্ভব নাও। ব্যবসা করার মত পরিবেশ, সুযোগ সব ক্ষেত্রে থাকেনা, সবার দক্ষতাও থাকে না।

আপনার মতামত লিখুন :