বাজেট কী দিল?

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা , প্রধান সম্পাদক, জিটিভি
প্রকাশিত: ১২:৫১ পিএম, ১৫ জুন ২০১৯

ধনীরা বাজেট নিয়ে ভাবেনা, তাদের জন্য সব বাজেটই সুখের। গরিব বাজেট নিয়ে ভাবার অবকাশ পায় না। ভাবনা কেবল মধ্যবিত্তের। এবং সেটাই ঘটছে নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামালের ২০১৯-২০ অর্থ বছরের জন্য ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকারর বাজেট নিয়ে।

চাষীদের রোজগার বাড়বে কিনা, তারা তাদের উৎপাদিত ফসলের দাম পাবে কিনা, এসব নিয়ে দু’দিন আগেও সামাজিক মাধ্যমে সরব ছিল যে নাগরিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি, তারা আজ নিরব। স্বাভাবিক কারণে এদের চিন্তায় এখন ব্যানসন সিগারেট বা স্মার্ট ফোনের দাম।

অর্থমন্ত্রী অসুস্থ ছিলেন বিধায় নিজের জীবনের প্রথম বাজেটটির উপস্থাপনা নিজে উপভোগ করতে পারেননি। তবে অন্তত এইটুকু নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যাতে তার বাজেটে একটা নতুনত্ব থাকে। কিন্তু পুরাতন ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে খুব নতুন কিছু করতে পারেননি তিনি, উপস্থাপনায় ভিন্নতা আনয়ন ছাড়া।

অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল তার প্রথম বাজেটে খরচের যে হিসাব ধরেছেন, তা বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১৮.১ শতাংশের সমান। এই আকারকে খুব বড় বা উচ্চাভিলাষি বলা যায় না যদি জিডিপি’র অনুপাতে হিসাব করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়ন সক্ষমতার নিরিখে এটিও বড় বাজেট।

যে অর্থ বছরটি বিদায় নিতে চলেছে সেই অর্থ বছরের ৯ মাসে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব সংগ্রহ করতে পেরেছে ১ লাখ, ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এর অর্থ হলো বাকি তিন মাসে করতে হবে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব সংগ্রহের এমন বাস্তবতায় এই পাঁচ লাখ কোটি টাকাকেও বড় মনে হয়।

রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা আছে। সরকারের সামনে বিরোধী পক্ষ থেকে কোন চ্যালেঞ্জ নেই। অর্থনৈতিক স্থিতি এখন খুব জরুরি। শিল্পবাণিজ্য তথা অর্থনীতির জন্য অর্থমন্ত্রীর দূরদৃষ্টির প্রত্যাশা ছিল অনেক। অর্থাৎ সাহসী সংস্কারের পথে হাঁটবেন বলেই আশা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। তিনি হয়তো ভেবেছেন সংস্কার হোক বা না হোক, অর্থনীতি যদি বার্ষিক ৮ শতাংশের বেশি হারে এগিয়ে চলে, তবে শুধু শুধু তাকে ঘাঁটানোর দরকার কী? তাই তিনি অস্থির ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় কোন ভাবনা ভাবেননি, শুধু বলেছেন ব্যাংকিং কমিশনের কথা ভাবা হচ্ছে।

২০১২ সাল থেকে ক্রমাগত ব্যর্থ হওয়া ভ্যাট আইনকে তিনি কোন রকমে বাস্তবায়িত করা শুরু করতে যাচ্ছেন। তিনি এক কোটি লোককে করের আওতায় আনার কথা ভেবেছেন আর তিন কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের কথাও উচ্চারণ করেছেন।

বরাবরের মতো আগামী বাজেটের ঘাটতিও থাকছে জিডিপির ৫ শতাংশ। তবে সেট ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে সরকারের ভরসা ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ গ্রহণ এবং যার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ প্রায় স্তব্ধ হয়ে আছে। আগামী অর্থ বছরে ব্যাংক থেকে সরকার ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ঋণ নিতে চায়। এছাড়া, জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৭ হাজার কোটি টাকা।

বাস্তব পরিস্থিতির চাপ অগ্রাহ্য করার কোনও উপায় হয়তো তার জানা নেই। বাজেটে কর বাড়ানো হয়নি। মোট জনসংখ্যার মাত্র দশ ভাগ লোক কর দেয়। আর তাই আমাদের কর জিডিপি অনুপাত বিশ্বে সর্বনিম্নে। অর্থমন্ত্রী যে এক কোটি মানুষকে করের আওতায় আনতে চাচ্ছেন, এর অর্ধেকও যদি পারেন তবে তার একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনায়।

কর কাঠামো পুরোটাই মূল্য সংযোজন করের উপর দাঁড়িয়ে আছে। অর্থাৎ অর্থনীতির আয়ের যোগান আসছে পরোক্ষ কর থেকে। অথচ প্রত্যক্ষ করই হওয়া দরকার ছিল মূল আয়। এক কথায় এই কর কাঠামোকে প্রতিক্রিয়াশীল ছাড়া আর কিছু বলার নেই। করমুক্ত আয়ের সীমা কিন্তু এখনও আগের মতো ২.৫ লক্ষ টাকা পর্যন্তই আছে, তা বেড়ে ৫ লক্ষ হচ্ছে না।

কর্পোরেট করেও কোন পরিবর্তন নেই। মোট আকারের প্রায় এক চতুর্থাংশ যাচ্ছে জনপ্রশাসন খাতে। এই খাতে এবার সবচেয়ে বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা দিতে গিয়ে রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেটের ১৮ শতাংশের বেশি সরকারকে খরচ করতে হবে।

সৎ মানুষদের হতাশ করে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ এবারও দেয়া হচ্ছে। বলা হলো ফ্ল্যাট, হাইটেক পার্ক বা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করলে এই সুবিধা পাবে। বাস্তবতা হলো, যারা অবৈধ পথে কালো টাকা বানায় তারা কোন উৎপাদনশীল খাতে সেই টাকা বিনিয়োগ করেনা। কিছু ফ্ল্যাট হয়তো বিক্রি হবে, তবে তাতে অর্থনীতিতে এর কোন ইতিবাচক পোভাব থাকবে না।

এই বাজেট অর্থনীতিতে জোয়ার আনবে বলে ভরসা করা কঠিন। মেগা, বড়, মাঝারি, ছোট মিলিয়ে আকাশ ছোঁয়া রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগের কোন নিশ্চয়তা নেই। কারণ ব্যাংকিং খাতে প্রত্যাশিত সুশাসন ফিরবে কিনা আনিশ্চিত। তবে বাজেটে বেশি কিছু পপুলিস্ট প্রস্তাবনা আছে যেমন তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ১০০ কোটি টাকার স্টার্ট-আপ তহবিল, রেমিটেন্স বৈধ পথে পাঠালে দুই শতাংশ প্রণোদনা।

বাজেট ঘোষণার পরেই শুরু হয়ে গিয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। আম জনতা জানতেও পারবে না কার ঝুলি ঠিক কতখানি ভরল। তারা বুঝতেও পারবে না শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য কী দিল ২০১৯-২০ সালের বাজেট। মধ্যবিত্ত, কৃষক তথা সারাদেশের অসংগঠিত বিশাল জনগণের ভাবনার প্রয়োজনই বা কী বাজেট নিয়ে?

লেখক : প্রধান সম্পাদক, জিটিভি।

এইচআর/জেআইএম

বাজেট ঘোষণার পরেই শুরু হয়ে গিয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। আম জনতা জানতেও পারবে না কার ঝুলি ঠিক কতখানি ভরল। তারা বুঝতেও পারবে না শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য কী দিল ২০১৯-২০ সালের বাজেট। মধ্যবিত্ত, কৃষক তথা সারাদেশের অসংগঠিত বিশাল জনগণের ভাবনার প্রয়োজনই বা কী বাজেট নিয়ে?

আপনার মতামত লিখুন :