হার্টে কিডনি: বুড়িগঙ্গায় টেমস!

মোস্তফা কামাল
মোস্তফা কামাল মোস্তফা কামাল , সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৯:৫৯ এএম, ১৭ জুলাই ২০১৯

ট্রাম্পের বহু ফলোয়ার্স বাংলাদেশেও। উদ্ভট মন্তব্য করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো আলোচনার ঝড় তোলা মুরিদ এখানেও কম নন। তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীকে এ রেসে আগুয়ান মনে করা হলেও সময় বদলে গেছে। হাছান-রিজভীকে ছাড়িয়ে গেছেন অনেকে। তা রাজনীতি বা মন্ত্রী-এমপির বাইরে অন্যান্য পর্যায়েও।

ট্রাম্পের দেশে কিডনিবিষয়ক স্বাস্থ্য জটিলতা নিয়ে জোরেশোরে কাজ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওয়াশিংটন ডিসিতে একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন। এরপর দেওয়া বক্তৃতায় চিকিৎসকদের পিলে চমকে দিলেন ট্রাম্প। জানালেন, কিডনি থাকে হার্টের ভেতর। কিডনি বিশেষজ্ঞদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, কিডনি নিয়ে আপনারা কঠোর শ্রম দিয়েছেন। হার্টের বিশেষ জায়গায় কিডনি আছে। এটি একটি অবিশ্বাস্য বিষয়।’

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবিভাগের ওয়েবসাইটে লেখা রয়েছে, মানুষের পিঠের নিচের অংশে বুকের মাঝে একটু বাঁ দিকে দুটি কিডনি থাকে। কিন্তু, মার্কিন প্রেসিডেন্ট কী বললেন? চিকিৎসক বা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ না হলেও তিনি কি ভুল বলতে পারেন? তার স্ত্রী ফার্স্টলেডি মেলনিয়া ট্রাম্পও একজন কিডনি রোগী। তার নিয়মিত চিকিৎসায় অনেক সময় দেন ট্রাম্প।

ট্রাম্পের এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমকে বেশ হিট করেছে। কমেন্টে কেউ লিখেছেন, ট্রাম্প বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরবিদ্যা বিষয়ক একজন স্নাতক। কেউ লিখেছেন, ট্রাম্প শরীর ব্যবচ্ছেদ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। ট্রাম্প যখন বলেছেন তখন অবশ্যই হার্টের মধ্যে কিডনি আছে, এটা কোনো মজা করার বিষয় নয়- এমন কমেন্টসও আছে। ইনিরবিনির না করে ট্রাম্পের পক্ষে দাঁড়ানো লোকও আছে। তারা বলছেন, ট্রাম্প আসলে এই কথার মাধ্যমে কিডনির গুরুত্ব বুঝিয়েছেন। পরামর্শ দিয়েছেন কিডনির গুরুত্ব হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে।

এর আগে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, চাঁদ আসলে মঙ্গল গ্রহের অংশ। এটিও বেশ ঝড় তোলে গণমাধ্যমে। পৃথিবী থেকে মঙ্গল গ্রহের দূরত্ব প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ মাইল। পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব মাত্র ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫৫ মাইল হলেই বা কী? ট্রাম্পের কথা এসব তথ্যের চেয়ে অনেক দামি। আরেক টার্ম ক্ষমতায় এলে চাঁদকে ট্রাম্প স্টেটের অংশ করে নেয়ার চেষ্টা করেন কি-না, সেটা অপেক্ষা করে দেখতে চান কেউ কেউ।

উদ্ভট ও হাস্যকর মন্তব্য ছোঁড়ার কাজে বাংলাদেশে ট্রাম্পের চেতনা লালনে কে বেশি পাক্কা তা নির্ণয় করা কঠিন। নানা কাণ্ড ও মুখ দোষে নেতা-মন্ত্রীদের আলাদা নাম ও পরিচিত হয়ে ওঠার অনেক ঘটনা দেশে রয়েছে। এই গুণেই খাম্বা নাড়াচাড়া মন্ত্রী, মালমন্ত্রী, ঘুমমন্ত্রী, সিগারেটমন্ত্রী, তালামন্ত্রী, আবুল মন্ত্রীসহ কতো ছদ্ম নাম। রয়েছে ফাটাকেস্টও। তারা বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, লসএঞ্জেলস বানিয়ে দিচ্ছেন। মজাদার বচন ও কাণ্ডে তারা সাড়া জাগিয়েছেন। এ অবস্থায় মিতভাষী, ঠাণ্ডা-সুবোধরাও পিছিয়ে থাকছেন না।

তুলনামূলক কম কথার মানুষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালই বা পিছিয়ে থাকবেন কেন? বলে দিলেন টেমস নদী দেখতে লন্ডন যেতে হবে না, বুড়িগঙ্গা গেলেই হবে। তিনি এর আগে বলেছিলেন, দেশে গুম বলতে কিছু নেই। কিছু লোক পাওনাদারের ভয়সহ নানা কারণে লুকিয়ে থাকে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল নিয়মিতই শুনিয়ে যাচ্ছেন রকমারি কথা। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কানাডার সমান। তার আরেক বচন: ২০৪১ সালে বাংলাদেশের কাছ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঋণ নেবে।

ধর্ষণের কারণ নিয়ে গবেষণালব্ধ তথ্য দিয়েছেন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক। তার মতে, দেশে টিভি চ্যানেলের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ধর্ষণের ঘটনা গণমাধ্যমে বেশি উঠে আসছে। তথ্যপ্রযুক্তিতে থাকার সময় ডাক টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার জানিয়েছিলেন, কিশোর বয়সে রোজ ৪০ মাইল হেঁটে স্কুলে যেতেন তিনি। রীতিমতো গিনেজ বুকে ওঠার মতো রেকর্ড। বিশ্বনেতা বা বিশ্বব্যক্তিত্ব হতে ইচ্ছুকদের জন্য শিক্ষনীয়। পরে ৪০ মাইলকে নানান ব্যাখ্যায় কথা ঘুরিয়ে ফেলেছেন। সাংবাদিকদেরও দুষেছেন। ৪০ নয়, আসলে তিনি চার মাইল বলেছিলেন। সাংবাদিকরা না বুঝে ৪০ মাইল বলে চালিয়েছে। বিদেশের মন্ত্রীরা বাংলাদেশের মন্ত্রীদের পরামর্শের জন্য অ্যাপোয়েনমেন্ট চান বলেও জানিয়েছেন তিনি।

ধানের দাম না পেয়ে বগুড়ায় কৃষকের জমিতে ধান পুড়িয়ে ফেলা ইস্যুতে বিনোদন যোগান আওয়ামী লীগের ক্ষমতাধর নেতা যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব উল আলম হানিফ। তিনি বলেন, নিজের ধানক্ষেতে কৃষকের আগুন দেওয়ার ঘটনা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। বগুড়ায় ধানক্ষেতে আগুনের ছবি বাংলাদেশের নয়- এমন বাণীও দিয়েছিলেন তিনি। কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, ফসলের দাম না পেলে ফ্রান্সেও ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। ছাত্রলীগ নেতারা ধান নিয়ে ট্রাম্পকে ডিসকোয়ালিফাই করে দেখিয়েছেন আরো মজার ঘটনা। ডিজাইন করা নতুন জামা কাপড় বানিয়ে তা পরে তারা গেলেন ধান কাটতে। গেঞ্জিতে আওয়ামী লীগের নৌকার ছাপ, এক হাতে সিপিবির কাস্তে, আরেক হাতে বিএনপির ধানের শীষ, কোমরে কাদের সিদ্দিকীর গামছা। কী চমৎকার কম্বিনেশন।

হানিফের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট থেকে তথ্য পাওয়ায় ফণীর ক্ষতি কমানো গেছে মর্মে দেয়া বক্তব্যও মানুষকে আচ্ছা বিনোদিত করেছে। তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, টিআইবির দুর্নীতির রিপোর্ট বিএনপি আমলে সঠিক ছিল, এখন মনগড়া । কারণ বর্তমানে দেশে দুর্নীতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। ওপর থেকে ঢাকা দেখতে সিঙ্গাপুর-শিকাগোর মত দেখায় এমন বানীও এসেছে তার কাছ থেকে। এই কিছিমের বচনে সম্প্রতি বেশ ফর্মে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন।

রিকশা উচ্ছেদ অভিযানের সাফাই গাইতে গিয়ে নগরবাসীকে হেঁটে চলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, এতে স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। এ মন্তব্যের সামান্য ক’দিন আগে বলেছেন, পেঁপে পাতার জুস খেলে ডেঙ্গু ভালো হয়ে যায়। কিভাবে? কেন? সেটার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। মেয়র জানান, পেঁপে পাতার মধ্যে এক ধরনের এনজাইম রয়েছে। ডেঙ্গু হলে রক্তে যে প্লাটিলেটের সমস্যা থাকে পেঁপে পাতার জুস খেলে তা কমে যায়।

মেয়র খোকনের প্রেসক্রিপশনে ডাক্তারদের গবেষণা ও বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি বেড়ে গেছে। মেয়র বলে কথা। তা-ও আবার সাবেক সফল মেয়র হানিফের ছেলে। তার কথা বেঠিক হয় ক্যামনে? কোন বিজ্ঞান বা চিকিৎসা শাস্ত্রের কোন গবেষনায় পেঁপে পাতার এ গুণ পাওয়া গেছে তা ভেবে হয়রান ডাক্তাররা। খোকনের আগে উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম শুনিয়েছেন আরো ইন্টারেস্টিং তথ্য। তার মতে, ঢাকার পাবলিক টয়লেটগুলো ফাইভস্টার হোটেলের মতো।

বরগুনায় রিফাতকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনার নিন্দা না করে কুমিল্লার এমপি রাজি ফখরুল উল্টো প্রশ্ন তুলেছেন ঘটনার তথাকথিত নেপথ্যে যে নারী মিন্নি, তাকে কেন আঘাত করা হলো না? কতো বিজ্ঞ-বিচক্ষন প্রশ্ন! মন্ত্রী-এমপির বাইরে অন্যান্য সেক্টরও এ কর্মে এখন বেশ পাকা। সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা ইস্যুতে একজন মহিলা এমপি বলছিলেন এস কে সিনহা হিন্দু নয়। আরেকজন বলেছেন তিনি রাজাকার। শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। আরেকজন বলেছেন এই রায়ের ড্রাফ্ট একটি ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদকের লেখা।

জাতির মেরুদণ্ড শিক্ষাগুরুরাই বা বাদ যাবেন কেন ট্রাম্প সিনড্রম থেকে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দশ টাকায় ছা, ছপ, ছিঙ্গারা, ছমুছার কৃতিত্বের গর্ব করেছেন এর ভিসি প্রফেসর ড. আখতারুজ্জামান। বিচারালয়েও গড়িয়েছে এ বাতিক। সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমের জামিনের শুনানিতে সেই স্বাক্ষর রাখলেন তার আইনজীবী আহসান উল্লাহ। তিনি বলেন, ওসি মোয়াজ্জেমের কান খারাপ। তার কানে সমস্যা আছে। এ কারণে ভিডিওতে নুসরাতকে বার বার একই প্রশ্ন করেছেন বলে আদালতকে বুঝ দেয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

জ্ঞানীজনেরা বলে থাকেন ক্ষমতার তেজ ধরে রাখা দুনিয়ার যতো কঠিন কাজের একটি। গতকালের ধীর-স্থির, শান্ত-সুবোধ ব্যক্তিও আজ বেসামাল হয়ে ওঠেন ক্ষমতা পেয়ে- এমন নজির ভূরি ভূরি। হোক তা রাষ্ট্রীয়, দলীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক, চাকরি, ধন-জন যে কোনো ক্ষমতা। ক্ষমতার এ তেজে হস্যকর বস্তুতে পরিণত হন তারা। তবে, তারা ‘কি-না’বললেও খান ভালোই। বাণী-বচনে চরমতম স্বাধীন তারা। ক্ষমতায় আটখানা হওয়া ব্যক্তিরা খুশিতে, ঠেলায় লাজ-শরমের মাথাও খেয়ে ফেলেন কখনো কখনো। আশপাশে কে কী মনে করলো, কী বললো তা দেখার ফুসরতও থাকে না তাদের। লজ্জা বা কিছু মনে করার সময়ও হয় না। দু’দিন আগেও যে তিনি এ মাটি-বাতাসের লোক ছিলেন তা-ও মনে করতে পারেন না।

ক্ষমতা, সুখ, সম্পদ কি অন্ধ করে দিচ্ছে তাদের? না-কি বড় দায়িত্বের ভারে ভারসাম্যহীন হয়ে যান? নইলে কেন একজনের আরেকজনকে টপকাতে উল্টাপাল্টা কথার এমন নগ্ন প্রতিযোগিতা? পাতি থেকে পতি, হাফ থেকে ফুল সবাই নিয়মিত বিনোদন দেন। বয়স হয়ে গেলে মানুষ হয় মজার কথা বলে মানুষ হাঁসায়, নয়তো অসংলগ্ন কথাবার্তা বলে। কিন্তু, মিডিয়ার সামনে হাস্যকর বিবৃতি দেওয়া মন্ত্রী, এমপি নেতাসহ বিশিষ্টজনরা সবাই বয়োবৃদ্ধ নন। তুলনামূলক তাগড়া, সামর্থবানরাও রয়েছেন এই কাতারে। তাই এটাকে একবাক্যে বয়সের ভারের সাইড ইফেক্ট বলে দেয়ার সুযোগ নেই। সেই দৃষ্টে মানুষও এগুলোকে সিরিয়াসলি না দেখে সিরিয়াল বিনোদন হিসেবে নিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এসব লক্ষণ মানসিক সমস্যার ইঙ্গিত হোক না হোক, ট্রাম্পের চেতনায় উজ্জীবিত হওয়ার প্রমাণ দেয়।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

এইচআর/জেআইএম

উদ্ভট ও হাস্যকর মন্তব্য ছোঁড়ার কাজে বাংলাদেশে ট্রাম্পের চেতনা লালনে কে বেশি পাক্কা তা নির্ণয় করা কঠিন। নানা কাণ্ড ও মুখ দোষে নেতা-মন্ত্রীদের আলাদা নাম ও পরিচিত হয়ে ওঠার অনেক ঘটনা দেশে রয়েছে। এই গুণেই খাম্বা নাড়াচাড়া মন্ত্রী, মালমন্ত্রী, ঘুমমন্ত্রী, সিগারেটমন্ত্রী, তালামন্ত্রী, আবুল মন্ত্রীসহ কতো ছদ্ম নাম। রয়েছে ফাটাকেস্টও। তারা বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, লসএঞ্জেলস বানিয়ে দিচ্ছেন। মজাদার বচন ও কাণ্ডে তারা সাড়া জাগিয়েছেন। এ অবস্থায় মিতভাষী, ঠাণ্ডা-সুবোধরাও পিছিয়ে থাকছেন না।

আপনার মতামত লিখুন :