পিটিয়ে মানুষ মারার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?

হাবীবাহ্ নাসরীন
হাবীবাহ্ নাসরীন হাবীবাহ্ নাসরীন , কবি ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০১:১৫ পিএম, ২৪ জুলাই ২০১৯

অনেক দিনের অনভ্যস্ততায় নিজের আইডি কার্ডটি ব্যাগে নিয়ে ঘুরতাম এতদিন। প্রায় বছর দুয়েক পরে আবার সেটি গলায় পরতে শুরু করেছি গতকাল থেকে। আমার উদ্দেশ্য একটাই, ‘ছেলেধরা’ অপবাদে আমাকে পিটিয়ে মেরে ফেলার আগে খুনীরা যেন দেখতে পায় আমি ছেলেধরা নই, সাংবাদিক!

সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সহজাত স্বভাব আমার। রাস্তায়, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলতে কখনো ইতস্তত করি না। রিক্সায় চড়লে রিক্সাওয়ালা, বাসে চড়লে পাশের যাত্রী যে কারো সঙ্গেই ভাব জমে যায়। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কাছে আমি একটু বেশিই প্রিয়। মাঝে মাঝেই তো ওদের এটা-সেটা কিনে দেই, খেতে নিয়ে যাই। এক প্লেট খাবারের বিনিময়ে ওরা আমাকে ওদের অমূল্য দুঃখগুলো শোনায়। আমি টলমল চোখে ওদের গল্পবলা দেখি। চিরকালীন এই আমিটাকে কি আমি হারিয়ে ফেলবো? গণপিটুনী খেয়ে মরার ভয়ে আমি কি ওদের থেকে পালিয়ে বেড়াবো?

‘ছেলেধরা’র গুজবটি এমন বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে গেছে যে এটি যে মিথ্যা তা বলে বোঝানো প্রায় দুঃসাধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু নিরক্ষর কিংবা স্বল্পশিক্ষিত মানুষই নয়, অনেক শিক্ষিত মানুষও কান নিয়েছে শুনে সেই চিলের পেছনে দৌঁড়াচ্ছেন! কোনো একটি মিথ্যা মহামারী আকার ধারণ করলে তার ফলাফল কেমন হতে পারে, আমরা এখন তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। ফলে অপরাধ না করেও ভূক্তভোগী হতে হচ্ছে আমাদেরও।

উত্তর বাড্ডায় রেনু নামের যে মাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো, তার সন্তান মা-হারা হওয়ার মধ্যেই সেই ক্ষতি সীমাবদ্ধ নয়। যে মানুষগুলো খুনী হিসেবে আটক হলো, সেই সকালের আগ পর্যন্তও তারা ছিল সাধারণ মানুষ। একটা দিন আগেও তারা আর সবার মতোই বাজার-সদায় করেছে, গৃহস্থালী কাজ করেছে, নাওয়া-খাওয়া-ঘুম সবই স্বাভাবিক ছিল। কে জানতো এই স্বাভাবিকতার ভেতরেই তারা লালন করছে একেকটি খুনীসত্তা! এইযে হঠাৎই একজন সাধারণ মানুষের খুনী হয়ে ওঠা- এই নেতিবাচক পরিবর্তনের ধাক্কা সামলানো মুশকিল। সমাজে যেকোনো অপরাধই ভাইরাসের মতো সংক্রমিত হয়, যদি না তা নির্মূল করা সম্ভব হয়। তাইতো আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাড্ডায় এমন ঘটনার পরেও সারাদেশে আরও অনেক নিরপরাধীকে ‘ছেলেধরা’ অপবাদে পিটিয়ে মারা হচ্ছে!

যদি কেউ সত্যি অপরাধী হয়, যদি সে ‘ছেলেধরা’ও হয়, কারও অধিকার নেই তাকে পিটিয়ে হত্যা করার, এমনকী তাকে ছোটখাট আঘাতও করার! কেউ অপরাধী হলে তার বিচারের জন্য দেশে আইন রয়েছে। সেই আইন ভঙ্গ করে নিজেই বিচার করলে আপনিও অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবেন। এমন করে একটা সময় দেশে শুধু অপরাধীই থাকবে, আর কেউ না!

আপনার, আমার, আমাদের মধ্যে যে খুনীসত্তা, যে হিংস্রসত্তা লালিত হচ্ছে, সময় থাকতে তা দমন করুন। হিংস্রতা কখনো কোনো সমাধান হতে পারে না। অন্যকে আঘাত করার পশুত্ব দমন না করতে পারলে আপনার ধ্বংস অনিবার্য। পিটিয়ে নাহয় একটা মানুষ মেরে ফেললেন, সেই অপরাধে আপনাকে জেলে পচে মরতে হবে, আপনার পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে, আপনার স্ত্রী-সন্তান পথে বসবে, আপনার বাবা হয়তো লজ্জায় গলায় দড়ি দিয়ে মরবে- এগুলো কি আপনার জন্য সুখকর হবে? অন্যের জন্য না হোক, নিজের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও আপনার উচিত এমন অসভ্য, জঘন্য আচরণ থেকে বিরত থাকা।

যিনি খুন হয়েছেন এবং যিনি খুনটি করেছেন, প্রত্যেকের জীবনই সমান মূল্যবান। প্রত্যেক মানুষেরই সমাজের প্রতি, রাষ্ট্রের প্রতি, মা-বাবা ও পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে। জীবন যদি ব্যয় করতেই হয়, সেসবের কল্যাণে ব্যয় হোক, মিথ্যা গুজবে কান দিয়ে, একটি জীবন্ত প্রাণকে হত্যা করে, সমাজে বিশৃঙ্ক্ষলা সৃষ্টি করে নয়। চলুন, মানুষ নয়, আমাদের ভেতরের খুনী সত্তাটিকে হত্যা করি।

এইচআর/জেআইএম