ব্যাহত শিল্প-উৎপাদন, কমছে রপ্তানি আয় সংকটে অর্থনীতি

মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল
মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল , কলামিস্ট ও শিল্প-উদ্যোক্তা
প্রকাশিত: ০৯:৫৫ এএম, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতা, আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্য এবং ডলার সংকটসহ নানান কারণে বাংলাদেশ এক গভীর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মুখোমুখি। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গৃহস্থালিতে তীব্র গ্যাস ও এলপিজি সংকট সৃষ্টি করেছে। এই বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের তীব্র ঘাটতি দেশের অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, কৃষি, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে। সহজ করে বললে, দেশ বর্তমানে যে গভীর জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়- এটি এখন বাস্তব ও বহুমাত্রিক সংকট। সরকার একসময় বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত কিংবা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ স্বনির্ভরতার গল্প শোনালেও বাস্তব চিত্র আজ তার সম্পূর্ণ বিপরীত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াট। অথচ সর্বোচ্চ চাহিদার সময়েও গড়ে ১৪- ১৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

কাগজে-কলমে সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সংকটের কারণে অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। এই বৈপরীত্যই বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার প্রমাণ। এই সংকটের মূল কেন্দ্রে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫৫-৬০ শতাংশ গ্যাসনির্ভর। অথচ গ্যাসের দৈনিক চাহিদা যেখানে প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি), সেখানে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২৭০০- ২৮০০ এমএমসিএফডি-তে। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার এমএমসিএফডি গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতির প্রভাব বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প ও গৃহস্থালি সবখানেই।

দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলন ক্রমেই কমছে। ২০১০ সালে যেখানে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ছিল প্রায় ২ হাজার ৩০০ এমএমসিএফডি, বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১ হাজার ৮০০ এমএমসিএফডি-এর নিচে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে দীর্ঘদিন কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় এই পতন আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। বিকল্প হিসেবে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হলেও সেটি ব্যয়বহুল এবং বৈদেশিক মুদ্রানির্ভর। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ বছরে গড়ে ৮-৯ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করে, যার পেছনে ব্যয় হয় ৫-৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার- আন্তর্জাতিক বাজারদরের ওপর নির্ভর করে। ডলার সংকটের সময়ে এই ব্যয় সরকারকে চরম চাপে ফেলেছে। ফলে অনেক সময় নির্ধারিত পরিমাণ এলএনজি আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে।

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৩৮০ কোটি ঘনফুট। যেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে ২৫৮ কোটি ঘনফুট। চাহিদা ও সরবরাহে বর্তমানে ঘাটতি থাকছে দৈনিক ১২২ কোটি ঘনফুট। অন্যদিকে বর্তমানে যে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে তা গত বছরের এ সময়ের (১০ জানুয়ারি, ২০২৫) তুলনায় ১৭ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট কম। ওই সময়ে দেশে গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ ছিল ২৭৫ কোটি ঘনফুট। দেশে গ্যাস উত্তোলনে নিয়োজিত পাঁচ কোম্পানির চারটির উৎপাদন গত এক বছরে হ্রাস পেয়েছে। স্থানীয় উৎপাদনের এ ঘাটতি মেটাতে বিকল্প সমাধান হিসেবে বিপুল অর্থে কেনা হচ্ছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও অন্তত সাড়ে ৫১ হাজার কোটি টাকার ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। কিন্তু সেখানেও রয়েছে সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে বড় অনিশ্চয়তা। জ্বালানির বৈশ্বিক বাজার নিয়ে পরাশক্তিগুলোর কৌশলে আটকে গেলে আগামীতে গভীর জ্বালানি সংকটে পড়ার আশঙ্কা করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরা। এরই মধ্যে দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে। বিশ্ববাজার থেকে পণ্যটি আমদানিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও জাহাজে যুক্তরাষ্ট্রের স্যাংশনের বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশে।

এই জ্বালানি সংকট কেবল বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, কৃষি ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। বলতে দ্বিধা নেই, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে শক্তি নিরাপত্তা যেখানে হওয়ার কথা ছিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, সেখানে পরিকল্পনাহীনতা, আমদানি নির্ভরতা ও দুর্বল শাসনব্যবস্থার কারণে জ্বালানি খাত আজ সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে।

এই কিছুদিন আগের কথা, হঠাৎ করেই বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে এলপিজি। সারা দেশে এই তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দেয়। সরকার নির্ধারিত দামে যেখানে একটি ১২ কেজি এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্য প্রায় ১২০০ টাকা, সেখানে বাস্তব বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২২০০ থেকে ২৫০০ টাকায়- কোথাও কোথাও আরও বেশি। পাইপলাইনের গ্যাস সংকটের সুযোগ নিয়ে এলপিজি বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করছে কিছু আমদানিকারক ও পরিবেশক গোষ্ঠী। শীত মৌসুমে চাহিদা বাড়ে- এটি জানা কথা। কিন্তু চাহিদা বাড়লেই দ্বিগুণ দামে সিলিন্ডার বিক্রি হবে, এমন কোনো যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে পরিষ্কারভাবে নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ও দুর্বল নজরদারির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ভোগান্তিতে পড়ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো। রান্নার মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে তাদের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়েছে। সরকারের কঠোর নজরদারিতে যে অবস্থার শতভাগ পরিবর্তন হয়েছে তাও বলা যাবে না।

আসলে জ্বালানি সংকট কেবল একটি খাতের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা ও দূরদর্শিতার পরীক্ষা। আজ যে সংকট আমরা দেখছি, তা উপেক্ষা করলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে চায়, তবে জ্বালানি নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক স্লোগান নয়- জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সময় এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার, নইলে গভীর সংকটে পড়বে বাংলাদেশ- অন্ধকার আরও দীর্ঘ হতে পারে।

এ কথা ভুললে চলবে না, এক দশক আগেও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার গল্প শোনাত। ‘লোডশেডিংমুক্ত দেশ’- এই স্লোগান রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই সাফল্যের আড়ালে যে ঝুঁকি জমা হচ্ছিল, তা সময়মতো বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানি সরবরাহের টেকসই ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। গ্যাস অনুসন্ধান স্থবির থেকেছে, কয়লা উত্তোলন রাজনৈতিক বিতর্কে আটকে গেছে, আর নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ হয়েছে নামমাত্র। আজ পরিস্থিতি এমন যে- বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে কিন্তু জ্বালানি নেই। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছে না, তরল জ্বালানিনির্ভর কেন্দ্রগুলো চালাতে গিয়ে সরকারকে বিপুল ভর্তুকির বোঝা বইতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি ও তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা যে কতটা নাজুক, তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বারবার প্রমাণিত হয়েছে।

জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে শিল্পখাতে। তৈরি পোশাক শিল্প, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ যোগান দেয়, সেখানেই গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট উৎপাদন ব্যাহত করছে। বিভিন্ন শিল্প সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, গ্যাসের স্বল্পতার কারণে অনেক কারখানা ৩০-৪০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। এর ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, সময়মতো রপ্তানি আদেশ পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানা অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে, কোথাও কোথাও উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানের ওপর। শ্রমিক ছাঁটাই, ওভারটাইম বাতিল, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি- সব মিলিয়ে শিল্প খাত আজ চরম অনিশ্চয়তায়।

সবচেয়ে বেশি শোচনীয় অবস্থা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের। অনেক কারখানা নিয়মিত লোডশেডিং ও গ্যাস সংকটে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে। অনানুষ্ঠানিক হিসাবে দেখা যায়, জ্বালানি সংকটের কারণে গত দুই বছরে শিল্প খাতে লাখ লাখ শ্রমিক আংশিক বা সম্পূর্ণ কর্মহীনতার ঝুঁকিতে পড়েছে। কৃষি খাতও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। সেচের জন্য বিদ্যুৎ ও ডিজেলের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় সেচ খরচ বেড়েছে, যা সরাসরি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলাফল হিসেবে খাদ্যের দাম বাড়ছে বাজারে। জ্বালানি সংকট এভাবে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের কাঁধে।

বলা বাহুল্য, সাম্প্রতিক সময়ে নগর জীবনে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন নিত্যদিনের ঘটনা। গ্রীষ্মকালে দীর্ঘ লোডশেডিং জনজীবনকে অসহনীয় করে তোলে। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তথ্যপ্রযুক্তি- সব খাতেই বিদ্যুৎ নির্ভরতা বেড়েছে। অথচ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। গ্রামাঞ্চলেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়; বিদ্যুৎ থাকলেও ভোল্টেজ ওঠানামা কৃষি ও গৃহস্থালি কাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি। পরিবহন খরচ বেড়েছে, সংরক্ষণ ব্যয় বেড়েছে- সব মিলিয়ে জ্বালানি সংকট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংকট কি হঠাৎ করে এসেছে? উত্তর হলো- না। এটি দীর্ঘদিনের ভুল নীতি ও অবহেলার ফল। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ না বাড়িয়ে আমদানিনির্ভর এলএনজির দিকে ঝুঁকে পড়া ছিল একটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। একইভাবে কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে সুস্পষ্ট ও সাহসী সিদ্ধান্ত না নেওয়াও আজকের সংকটকে ঘনীভূত করেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি- বিশেষ করে সৌর ও বায়ু শক্তি- এখনো জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেনি।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব। বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি হলেও সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার হয়নি। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিপুল অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এই অর্থ যদি দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান বা নবায়নযোগ্য খাতে ব্যয় হতো, তবে আজ পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত।

জ্বালানি সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো এর বৈদেশিক মুদ্রার ওপর প্রভাব। এলএনজি, তেল ও কয়লা আমদানিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। ডলার সংকটের সময়ে এই আমদানি ব্যয় সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে সরকারকে একদিকে জ্বালানি আমদানি সীমিত করতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়াতে হচ্ছে। এই মূল্যবৃদ্ধি আবার সামগ্রিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে।

তবে সংকট যত গভীরই হোক, এটি কাটিয়ে ওঠার পথও আছে- যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকে। প্রথমত, দেশীয় গ্যাস ও কয়লা অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দিতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবেশগত ঝুঁকি কমিয়ে এই সম্পদ কাজে লাগানো সম্ভব। দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় পরিসরে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ, ভাসমান সৌর প্রকল্প, উপকূলীয় বায়ু বিদ্যুৎ- এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে হবে। শিল্প, পরিবহন ও গৃহস্থালি পর্যায়ে শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে। গণপরিবহন উন্নত করে ব্যক্তিগত যানবাহনের জ্বালানি ব্যবহার কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে দুর্নীতি ও অপচয় রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

আসলে জ্বালানি সংকট কেবল একটি খাতের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা ও দূরদর্শিতার পরীক্ষা। আজ যে সংকট আমরা দেখছি, তা উপেক্ষা করলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে চায়, তবে জ্বালানি নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক স্লোগান নয়- জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সময় এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার, নইলে গভীর সংকটে পড়বে বাংলাদেশ- অন্ধকার আরও দীর্ঘ হতে পারে।

লেখক : কলাম লেখক ও শিল্পো-উদ্যোক্তা।

এইচআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।