রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং বিভাজন সংস্কৃতি
আমরা সবাই জানি যে যখন রাজনৈতিক অবস্থা ও পারিপার্শিক পরিস্থিতি ব্রিটিশদের প্রতিকূলে চলে যায় তখন তারা ভারতীয় উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভাজনের ঘোষণার মধ্যদিয়ে এই অঞ্চলে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। যার ফলশ্রুতিতে ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হয়। শাসকরা (ব্রিটিশ সামাজ্য) উপনিবেশিকরণের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাজনৈতিক চাল চালিয়ে গেছে এবং উপমহাদেশ ত্যাগ করার সময় ‘বিভাজন ও শাসন নীতির’ প্রয়োগের মাধ্যমে নিশ্চিত করে যে এই অঞ্চলের মানুষ যেন সারা জীবনের জন্য বিভক্ত হয়ে যায়।
এই পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য ব্রিটিশরা ধর্মকে বেছে নিয়েছিল। ব্রিটিশদের এই রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কারণে এই অঞ্চলের মানুষ আজও দুটি ভিন্ন ধর্মীয় মতাদর্শের (মুসলিম ও হিন্দু) ভিত্তিতে বিভক্ত এবং এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে অলিখিত এক ধরনের শত্রুতা চিরস্থায়ী রূপ ধারণ করেছে। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এবং নয় মাস দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) পাকিস্তানের কাছ থেকে নিজেদের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে। যদিও এই দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে সমতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, মনে হয় স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরে আমরা আবার বিভক্ত হয়ে পড়েছি। যে নীতিকে (বিভাজন ও শাসন নীতি) এই অঞ্চলের রাজনীতিবিদরা একসময় ঘৃণা করতো সেই নীতি অবলম্বন করে রাজনৈতিক দলগুলো সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে বিভাজন উস্কে দিয়েছে।
এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমরা (এই দেশের মানুষ) এখন অনেক দলে বিভক্ত হয়ে আছি এবং এই বিভাজনকে যৌক্তিক বলে দাবি করার একমাত্র যুক্তি আমাদের রাজনৈতিক আদর্শ বা বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো (বিশেষত প্রধান দুই রাজনৈতিক দল) আমাদের ‘বোঝার সীমাবদ্ধতার’ ফায়দা নিয়ে বহু বছর ধরে জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে আসছে এবং ফলস্বরূপ আমরা এখন আক্ষরিক অর্থেই বিভক্ত হয়ে পড়েছি।
উদাহরণস্বরূপ আমাদের দেশের প্রায় সমস্ত পেশার মানুষরা দুটি প্রধান গ্রুপে বিভক্ত একটি দল আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে এবং অন্যটি বিএনপির প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করে। আমাদের শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী এমনকি চিকিৎসকরা তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের উপর ভিত্তি করে দুইটি পৃথক দলে বিভক্ত হয়ে গেছে এবং এই দলগুলো সর্বদা পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়ে থাকে। অবশ্যই নিজস্ব মতাদর্শ বা কোন নির্দিষ্ট আদর্শকে সমর্থন দেয়ায় কোন ক্ষতি নেই কিন্তু এটাও সত্যি যে আপনার মতাদর্শ যেন অন্য কারো ক্ষতির/যন্ত্রণার কারণ না হয় এবং শান্তিপূর্ণ অবস্থানকে যেন হুমকির মধ্যে ফেলে না দেয়। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি বিদ্যাপীঠের শিক্ষকরা প্রধান দুই ভাগে বিভক্ত ‘নীল দল’ আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত এবং বিএনপি সমর্থিত শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত হয়েছে ‘সাদা দল’।
উভয় গ্রুপেই অনেক ভালো মানের শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও তারা বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের উন্নতির জন্য কখনও ঐক্যমতের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে সম্মত হয় না। তারা সর্বদা পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়ে থাকে এবং ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থনকারী গোষ্ঠী (শিক্ষকরা) বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে মনে প্রশ্ন আসে শিক্ষকরা নিজেরাই যদি সম্মিলিতভাবে কাজ করার মানসিকতা না রাখেন, তাহলে তারা কীভাবে তাদের শিক্ষার্থীদের একত্রিত হয়ে দেশ ও জনগণের উন্নতির জন্য কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবেন?
তবে এই বিভাজনের নীতি সম্ভবত সবচেয়ে বাজেভাবে প্রভাবিত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদেরকে। রাজনৈতিক নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ সৃজনশীল কিছু থেকে তুলনামূলক ধ্বংসাত্মক (ছাত্র রাজনীতি) কিছুতে সরিয়ে নিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে এট বলাই বাহুল্য যে ছাত্র রাজনীতি শিক্ষা গ্রহণ ও বিবেক শিক্ষিত করার প্রক্রিয়াকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ও ক্ষতি সাধন করছে এই সংস্কৃতি সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছে এবং নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীকে (কিছুসংখ্যক ছাত্রদের) ক্ষমতায়িত করেছে। এই গোষ্ঠী মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে এবং অন্যান্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখে।
এমন ছাত্র রাজনীতির কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এক নৈরাজ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। তারা (রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ) প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার্থীদের বিভক্ত করেছেন যেন ছাত্ররা রাজনৈতিক দলগুলো দ্বারা সংগঠিত যে কোন ধরনের অবিচার ও অনৈতিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সামর্থ্য ও সাহসিকতা হারিয়ে ফেলে। যার ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যদি রাজনৈতিক দলের গৃহীত কোন সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে, তাহলে তাদের আশির্বাদপুষ্ট ছাত্রনেতারা তাদেরই সহপাঠীদের উপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। এমনকি শারীরিকভাবে আহত করতেও সংকোচবোধ করে না। এভাবেই রাজনৈতিক দলগুলো খুব সফলভাবে শিক্ষার্থীদের একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে এবং তাদের নিজস্ব স্বার্থ হাসিলের জন্য ছাত্রদের ইচ্ছাশক্তির অপব্যবহার করছে।
প্রকৃতপক্ষে আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশ্যে খুবই পরিষ্কার তারা সাধারণ জনগণ ও শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক মতাদর্শভিত্তিক দংশনের মাধ্যমে বিভক্ত করেছেন যেন কেউ তাদের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে না পারে। এমনকি যদি ক্ষমতা অবৈধ বা অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করেও দখল করা হয়। আধুনিক রাজনীতি শাস্রের জনক হিসেবে ব্যাপকভাবে সমাদৃত লেখক ম্যাকিয়াভেলি তার বই ‘আর্ট অফ ওয়ার’-এ এই ধরনের কৌশল প্রয়োগ সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দিয়েছেন।
‘বিভাজন ও শাসন নীতি’ কিছু কৌশলের উপর ভিত্তি করে অগ্রসর হয়। এর অন্যতম একটি কৌশল হলো রাজনৈতিক নেতারা নাগরিকদের মধ্যে যে কোন ধরনের ঐক্য রোধের জন্য নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিবর্গকে অন্যদের থেকে বেশি সুবিধা প্রদান করবে। এই বিষয়টি সহজেই বোধগম্য কারণ এটা এখন ‘ওপেন-সিক্রেট’ যে আমলাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে পদোন্নতি দেয়া হয় এবং ক্ষমতাসীন দলের কার্যকলাপকে যারা অন্ধের হাতিদর্শনের মত করে সমর্থন করে তারাই সরকারের পক্ষ থেকে বেশি বেশি আশীর্বাদ পান।
সংক্ষেপে বলা যায় যে, রাজনীতিবিদরা তাদের খেলাটা ঠিকমতোই খেলছেন। যতক্ষণ না আমরা তাদের (রাজনীতিবিদ) কৌশল বুঝতে পারবো ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা বিভক্ত হয়ে থাকবো এবং যার ফলে জাতিগত ঐক্যের উপর ভিত্তি করে বড় কিছু অর্জন করা আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে। আমাদের অবশ্যই ভিন্ন ভিন্ন মতামত ও মতাদর্শের সাথে সাহাবস্থান করতে শিখতে হবে। মতাদর্শে পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু এই পার্থক্য আমাদের সঠিক বিচার বুদ্ধিকে যেন হারিয়ে না দিতে পারে।
আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে এমনকি সক্রেটিস ও প্লেটোর ধ্যান-ধারণা ও চিন্তার মধ্যে অনেক পার্থক্য ছিল। কিন্তু তারা কখনও একে অপরকে খাটো করার চেষ্টা করেনি এবং সমাজে বিভাজনকে অনুপ্রাণিত করেনি। নিজেদেরকে নেতাদের নিছক খেলনায় পরিণত করার পরিবর্তে আমাদের বরং পরবর্তী জেনারেশনের জন্য অনুকরণীয় পথ তৈরিতে মনোযোগী হওয়া উচিত।
লেখক : সাংবাদিক।
এইচআর/পিআর