আবরার হত্যাকাণ্ড : দয়া করে লাশের রাজনীতি নয়

মাসুদা ভাট্টি
মাসুদা ভাট্টি মাসুদা ভাট্টি , সাংবাদিক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১০:০৩ এএম, ১৫ অক্টোবর ২০১৯

এদেশে একেকটি হত্যাকাণ্ড ঘটে আর আমরা তা নিয়ে কিছুদিন আলোচনা করি, নতুন আরেকটি ইস্যু তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এই আলোচনা চলতে থাকে তারপর মানুষ নতুন কিছু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় পুরোনো ঘটনাটিও চাপা পড়ে যায় অসংখ্য ইস্যুর তলায়। এর মধ্যে অবশ্য কিছু রাজনৈতিক ঘটনা ঘটে, সরকারে থাকাকালে রাজনৈতিক দলের চরিত্র একরকম আর সরকারের বাইরে থাকাকালে আরেকরকম। ফলে যে কোনো ঘটনাকে যে যার মতো রাজনৈতিক রূপ দিয়ে তা থেকে ফায়দা লোটার চেষ্টা এদেশে প্রচলিত ও নৈমিত্তিক ঘটনা। বুয়েটের ছাত্র আবরার হত্যাকাণ্ড নিয়ে এই মুহূর্তে যে সব রাজনৈতিক ঘটনা ঘটছে তার বিশ্লেষণটা করা যাক একটু।

সরকার জনরোষের ভয়েই হোক কিংবা স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই হোক, এই হত্যাকাণ্ড ঘটার পর থেকে কঠোর অবস্থানেই রয়েছে বলে আপাতঃদৃষ্টিতে আমাদের মনে হয়। আবরার হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারী ছাত্রদের দাবি মেনে নেয়া থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা প্রশংসনীয়- যে কোনো ঘটনাতেই যদি সরকার এরকম তৎপরতা দেখাতে পারে তাহলে বাংলাদেশের ভবিষ্যতে জন্য তা হবে ইতিবাচক। কিন্তু আমরা অতীত অভিজ্ঞতা থেকেই জানি যে, বাংলাদেশে যে কোনো হত্যাকাণ্ডকে ‘রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে একবার প্রমাণ করা গেলে প্রতিটি পক্ষই তা থেকে ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। আবরার হত্যাকাণ্ডও তার ব্যতিক্রম নয়। সরকার যখন এই হত্যাকাণ্ডকে নিজেদের সহযোগী সংগঠনের হাতে ঘটা অপকর্ম হিসেবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা না করে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সকল নেতাকর্মীই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে দাবি মেনে নেয়া ও বিচারপ্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ রাখার চেষ্টা করছে তখন সরকার-বিরোধী রাজনীতি আবরার হত্যাকাণ্ডকে ভিন্ন রূপ ও মাত্রা দিতে শুরু করেছে।

দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে বিরোধী রাজনীতি অনুপস্থিত। এটা যতোটা না সরকারের ভিন্নমত দমনের চেষ্টা থেকে তার চেয়ে অনেক বেশি এদেশের বর্তমান আওয়ামী-বিরোধী রাজনীতির অস্বচ্ছতা, মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধিতা, গণমানুষের সঙ্গে সম্পর্কহীন ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি-চর্চা এবং সর্বোপরি আওয়ামী-লীগ ঠেকানোর একমুখী প্রচেষ্টার কারণে। এতোদিন ধরে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় টিকে থাকার মূল কারণ হলো আওয়ামী লীগ সরকারের দোষত্রুটি উল্লেখপূর্বক জনগণের সামনে বিকল্প কোনো সরকার-ব্যবস্থার স্বপ্ন তৈরি করতে না পারার ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতার জন্য আওয়ামী লীগ দায়ী নয়, এই ব্যর্থতা সম্পূর্ণ এদেশের আওয়ামী-বিরোধী রাজনীতির স্বার্থপরতা ও জনগণের সামনে নিজেদের রাজনীতি উন্মোচিত হয়ে যাওয়ার কারণেই। নাহলে কেবল সরকার মিটিং-মিছিল করতে দেয় না, সমাবেশ করতে দেয় না এসব অজুহাত দেখিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে না। জনগণকে নিজেদের রাজনীতি ও রাজনৈতিক প্রোগ্রামে মোটিভেট করাটাও রাজনীতির সবচেয়ে বড় কাজ বটে।

বলাই বাহুল্য এদেশে আওয়ামী-বিরোধী সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক জোট বিএনপি ও তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ঐক্যফ্রন্টসহ ২০-দলীয় জোট। তাদের কর্মকাণ্ড বিগত নির্বাচনের পর আরও ঝিমিয়ে পড়া এবং একেবারেই সীমিত। কিন্তু যখনই বুয়েটে আবরার হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়ংকর ও নিকৃষ্ট ঘটনাটি ঘটলো তারপর থেকেই আমরা হঠাৎ দেখতে পাচ্ছি এই রাজনৈতিক জোটটি তৎপর হয়ে উঠলো। তারা আবরার হত্যার বিচার চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছে বিএনপি নেতা বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি এবং সর্বশেষ ড. কামাল হোসেনের মতো ব্যক্তিত্বও আবরার হত্যার প্রতিবাদে শোক র‌্যালি করতে গিয়ে সরকারকে পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসলেন। এতে জনগণের কাছে কী বার্তা গেলো? এদেশের জনগণ এরকম মৃত্যু দেখে অভ্যস্ত এবং এরকম হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে চলে আসা রাজনীতি দেখেও অভ্যস্ত। তারা ধরেই নিয়েছে যে, আবরার হত্যাকাণ্ড কোনো ইস্যুই নয় এই রাজনৈতিক প্ল্যাটফরমটির জন্য, বরং এরা নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য আবরার- এর লাশকে পুঁজি করতে চাইছে। নিহত আবরারের বাবা তাই যথার্থই বলেছেন যে, তার মৃত ছেলেকে নিয়ে কেউ যেনো রাজনীতি না করেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা?

আমরা জানি যে, এদেশে লাশের রাজনীতির একটি গুরুত্ব রয়েছে। আর সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লাশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ছাত্রের লাশ এদেশের নোংরা রাজনীতির সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে প্রমাণিত। স্মরণ করা যেতে পারে যে, এদেশের একজন বিখ্যাত রাজনীতিবিদ টেলিফোনে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটি লাশ ফেলে তা দিয়ে সরকার পতনের কথা বলেছিলেন। এক্ষেত্রে তাই আবরার হত্যাকাণ্ড দিয়ে নিঃসন্দেহে ‘সরকার ফেলে’ দেওয়ার স্বপ্ন দেখতে কারোরই দেরি হয়নি। সরকার-বিরোধী রাজনৈতিক জোটটি এখন তাই আবার মাঠে নামার চেষ্টা করছে আবরার হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে। সরকারও প্রথম দিকে যতোটা এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ‘সিরিয়াস’ ও দৃঢ়তা দেখিয়েছে এখন যতোই হত্যাকাণ্ডটিকে রাজনৈতিক চেহারা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে সরকারও ততোটা শক্ত অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করছে। দু’টি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করার চেষ্টা করছি।

এক. গতকাল ঐক্যফ্রন্টের শোকর‌্যালি শুরুর আগে প্রেসক্লাবে আয়োজিত সভায় ড. কামাল হোসেন যদি আবরার হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে চরম রাজনৈতিক ভাষায় সরকারের সমালোচনা না করে ও ‘সম্মান নিয়ে পদত্যাগ করার’ দাবি না জানাতেন, কেবলমাত্র আবরার হত্যার বিচার চেয়ে ছাত্রদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম থাকতেন তাহলে হয়তো সরকারের পক্ষ থেকেও তাদের শোকর‌্যালিতে বাধা আসতো না। কিন্তু সরকার এখন যুক্তি দেবে এটা কোনো শোকর‌্যালি ছিল না, ছিল সরকার পতনের রাজনৈতিক মিছিল। যদিও সে জন্যই সরকার এই মিছিলে বাধা দিতে পারবে তাও কাম্য নয়, কিন্তু এদেশের রাজনীতিতে এরকম মিছিলে বাধা প্রদানতো প্রচলিত ‘প্র্যাকটিস’।

দুই. আবরার হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ এবং জাতিসংঘ কঠোর বিবৃতি দিয়েছে। তারা সরকারের সমালোচনা করে ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’র জন্য আবরারকে হত্যা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েই বিবৃতি দিয়েছেন বলে আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হতে পারে। প্রশ্ন হলো, এই যে হত্যাকাণ্ডের মোটিফ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে বিচার প্রক্রিয়ায় জটিলতার সৃষ্টি করবে। কারণ বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে ভিন্নমত প্রকাশের কারণে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সেগুলো সম্পর্কে এরকম কোনো বিবৃতি আমরা দেখিনি। যথারীতি সরকার এই প্রশ্ন তুলেই জাতিসংঘের প্রতিনিধিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে তলব করে তার বিবৃতির ব্যাখ্যা দাবি করেছে এবং তাকে একথাটিই বলেছে যে, যুক্তরাজ্য কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় প্রতিদিনই একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে যা মূলতঃ বর্ণবাদ, ঘৃণাবাদ, শ্রেষ্ঠত্ববাদ কিংবা ধর্মবাদী সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার কারণে। এসব বিষয়ে জাতিসংঘকে কখনও কোনো বিবৃতি প্রদান করতে দেখা যায় না, তাহলে বাংলাদেশে কেন এরকমটি হলো? বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও ক্ষমতাহীন বলে? নাকি এখনও পশ্চিম মনে করে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের হস্তক্ষেপের অবাধ অধিকার রয়েছে?

ওপরের এই দুই উদাহরণ থেকে আমরা সরকারের দৃঢ়তার পরিচয় সামান্য হলেও পেলাম, আশা করবো আবরার হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও দ্রুততার সঙ্গে নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও সরকার এই দৃঢ়তার পরিচয় দেবে। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ‘সরকার পতনের রাজনীতি’ যদি আরও জোরেশোরে শুরু হয় সেক্ষেত্রে সরকার কতোটা দৃঢ় থাকবে সে প্রশ্ন এখনই তুলে রাখা গেলো। আমি একথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, আবরার হত্যাকাণ্ড একটি ভয়াবহ ও নিষ্ঠুরতম ঘটনা, যা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থাকে, রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে এবং শিক্ষায়তনগুলোর অচলাবস্থাকে শোধরানোর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু যে মুহূর্তে এই হত্যাকাণ্ডকে ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের পথ উন্মুক্ত করা হবে সেই মুহূর্তে এই হত্যাকাণ্ড থেকে বৃহৎ অর্জনের পথটি রুদ্ধ করে দেওয়া হবে। বার বার আমরা দেখেছি যে, আমরা বৃহৎ অর্জনের চেয়ে ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে বেশি পারদর্শি, এক্ষেত্রেও পরিস্থিতি সেদিকে নেয়া হচ্ছে বলেই লক্ষ্যমান। দেশের সাধারণ জনগোষ্ঠী এই হত্যাকাণ্ডে হতবাক, ভীত ও ক্ষুব্ধ। এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার না হলে জনগণ তার জবাব সরকারকে দেবে, এটাও নিশ্চিত। কিন্তু সে জন্য সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নিজস্ব রাজনীতির সঙ্গে আবরার হত্যাকাণ্ডকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই- এটাও জনগণ নিশ্চিত করেই জানে।

ঢাকা ১৪ অক্টোবর, সোমবার ২০১৯
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

masuda.bhatti@gmail.com

এইচআর/এমএস

‘আমরা জানি যে, এদেশে লাশের রাজনীতির একটি গুরুত্ব রয়েছে। আর সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লাশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ছাত্রের লাশ এদেশের নোংরা রাজনীতির সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে প্রমাণিত। স্মরণ করা যেতে পারে যে, এদেশের একজন বিখ্যাত রাজনীতিবিদ টেলিফোনে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটি লাশ ফেলে তা দিয়ে সরকার পতনের কথা বলেছিলেন। এক্ষেত্রে তাই আবরার হত্যাকাণ্ড দিয়ে নিঃসন্দেহে ‘সরকার ফেলে’ দেওয়ার স্বপ্ন দেখতে কারোরই দেরি হয়নি। সরকার-বিরোধী রাজনৈতিক জোটটি এখন তাই আবার মাঠে নামার চেষ্টা করছে আবরার হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে।’