নুসরাত হত্যায় ফাঁসি খুনির দম্ভ চূর্ণ হোক

নাসরীন গীতি
নাসরীন গীতি নাসরীন গীতি , সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৯:৩৭ এএম, ২৭ অক্টোবর ২০১৯

দ্রুত সময়ের মধ্যে একটা চাঞ্চল্যকর মামলার রায় হলো, অনেক বছর পর জাতি একটি হত্যা মামলার দ্রুত বিচারকার্য দেখতে পেল। বোধ করি, ঘটনার সাথে জড়িতরা ছাড়া, পুরো দেশের মানুষই কাঙ্খিত রায়টি পেয়ে খুশি হয়েছে। বলছিলাম, ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা মামলার রায় প্রসঙ্গে। যেখানে প্রধান আসামী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদদৌলাসহ ১৬ আসামীর সবাইকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।

নুসরাতের পরিবার সন্তুষ্টি প্রকাশ করে রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন। এ দাবিটাও দেশবাসীর প্রায় প্রত্যেকেরই। কারণ মাত্র সাড়ে ছয়মাস আগের ঘটনা, কিভাবে পুড়িয়ে মারা হয়েছে একটি তারুণ্যশক্তিকে, দেশবাসীর চোখে এখনও ভাসছে নুসরাতের সেই ব্যান্ডেজ বাঁধা শরীরটি। পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টার হৃদয়বিদারক সেই বর্ণনা, হাসপাতালে দগ্ধ শরীরের কাতরানো আর মা-ভাইদের আর্তনাদ- কোনটাই কি সহজে ভোলার কথা! তাই মনুষ্য হৃদয়ের বেদন কিছুটা লাঘব হয়েছে এই রায়ে। এখন প্রশ্ন, কবে তা কার্যকর হবে?

বেশি দিন আগে নয়, সবারই স্মরণে আছে চলতি বছরের এপ্রিল মাস। ঘটনার দিন ছিল ৬ এপ্রিল। সেদিনই সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষের রোষানলের আগুনে দগ্ধ হয়ে চারদিনের মাথায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন নুসরাত জাহান রাফি। তবে ঘটনার সূত্রপাত আরো কিছু দিন আগের। আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন নুসরাত। তার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় করা নুসরাতের মা শিরিন আক্তারের মামলার ভিত্তিতে, অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অশান্তি থামে না। মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবারকে হুমকি দেয়া হয়। ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসা কেন্দ্রে গেলে কৌশলে পাশের ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় অধ্যক্ষের অনুগত পপি, মনিসহ বেশ কয়েকজন।

স্থানীয় হাসপাতাল ঘুরে নুসরাতের ঠাঁই হয় ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে। একদিকে, চিকিৎসার ব্যতিব্যস্ততা, অন্যদিকে আইনী লড়াই। ৮ এপ্রিল, আগুন ধরিয়ে দিয়ে হত্যার চেষ্টা মামলা করেন নুসরাতের বড় ভাই। ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টার দিকে বার্ন ইউনিটেই পৃথিবীর নিষ্ঠুরতার যন্ত্রণা দূরে ঠেলে পরপারে পাড়ি জমান নুসরাত। মামলাটি তখন হত্যা মামলায় রূপান্তর হয়। রায়ের পরপরই আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, এখন নুসরাত কি ভাবছে, দেখতে ইচ্ছে করছে ওর মুখচ্ছবিটা।

এত দ্রুত রায়টি পেয়ে প্রথমে অবচেতনভাবেই অন্তর থেকে ধন্যবাদ চলে এসেছে পিবিআইয়ের জন্য। তাদের তৎপরতায়ই মাত্র সাড়ে ছয়মাসে এরকম একটি কাঙ্ঘিত বিচার দেখতে পেল জাতি। আদালতে মোট ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র জমা দেয় পিবিআই। মামলার প্রধান আসামি অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ ১৬ আসামির সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে আদালতে আবেদন জানায় বাদি ও রাষ্ট্রপক্ষ। আসামিপক্ষও থেমে থাকে না। নির্লজ্জ হাসি হেসে খালাসের আবেদন করেন। এ মামলায় মোট ৯২ জনের মধ্যে ৮৭ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষে গত ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তিতর্ক শুরু হয়।

যুক্তিখণ্ডন শেষে আদালত ২৪ অক্টোবর রায়ের দিন ঠিক করে দেন। আমার মাথায় আসে না, জেনে-শুনে এই ধরনের মামলায় কেন আইনজীবীরা আসামীর পক্ষ নেন। আসামির আইনজীবীরা এই হত্যাকাণ্ডকে আত্মহত্যা বলেও দাবি করেছিলেন। তাদের মনে কি একবারও প্রশ্ন জাগে না, এরকম নরহত্যার ঘটনায় কেন তারা আসামীর পক্ষাবলম্বন করেন? ঘটনা প্রবাহের বিস্তারিত জানার পর একজন বিবেকবান মানুষ হিসেবে তাদের মনে কেন প্রশ্ন জাগে না যে, শুধু আর্থিক লাভবান হতে গিয়ে কেন তারা ঘাতকের সাফাই গান?? তারা নাকি আবার রায়ের বিরোধিতা করে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন! আশ্চর্য লাগে, পেশার খাতিরে কি মানবিকতা এভাবেই ভূলুণ্ঠিত হয়!!

যাক্, শান্তির বিষয় এই যে, খুব স্বল্প সময়ে এরকম নারকীয় একটা হত্যাকাণ্ডের বিচার পেল স্বজনরা, দেশবাসী দেখলো, এখনও সবাই সোচ্চার হলে ন্যায়বিচার পাওয়া যায়। নুসরাতকে পোড়ানো, ওসির মামলা না নিয়ে উল্টো তার বয়ান ভাইরাল করা এবং নুসরাতের মৃত্যু- সবমিলিয়ে জনক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠে দেশ। চাঞ্চল্যকর নুসরাত হত্যা মামলার দ্রুত রায় ঘোষণা ও কার্যকরের দাবি উঠেছিলো দেশজুড়ে। তারই বাস্তবায়ন ঘটলো এই ২৪ অক্টোবর, সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে প্রধান আসামী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদদৌলাসহ ১৬ জনকে আদালতে হাজির করা হয়।১১ টা ১২ মিনিটে আসে জনমানুষের সেই কাঙ্খিত রায়, ১৬ আসামীর মৃত্যুদণ্ডের ঘোষণা। প্রত্যেক আসামীকে মৃত্যুদণ্ড ছাড়াও এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ডও দেয়া হয়েছে। বর্বর যেকোন ঘটনার জন্য এরকম রায়ই দেখতে চায় দেশবাসী। বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠছিলো, তা দূর করার মাইল ফলক হিসেবে এই নুসরাত হত্যা মামলার রায় কাজ করবে নিশ্চয়ই।

তবে আনন্দের পাশাপাশি বিস্মিত হয়েছি পুলিশ সদস্য মোয়াজ্জেম-এর ব্যাপারে দেয়া আদেশ দেখে। অনেকেই দেখেছি অস্থিরতাও প্রকাশ করেছেন, মোয়াজ্জেমকে কেন হালকা করে দেখা হলো। যদিও এটা বিচারিক নিয়মেই হয়েছে। নুসরাত হত্যা মামলায় তৎকালীন ওসির গাফিলতির চিত্র আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসলেও, ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের কর্মকাণ্ড আর না ঘটে, সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করেছে আদালত। তবে আদালত সুপারিশ করেছে, ফেনীর তৎকালীন পুলিশ সুপার এসএম জাহাঙ্গীর আলম সরকার ও সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনসহ চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার।

যাক আমরা তুষ্ট এইজন্য যে, নুসরাত হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে। এখন অপেক্ষা, তা কত দ্রুত কার্যকর হয়। তবে আমি আর অপেক্ষা করতে চাই না। এবার প্রতীক্ষায় আছি, দেরিতে হলেও যেন সাগর-রুনি, তমা, তনু, পারুল হত্যা মামলার বিচার হয়। কারণ বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের যে একটা প্রচ্ছন্ন অনাস্থা তৈরি হয়েছিল নুসরাত হত্যা মামলার বিচারকার্য ও রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে তা অনেকটাই দূর হয়েছে। তাই বাকি হত্যা মামলাগুলোরও সুষ্ঠু বিচার অচিরেই দেখতে পাবে দেশবাসী, প্রত্যাশায় আছি সেই সুদিনের...

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, বাংলাভিশন।

এইচআর/পিআর

আমরা তুষ্ট এইজন্য যে, নুসরাত হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে। এখন অপেক্ষা, তা কত দ্রুত কার্যকর হয়। তবে আমি আর অপেক্ষা করতে চাই না। এবার প্রতীক্ষায় আছি, দেরিতে হলেও যেন সাগর-রুনি, তমা, তনু, পারুল হত্যা মামলার বিচার হয়। কারণ বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের যে একটা প্রচ্ছন্ন অনাস্থা তৈরি হয়েছিল নুসরাত হত্যা মামলার বিচারকার্য ও রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে তা অনেকটাই দূর হয়েছে