ধর্ষণের আড়ালে

তামান্না ইসলাম
তামান্না ইসলাম তামান্না ইসলাম , প্রবাসী লেখিকা
প্রকাশিত: ০১:২৪ পিএম, ২২ জানুয়ারি ২০২০

কোন বিষয়েই আগে থেকে কোন বদ্ধমূল ধারণা থাকা আসলে ভালো নয়। সেটা যে বিষয়ই হোক না কেন। জীবনে বহুবার এই শিক্ষাটা আমি পেয়েছি। কিছু কিছু বিষয় থাকে শুনলে আপাত দৃষ্টিতে আমরা চট করে একটা সিদ্ধান্তে চলে যাই। আমাদের মনে অজান্তেই এগুলো সম্পর্কে কিছু ধারণা বা মতামত আগে থেকেই গেঁথে থাকে, সেখান থেকেই এই সিদ্ধান্ত গুলো আমরা নিয়ে ফেলি। খোলা মনে ঘটনার সবগুলো দিক আমরা দেখতে পাই না, যুক্তিগুলো ঘোলা করে দেয় সেই আগের বদ্ধমূল ধারণা। সম্প্রতি এমনি একটি ঘটনা ঘটেছে আমার সাথে।

দেশে ধর্ষণের এবং চাইল্ড অ্যাবিউজের খবর আজকাল মনে হয় রোজ শুনি, শুনতে শুনতে কান ভোঁতা হয়ে গেছে যেন। মনে হয়, আরও একটা। আর সেই সাথে গ্রাস করেছে এক ধরনের হতাশা আর স্থবিরতা। মনে হয় এগুলো নিয়ে কথা বলে, লিখে কী হবে? তাই আজকাল খালি চুপ করে দেখে যাই।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছাত্রীটি ধর্ষিত হয়েছে, সেই ঘটনাটি নিয়েও যথারীতি হৈ চৈ চলছে এবং আমি দেখে যাচ্ছি। এবং ভীষণ বিরক্ত হচ্ছি। আমার বদ্ধমূল ধারণা যে কোন ধর্ষণের ঘটনা শুনলেই মনে মনে বলে, যখনই কোন ধর্ষণের অভিযোগ আসে, সেটা সত্যি। কোন মেয়ে কেন নিজের এতো বড় অসম্মানের কথা রটাবে মিথ্যা করে? কেন এতো মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে যাবে? কেন পরিবারকে এতো হেনস্থার মধ্যে ফেলবে? সুতরাং ধর্ষণের অভিযোগ আসা মানেই সেটা সত্য এবং আসামীকে শাস্তি দেওয়া দরকার। এটাই ছিল আমার ধারণা, তাই কেউ এ ব্যাপারে কোন ধরনের প্রশ্ন তুললেই আমি বিরক্ত হই বরাবর।

এর মধ্যেই দেখলাম একটা হিন্দি সিনেমা , নাম 'Section 375 ' । সচরাচর হিন্দি সিনেমা আমি দেখি না। তবে কিছু কিছু সিনেমা আমার মনে দারুণ প্রভাব ফেলেছে। এটিও ঠিক সেরকম একটা সিনেমা। কিছু সিনেমা দেখে, কিছু লেখা পড়ে আমার মনের অনেক বদ্ধ দুয়ার খুলে গেছে, আমার চিন্তা ভাবনার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এই সিনেমাটির মূল ঘটনা একটি মেয়ের ধর্ষণকে কেন্দ্র করে। সমাজের উঁচু স্তরের একজন সুপ্রতিষ্ঠিত, ক্ষমতাবান, বিখ্যাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনেছে তারই এক অধীনস্থ কর্মচারী, দরিদ্র, অল্প বয়সী, সুবিধা বঞ্চিত এক মেয়ে।

প্রথম থেকেই মনে হচ্ছিল এই মেয়েটি ভারী নরম, নির্যাতিত। মেয়েটির সৎসাহস দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। স্বল্প শিক্ষিত, দরিদ্র পরিবারের মেয়ে হয়ে এতো বড় ঝুঁকি সে নিয়েছে। যেখানে আমরা শুনি লোক লজ্জার ভয়ে ধর্ষণের একটা বিরাট অংশ রিপোর্ট হয় না, চাপা থাকে লোক চক্ষুর অন্তরালে, সেখানে এই অবিবাহিত, অল্পবয়সী মেয়েটি নিজের ভবিষ্যৎ জীবনের তোয়াক্কা না করে, পরিবারের বা সমাজের ভয়ে মুখ বুজে থাকেনি। ক্ষমতাকেও সে ভয় পায়নি। আমার মনে কষ্ট হচ্ছিল একথা ভেবে যে এই ক্ষমতাবান অত্যাচারী পুরুষ এখন ক্ষমতা এবং টাকার অপব্যাবহার করে ঠিকই আইনকে ফাঁকি দেবে এবং মেয়েটি সুবিচার পাবে না।

আমি অনেক চিন্তা করেও ভাবতে পারছিলাম না যে এই মেয়েটি কোন কারণে মিথ্যা বলতে পারে। লোকটি ধর্ষণ না করলেও তাকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানো হতে পারে। মেয়েটির এতে কী লাভ? উপরন্ত মেয়েটিকে বার বার এই সব অস্বস্তিকর প্রশ্ন করে ভীষণ মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, যেটা আমার কাছে ভীষণ নিন্দনীয় ছিল বরাবর। ঘটনা পরিক্রমায় দেখা যায় মেয়েটি লোকটির প্রেমে পড়েছিল, লোকটিও সেটার সুযোগ নিয়েছে, উপরন্ত নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে মেয়েটিকে প্রলোভিত করেছে। তাদের নিজেদের ইচ্ছায় শারীরিক সম্পর্কও হয়েছে।

প্রেম চলাকালীন এক পর্যায়ে মেয়েটি পজেজিভ হয়ে ওঠে এবং ভুল করে ভাবতে থাকে লোকটি তাকে বিয়ে করবে, যদিও সে তাকে এমন কোন আশার বাণী কখনো শোনায়নি। এই সব দ্বন্দ্ব থেকেই লোকটি তাকে ত্যাগ করে। মেয়েটি প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ধর্ষণের ঘটনাটা সাজায় যদিও তাদের শারীরিক সম্পর্কে কোন জোরাজুরি ছিল না। অনেকেই হয়তো বলবেন সিনেমা তো সিনেমাই। কিন্তু কিছু সিনেমাকে শুধু সিনেমা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ঘটনার গাঁথুনি থেকে বোঝা যায় যে এগুলো কতটা বাস্তব ভিত্তিক।

আমার মনে পড়ে গেল পরিচিত এক সরকারি কর্মকর্তা, যে বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে কাজ করেছেন অনেক বছর একবার বলেছিল, ধর্ষণের কেসগুলো নিয়ে খুব সমস্যা। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পারিবারিক শত্রুতার জের ধরে বা বিভিন্ন কারণে প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা এগুলো থেকে মেয়ে বা তার পরিবার মিথ্যা করে ধর্ষণের মামলা করে। শারীরিক সব প্রমাণ থাকলেও এটা কী উভয়ের অনুমতি সাপেক্ষে ঘটেছে নাকি জোরপূর্বক সেটা প্রমাণ করা খুব কঠিন। কেই বা এই জিনিসের রেকর্ড রাখে যদি না সাজান ঘটনা হয় বা নিজেদের সম্পর্কে সন্দেহ থাকে? আরও একটি ব্যাপার হল, প্রেমের সম্পর্কেও এই ঘটনা ঘটতে পারে, এ ক্ষেত্রে দোষী বললে ছেলে, মেয়ে উভয়েই দোষী অথবা কেউই দোষী না। ঘটা করে মৌখিক সম্মতি নেয় কয়জন?

এই সব কিছু বিবেচনা করে, ধর্ষণের অভিযোগ আসলে, শুরুতেই কোন সিদ্ধান্তে আসা উচিত না। আবার শুরুতেই কিছু উড়িয়ে দেওয়াও উচিত না। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েটির ক্ষেত্রে যাকে ধর্ষক সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়েছে, তার চেহারা দেখেই অনেক সন্দেহ করছে যে এই লোক ধর্ষণ করতে পারে কিনা। এই সন্দেহ খুব হাস্যকর। সবচেয়ে বড় কথা আইনকে আইনের কাজ করতে দেওয়া দরকার কোন রকম ভুল ধারণা বা সন্দেহ দিয়ে প্রভাবিত না করে।

আমাদের সমাজের সব চেয়ে বড় সমস্যা হল ধর্ষিতাকে খারাপ চোখে বা নিচু চোখে দেখা। এই মনোভাবটাকে পরিবর্তন করতে পারলে অনেক সমস্যারই সমাধান হত। তাহলে যারা আসলেই নির্যাতিত তারা মুখ বুজে থাকত না। তদন্তের স্বার্থে যেসব প্রশ্ন হয়, সেগুলোর উত্তর দিতে গিয়েও মানসিক চাপের ভার অনেকটা কমতো, ভাবতো না লোকে কী ভাববে। প্রকৃত দোষী সাব্যস্ত করতে হলে, বিব্রতকর হলেও যথাযথ তদন্ত হওয়া দরকার।

মিথ্যা ধর্ষণের সাজানো অভিযোগ যত আসবে, ধর্ষণের তদন্ত তত বেশি দীর্ঘায়িত হবে, জটিল হবে। কে জানে, হয়তো প্রকৃত অপরাধীও অনেক সময় ' Benefit of doubt ' থেকে ছাড়া পেয়ে যাবে। আমরা কোন অবস্থাতেই চাই না কোন ধর্ষক শাস্তি না পাক, আবার কেউ বিনা দোষে শাস্তি পাক এটাও চাই না। যেহেতু আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ার পাওয়ার অনেক বেশি, তাই আন্দাজে বা পূর্বের ধারণা থেকে এসব বিষয়ে কোন শক্ত মতামত না দেওয়ায়ই ভালো।

এইচআর/জেআইএম

প্রেম চলাকালীন এক পর্যায়ে মেয়েটি পজেজিভ হয়ে ওঠে এবং ভুল করে ভাবতে থাকে লোকটি তাকে বিয়ে করবে, যদিও সে তাকে এমন কোন আশার বাণী কখনো শোনায়নি। এই সব দ্বন্দ্ব থেকেই লোকটি তাকে ত্যাগ করে। মেয়েটি প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ধর্ষণের ঘটনাটা সাজায় যদিও তাদের শারীরিক সম্পর্কে কোন জোরাজুরি ছিল না।