পুলিশকে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’ বলা কতটা যৌক্তিক?

মো. ইমরান আহম্মেদ
মো. ইমরান আহম্মেদ মো. ইমরান আহম্মেদ , সহকারী পুলিশ সুপার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস)
প্রকাশিত: ০৭:৩০ পিএম, ০৭ এপ্রিল ২০২০

পুলিশের নাম ‘বাংলাদেশ পুলিশ’। এটাই অফিসিয়াল নাম। এর বাইরে পুলিশের অন্য কোনো নাম নেই। কিন্তু অনেকেই পুলিশকে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’ হিসেবে অভিহিত করছেন। এটা ঠিক নয়। অযৌক্তিকও বটে। কারণ, পুলিশ অনেক ধরনের কাজ করে। একটি হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। এ জন্য পুলিশের পরিবর্তে কিংবা পুলিশকে বুঝাতে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’ টার্মটি ব্যবহার করা ঠিক নয়। পুলিশ তো মামলার তদন্ত করে। এ জন্য তো কেউ পুলিশকে ‘তদন্তকারী বাহিনী’ বলেন না। আবার পুলিশ সারাদেশের গোয়েন্দা তথ্যও সংগ্রহ করে। এ জন্যও পুলিশকে কেউ তো ‘গোয়ান্দা বাহিনী’ হিসেবে অভিহিত করেন না। পুলিশের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো, মানুষের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখা। এসব কাজের জন্যও পুলিশকে কেউ ‘জীবন ও সম্পত্তি রক্ষাকারী বাহিনী’ কিংবা ‘অভ্যন্তরীণ শান্তিরক্ষী বাহিনী’ বলেন না। তাহলে একটি কাজের ওপর ভিত্তি করে পুলিশকে কেন ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’ বলবেন? এটা কতটা যৌক্তিক?

পুলিশকে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’ হিসেবে অভিহিত করে আপনি অজান্তেই বাংলাদেশ পুলিশের অবদানকে খাটো করছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকাকে অস্বীকার করেন। এটা অনেকের কাছে পুলিশকে দমিয়ে রাখার কৌশলও বটে। পুলিশ শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজই করে না বরং এর বাইরে আরও অনেক কাজ করে। সেটি নিশ্চয়ই এই করোনা সংকটকালে অনুধাবন করেছেন। প্রত্যক্ষও করেছেন। আশা করি, বুঝতেও পেরেছেন। তাই সকলের প্রতি জোর অনুরোধ, পুলিশকে ‘বাংলাদেশ পুলিশ’ নামেই ডাকুন। সকল কাগজপত্রে এই নাম, পুলিশের পোশাকেও এই নাম। এর বাইরে অন্য কোনো নাম নেই।

এখন আপনি হয়তো বলতে পারেন, যখন অনেকগুলো সংস্থা বা বাহিনী মিলে একটা কাজ করে, তখন ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’ বললে সবাইকে কভার করা যায়। এক্ষেত্রে আপনাকে বলব, এই নিয়ম কিন্তু সবক্ষেত্রে আপনি নিজেই মানেন না। ধরুন, কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান মিলে ত্রাণ বিতরণের কাজ করছে। আপনি কিন্তু একসাথে ‘ত্রাণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে বলছেন না। এক্ষেত্রে বিতরণকারী সব প্রতিষ্ঠানের নাম ভিন্ন ভিন্নভাবে বলছেন। তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি এলে কেন একটি টার্ম দিয়ে বলতে হবে?

খেয়াল করলে দেখবেন, একটি কাজ পুলিশেরই কয়েকটি ইউনিট মিলে করছে। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অন্য কোনো সংস্থা বা বাহিনী যুক্ত নয়। তবুও সেখানে পুলিশের ইউনিটগুলোর নামের পরিবর্তে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’ টার্মটি ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু এখানে শুধু ‘বাংলাদেশ পুলিশ’ বললেই সবাইকে কভার করে। তবুও তা বলা হচ্ছে না। এটি নিঃসন্দেহে উদ্দেশ্যমূলক। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশের উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে অস্বীকার করার প্রয়াস।

একটা মজার বিষয় দেখবেন, পুলিশ যদি ভালো কিছু করে, তাহলে অনেক প্রতিষ্ঠান কিংবা মিডিয়া বিষয়টিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাফল্য হিসেবে অভিহিত করে। আর নেতিবাচক কিংবা কাউকে দোষ দেয়ার মতো বিষয় হয়, সেক্ষেত্রে ওই প্রতিষ্ঠান কিংবা মিডিয়া ‘পুলিশ করেছে’ বা ‘পুলিশ দায়ী’- এটা ঘটা করে প্রচার করে। সহজ কথায় বলতে গেলে, দোষ দেয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ নামটা আগে চলে আসে। ক্রেডিট দিতে হলে তা ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’ শব্দের মধ্যে হারিয়ে যায়। এ জন্য পত্রিকায় ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লাঠিচার্জ’ শব্দগুলো খুঁজে পাওয়া দায়, কিন্তু ‘পুলিশের লাঠিচার্জ’ শব্দযুগল শত শত বার পাওয়া যায়। বিশ্বাস না হলে এখনই গুগলে সার্চ করে করে মিলিয়ে নিন।

‘বাংলাদেশ পুলিশ’ নামটি হয়তো আপনার পছন্দ নাও হতে পারে। আপনার কাছে শ্রুতিমধুর নাও লাগতে পারে। অনেক অভিজাত শ্রেণির মনে না-ও হতে পারে। সত্যি বলছি, তাতে কিচ্ছু করার নাই। পুলিশের নাম ‘বাংলাদেশ পুলিশ’। যদি পুলিশকে ডাকতে হয় তো ‘বাংলাদেশ পুলিশ’ নামেই ডাকুন। যদি ছোট করে ডাকতে চান তো ‘পুলিশ’ বলে ডাকুন। কিন্তু যে নাম পুলিশের না, যে নামের কোনো ভিত্তি নাই, সেই নামে বাংলাদেশ পুলিশকে ডাকবেন না। প্লিজ!

লেখক : সহকারী পুলিশ সুপার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস), বাংলাদেশ পুলিশ, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা।

এইচআর/বিএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]