ভোটের অদৃশ্য ব্যাকরণ: ২০২৬-এর নির্বাচন এবং জনমানস

ড. মতিউর রহমান
ড. মতিউর রহমান ড. মতিউর রহমান , গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।
প্রকাশিত: ০৯:৩১ এএম, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে অভ্যস্ত তৎপরতা শুরু হয়েছে, তার সিংহভাগই আবর্তিত হচ্ছে চিরাচরিত দলীয় সমীকরণ, জোটের ভাঙা-গড়া কিংবা বড় বড় জনসভার হুঙ্কারের ওপর। কিন্তু এই দৃশ্যমান রাজনৈতিক স্রোতের নিচে এমন এক শক্তিশালী ও নির্ধারক ‘অদৃশ্য শক্তি’ কাজ করছে, যা প্রথাগত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধরাবাঁধা ছকের সম্পূর্ণ বাইরে। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘পাবলিক পালস’ বা জনমানসের নাড়ির স্পন্দন বলা হলেও, বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি কেবল একটি বিমূর্ত ধারণা নয়, বরং এক অমোঘ এবং প্রমাণভিত্তিক বাস্তবতা।

এই অদৃশ্য শক্তি নাগরিকের সেই প্রগতিশীল সামাজিক সচেতনতা, জীবনমুখী চাহিদা এবং আচরণ দ্বারা নির্মিত, যা এখন আর পুরনো দিনের রাজনৈতিক আনুগত্যের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকতে রাজি নয়। ২০২৬ সালের নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি পরিবর্তিত হতে যাওয়া এক নতুন বাংলাদেশের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের চূড়ান্ত পরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বাংলাদেশের এই নতুন রাজনৈতিক গতিশীলতার মূলে রয়েছে আমাদের জনমিতিগত বা ডেমোগ্রাফিক কাঠামোর এক আমূল এবং বৈপ্লবিক পরিবর্তন। বর্তমান ভোটার তালিকার দিকে তাকালে দেখা যায়, একটি বিশাল অংশ এখন তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা জন্মগতভাবেই ডিজিটালি অতি-সচেতন এবং তথ্যপ্রযুক্তির অবারিত জগতে বিচরণ করতে অভ্যস্ত। এই প্রজন্মের ভোটাররা তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের মতো রাজনৈতিক দলের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কিংবা পারিবারিক ভাবাবেগের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে নারাজ। তাদের বড় হওয়া এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বায়নের প্রভাবে গোটা পৃথিবী তাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। তারা কেবল স্থানীয় রাজনীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তারা বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানবাধিকারের আধুনিক সংজ্ঞার সঙ্গে প্রতিনিয়ত নিজেদের মেলাচ্ছে। এই তরুণ ভোটারদের কাছে রাজনীতি মানে কেবল মিছিল বা স্লোগান নয়, বরং এটি হলো স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি প্রধান মাধ্যম।

জনগণের এই পালস এখন আর কেবল পেছনের সারির গুঞ্জন বা কানাঘুষা নয়; এটিই আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল সুর এবং ছন্দ। যারা এই সুরটি নিখুঁতভাবে শুনতে পাবে এবং সেই অনুযায়ী জনগণের সঙ্গে একটি অংশগ্রহণমূলক সংলাপে লিপ্ত হবে, তারাই আগামী রাজনৈতিক অধ্যায়ের প্রকৃত রূপকার হিসেবে স্বীকৃত হবে। ভোটাররা এখন অনেক বেশি সচেতন, প্রযুক্তিগতভাবে ক্ষমতাশালী এবং একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত।

তারা যখন ২০২৬ সালে ব্যালট পেপার হাতে নেবে, তখন তাদের মনের ওপর কোনো পুরনো রাজনৈতিক বংশমর্যাদা ছায়া ফেলবে না। বরং তারা খুঁজে ফিরবে এমন এক যোগ্য নেতৃত্বকে, যে তাদের ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল স্বাধীনতার পূর্ণ নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম হবে। বর্তমানের তরুণরা অনেক বেশি ফলাফলমুখী; তারা দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বিতর্কের চেয়ে তাৎক্ষণিক উন্নয়ন এবং সুশাসনের বাস্তব প্রমাণ দেখতে চায়।

ফলে যেসব রাজনৈতিক শক্তি কেবল ঐতিহাসিক পুঁজি বা প্রথাগত প্রচারণার ওপর নির্ভর করছে, তারা এই নবীন প্রজন্মের কাছে দ্রুতই তাদের আকর্ষণ এবং প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলতে পারে। এটি এক ধরণের ‘সাইলেন্ট রেভোলিউশন’ বা নীরব বিপ্লব, যা ভোটের বাক্সে বড় ধরণের বিস্ময় উপহার দিতে পারে। যারা তরুণদের এই পালস বুঝতে ব্যর্থ হবে, তাদের জন্য ২০২৬-এর নির্বাচনী ময়দান অত্যন্ত পিচ্ছিল হয়ে উঠবে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের কোনো নির্বাচনই পূর্ণাঙ্গভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়, তবে ২০২৬ সালে এই অর্থনৈতিক উদ্বেগ এক ভিন্ন মাত্রায় হাজির হয়েছে। গত কয়েক বছরের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং স্থানীয় বাজারের অস্থিতিশীলতা নাগরিকদের জীবনযাত্রার মানে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্বের উচ্চ হার এবং মধ্যবিত্তের ক্ষয়িঞ্চু জীবনমান এখন রাজনৈতিক আলোচনার প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ভোটাররা এখন মেগা প্রজেক্টের জৌলুসের চেয়েও তাদের পকেটের টানাপোড়েনকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। জীবিকার ব্যয় বৃদ্ধি যখন প্রতিদিনের দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়, তখন সাধারণ ভোটারদের কাছে বড় বড় রাজনৈতিক তত্ত্ব বা আদর্শ পুরোপুরি মূল্যহীন হয়ে পড়ে। তারা এখন চায় বাস্তবসম্মত, কার্যকর এবং অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক সমাধান।

মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ভোটারদের মধ্যে তৈরি হওয়া এই দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক অসন্তোষ যদি রাজনৈতিক দলগুলো গুরুত্বের সাথে না নেয়, তবে তা ভোটের মাঠে এক বিশাল রাজনৈতিক ঝড়ে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে সমতার যে দাবি, তা এখন আর কেবল সামাজিক দাবি নয়। এটি এখন অর্থনৈতিক মুক্তি ও রাজনৈতিক অধিকারের এক সুসংগঠিত এবং ঐক্যবদ্ধ দাবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে ভোটাররা কেবল প্রার্থীর নাম বা দল দেখবে না, বরং দেখবে কার অর্থনৈতিক রোডম্যাপ কতটুকু বাস্তবসম্মত এবং জীবনমুখী। বড় প্রজেক্টের চেয়ে ছোট ছোট অর্থনৈতিক সংস্কার এখন মানুষের কাছে বেশি জনপ্রিয়। এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনটিই মূলত ২০২৬ সালের নির্বাচনের গতিপথ নির্ধারণ করে দেবে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অভাবনীয় উত্থান এই ‘অদৃশ্য শক্তি’কে আরও বেশি সংহত, শক্তিশালী এবং সংক্রামক করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন আর কেবল তথ্য আদান-প্রদানের জায়গা নয়, বরং এটি জনমত গঠন এবং রাজনৈতিক বয়ান বা ন্যারেটিভ তৈরির এক বিকল্প রাষ্ট্রকাঠামো হিসেবে কাজ করছে। নাগরিক সাংবাদিকতা এবং ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন সামাজিক ইস্যু এখন মূলধারার গণমাধ্যমের চেয়েও অনেক বেশি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছে। প্রথাগত মিডিয়ায় তথ্য অনেক সময় নিয়ন্ত্রিত হলেও ডিজিটাল স্পেসে জনমানসের প্রকৃত ক্ষোভ, আনন্দ বা আকাঙ্ক্ষা সরাসরি এবং অত্যন্ত দ্রুত প্রতিফলিত হয়। এক একটি ভাইরাল পোস্ট বা ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে জনমতকে ওলটপালট করে দেওয়ার এক অভাবনীয় ক্ষমতা রাখে।

এর ফলে রাজনৈতিক নেতারা আর একচেটিয়াভাবে কোনো তথ্য বা বার্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পাচ্ছেন না। জনগণের পালস এখন ডিজিটাল ফিডব্যাক লুপের মাধ্যমে নেতাদের কাছে সরাসরি এবং কোনো ফিল্টার ছাড়াই পৌঁছে যাচ্ছে। এই ডিজিটাল সচলতা নাগরিকদের মধ্যে এক ধরণের শক্তিশালী সম্মিলিত সংহতি তৈরি করেছে। এর ফলে কোনো একটি অনিয়ম বা দুর্নীতির খবর মুহূর্তেই দেশব্যাপী প্রতিবাদের ভাষায় রূপান্তরিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনকে যারা কেবল কাগজের পোস্টার আর মাইকিংয়ের নির্বাচন ভাবছেন, তারা এই ডিজিটাল বিপ্লবের গভীরতা বুঝতে মারাত্মক ভুল করছেন। এখন ভোটাররা কেবল তথ্যের গ্রহীতা নয়, তারা নিজেরাই তথ্যের নির্মাতা এবং প্রসারক।

সামাজিক সংহতি ও যৌথ পরিচয়ের বিবর্তনও এই নির্বাচনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত দিক। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম, আঞ্চলিকতা এবং জাতিগত পরিচয় বরাবরই প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে এসেছে। কিন্তু বর্তমানে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লিঙ্গ সমতা, পরিবেশবাদী সচেতনতা এবং পেশাজীবীদের অধিকার বোধের মতো আধুনিক এবং প্রগতিশীল অনুষঙ্গ। এখনকার মানুষ কেবল একজন সাধারণ ভোটার হিসেবে নয়, বরং একজন সচেতন পরিবেশকর্মী, একজন ফ্রিল্যান্সার বা একজন লড়াকু নারী অধিকার কর্মী হিসেবেও তার রাজনৈতিক পছন্দ বেছে নিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে যেমন টেকসই বাঁধ ও পরিবেশ রক্ষা প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু, তেমনি শহরের কর্মজীবী মানুষের কাছে তার যাতায়াত নিরাপত্তা ও আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধাই প্রধান বিবেচ্য।

এই যে ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক স্তরের ভিন্ন ভিন্ন বৈচিত্র্যময় চাহিদা, এগুলোকে এক সুতোয় গাঁথতে পারাটাই হবে ২০২৬ সালের রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। জনগণ এখন আর কেবল বিমূর্ত জাতীয়তাবাদের গানে সন্তুষ্ট থাকতে চায় না; তারা তাদের দৈনন্দিন ও গোষ্ঠীগত জীবনের বাস্তব এবং স্পর্শযোগ্য সমস্যার সমাধান চায়। ২০২৬ সালের নির্বাচক কেবল ঐতিহ্যবাহী পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং বিভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপট ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করে তার প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। এটি মূলত রাজনীতির একটি গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে ভোটাররা অনেক বেশি যৌক্তিক এবং দাবি-দাওয়া ভিত্তিক আচরণ প্রদর্শন করবে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সংকটও এই অদৃশ্য শক্তির একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং স্পর্শকাতর অংশ। দুর্নীতি, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা এবং নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে অনভিপ্রেত বৈষম্য ভোটারদের মনে এক গভীর বিতৃষ্ণা এবং অনীহা তৈরি করেছে। দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ এবং স্বচ্ছতার অভাব নাগরিকদের প্রথাগত শাসন কাঠামোর প্রতি প্রবলভাবে সন্দিহান করে তুলেছে। এই সন্দেহ থেকেই জন্ম নিচ্ছে রাজনৈতিক বৈধতার এক সম্পূর্ণ নতুন সংজ্ঞা। এখনকার ভোটারদের কাছে বৈধতা কেবল আইনের শুকনো বিধান নয়, বরং এটি হলো প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা এবং সাধারণ নাগরিকের প্রতি প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা। মানুষ এখন প্রতিনিয়ত প্রশ্ন করতে শিখেছে—কেন তারা যোগ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হবে? কেন তাদের করের টাকার সঠিক ব্যবহার হবে না?

এই যে প্রশ্ন করার নতুন সংস্কৃতি, এটিই মূলত ২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রকৃত গতিপথ এবং ফল নির্ধারণ করবে। জনগণের পালস এখানে একজন কঠোর এবং নিরপেক্ষ বিচারকের ভূমিকা পালন করছে, যে প্রতিনিয়ত নেতাদের সততা, কর্মদক্ষতা এবং সদিচ্ছাকে নিঁখুতভাবে পরিমাপ করছে। নেতারা এখন আর কেবল প্রতিশ্রুতি দিয়ে দায় এড়াতে পারবেন না; তাদের প্রতিটি কাজের বিচার হবে কর্মক্ষেত্রে। নাগরিকদের সাড়াদানের ক্ষমতা এবং স্বচ্ছতার মানদণ্ডই হবে ২০২৬ সালে জেতার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। যারা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনমুখী করার প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বাস্তব প্রমাণ দিতে পারবে, তারাই জনগণের প্রকৃত আস্থা অর্জনে সক্ষম হবে।

তবে আমাদের বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, জনগণের এই পালস বা নাড়ির স্পন্দন কোনো স্থির বা অপরিবর্তনীয় বিষয় নয়। এটি অত্যন্ত বহুমাত্রিক, দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং স্থানীয় প্রেক্ষাপটভেদে সম্পূর্ণ ভিন্ন। গ্রামীণ প্রান্তিক কৃষকের পালস যেখানে সারের সরবরাহ এবং ফসলের ন্যায্যমূল্যে আটকে আছে, শহরের উচ্চশিক্ষিত যুবকের পালস সেখানে ইন্টারনেটের অবাধ গতি আর মুক্তভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় স্পন্দিত হচ্ছে। আবার প্রবাসী শ্রমিকদের পরিবারের চাহিদা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের। এই বিচিত্রমুখী এবং কখনও কখনও পরস্পরবিরোধী চাহিদাকে ধারণ করতে পারাটা কেবল রাজনৈতিক কৌশলের বিষয় নয়, এটি হলো গভীর সামাজিক সহমর্মিতার বিষয়।

রাজনৈতিক নেতাদের এখন কেবল মঞ্চে বক্তৃতা দিলে আর চলবে না, তাদের সমাজের এই সূক্ষ্ম এবং জটিল গতিশীলতাকে হৃদয়ে অনুধাবন করতে হবে। জনগণের সুপ্ত চাহিদাগুলো বড় ধরণের সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেওয়ার আগেই তা সঠিকভাবে শনাক্ত করে সে অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় নীতি গ্রহণ করতে হবে। ২০২৬ সালের নির্বাচন হবে সেই সব আধুনিক নেতাদের জন্য এক বড় ধরণের আশীর্বাদ, যারা মানুষের অব্যক্ত কথা শোনার মতো কান এবং হৃদয় তৈরি করেছেন। যারা এই অদৃশ্য শক্তিকে সম্মান করবে এবং তার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেবে, তারাই মূলত গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পাবে। অন্যথায়, তারা সময়ের স্রোতে কেবল ইতিহাসের অংশ হয়েই থেকে যাবে।

২০২৬ সালের নির্বাচন কেবল কতগুলো রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার লড়াই নয়। এটি হলো বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতার সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মানসিক ও কার্যকর প্রতিক্রিয়ার এক চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা। যারা এই সামাজিক শক্তিগুলোকে এবং জনগণের এই অদৃশ্য পালসকে উপেক্ষা করবে, তারা সময়ের চাকা এবং ডিজিটাল স্রোতের কাছে অনিবার্যভাবে পিছিয়ে পড়বে। নেতৃত্ব দেওয়ার প্রকৃত মানদণ্ড এখন কেবল নির্বাচনে জয়লাভ করা নয়, বরং সমাজের এই জটিল এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল সচেতনতাকে প্রতিনিধিত্ব করা। ২০২৬ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষমতা পরীক্ষা করবে—তারা কতটুকু শুনতে প্রস্তুত, কতটুকু খাপ খাওয়াতে সক্ষম এবং কতটুকু অংশগ্রহণমূলক হতে রাজি।

জনগণের এই পালস এখন আর কেবল পেছনের সারির গুঞ্জন বা কানাঘুষা নয়; এটিই আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল সুর এবং ছন্দ। যারা এই সুরটি নিখুঁতভাবে শুনতে পাবে এবং সেই অনুযায়ী জনগণের সঙ্গে একটি অংশগ্রহণমূলক সংলাপে লিপ্ত হবে, তারাই আগামী রাজনৈতিক অধ্যায়ের প্রকৃত রূপকার হিসেবে স্বীকৃত হবে। ভোটাররা এখন অনেক বেশি সচেতন, প্রযুক্তিগতভাবে ক্ষমতাশালী এবং একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। তাদের কণ্ঠস্বরকে অবহেলা করা কেবল রাজনৈতিকভাবে একটি বড় ধরণের ভুল নয়, বরং এটি গণতন্ত্রের মূল চেতনার সঙ্গেই এক ধরণের অবিচার। ২০২৬ সালের নির্বাচন তাই কেবল একটি ভোটের দিন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জনগণের মনস্তাত্ত্বিক বিজয়ের এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হতে যাচ্ছে। যারা এই স্পন্দন বুঝবে, তারাই আগামী দিনের বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।

এইচআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।