মহামারী ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির আসন্ন চ্যালেঞ্জ

সম্পাদকীয় ডেস্ক
সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:১৫ এএম, ১২ এপ্রিল ২০২০

ড. মোঃ বখতিয়ার হাসান

৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯ তারিখে চীনের উহান শহরে নোবেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) এর প্রথম প্রাদুর্ভাব হয়। এটি একটি সংক্রামক এবং গুরুতর রোগ যা সদ্য আবিষ্কৃত করোনাভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট। সংক্রামিত ব্যক্তি শ্বাসযন্ত্রের হালকা থেকে মাঝারি অসুস্থতা অনুভব করে এবং বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন ছাড়াই সুস্থ হয়ে থাকে। বয়স্ক ব্যক্তি এবং অন্যান্য গুরুতর রোগাক্রান্ত ব্যক্তি এই ভাইরাস দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। যেহেতু কোনো ভ্যাকসিন বা চিকিৎসা এখনও আবিষ্কৃত হয়নি, তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে আমাদের ঘরে থাকার এবং ঘন ঘন হাত ধোয়ার পরামর্শ দিচ্ছে। চীনের পর ইরান, ইউরোপীয় দেশগুলিতে বিশেষত ইতালি ও স্পেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এশিয়ান দেশগুলিতেও এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। উল্লেখ্য যে, এটি ইতোমধ্যে প্রায় ২০০ টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। কোভিড-১৯ দ্বারা ১৭ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, যার মধ্যে এক লাখের বেশি মানুষ ইতোমধ্যে মারা গেছেন (১১ এপ্রিল পর্যন্ত)। এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে কোভিড-১৯ কে বৈশ্বিক মহামারী হিসাবে ঘোষণা করেছে।

এই ভাইরাসের বিস্তার রোধ করে বক্ররেখাকে সমতল করার উদ্দেশ্যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সকল দেশের সরকার প্রধানকে সতর্ক করছে এবং তাদের দেশগুলোকে লকডাউন করার পরামর্শ দিচ্ছে। দেরিতে হলেও অধিকাংশ সরকার প্রধান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী তাদের দেশকে লকডাউন করেছে। এখন প্রায় পুরো বিশ্ব লকডাউন। এই প্রথম পুরো বিশ্ব এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হল। এটির কারণে বিশ্বের অর্থনৈতিক কার্যকলাপ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এই মহামারীর কারনে লকডাউন দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এই মহামারীর কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলো ইতোমধ্যে বিশ্ব জিডিপিকে ২০ শতাংশ কমিয়ে সংশোধিত জিডিপি প্রকাশ করেছে। অর্থনীতিবিদরা ধারণা করছেন যে, এই মহামারীর অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্ব মহামন্দা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং গত দশকে বিশ্বব্যাপী সংঘটিত আর্থিক সঙ্কটকেও ছাড়িয়ে যাবে। সুতরাং, এটা অনুমেয় যে, এই মহামারীর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হবে এবং এটা কাটিয়ে উঠতে বিশ্বের বেশ কয়েক বছর লেগে যাবে।

ইতোমধ্যে, এই মহামারীর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়া শুরু হয়েছে। কোভিড-১৯ প্রাথমিকভাবে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক চাহিদা ও যোগানের চেইনগুলিকে ব্যাহত করছে। এর ফলে, পর্যটন, আতিথেয়তা, এয়ারলাইনস, ট্রেড, এবং পরিবহন খাতগুলি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, এই খাতগুলোতে অন্তর্ভুক্ত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের এন্টারপ্রাইজ (এসএমই)। এই খাতগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর চক্রাকার প্রভাব অন্যান্য খাতগুলোকেও প্রভাবিত করবে। এই খাতগুলি ছাড়াও রপ্তানিমুখী শিল্প বিশেষকরে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে। আর্থিক খাত বিশেষত ব্যাংকিং খাত এমনিতেই বর্তমানে বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে, তার উপর এই মহামারী কারণে আরও সমস্যায় পড়বে। মূলত, এই মহামারীটি আমাদের ব্যাংকিং খাতের জন্য ‘খাঁড়ার উপর মরার ঘা’ মতো হয়েছে। অন্যদিকে, আমাদের মূলধন বাজার তার অস্তিত্ব নিয়েই লড়াই করছে। সুতরাং, আসন্ন দিনগুলি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক হবে না। অতএব, বাংলাদেশের অর্থনীতি সামনে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, যা যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে দক্ষতার সহিত মোকাবেলা করা প্রয়োজন। নতুবা অর্থনীতিকে অনেক মূল্য দিতে হবে। এখন, এই চ্যালেঞ্জগুলিকে খাত অনুযায়ী নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

• এসএমই :

সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বিশেষত বাংলাদেশের মত উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে (অর্থনৈতিক কার্যক্রমের প্রায় ৯০% এরও বেশি) এসএমই খাতের অবদান অপরিহার্য। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ব্যাপক অবদান রাখে (বিশ্বের কর্মসংস্থানের প্রায় ৫০% এরও বেশি)। মহামারীর কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রীর দোকান বাদে সমস্ত দোকান বন্ধ রয়েছে। পর্যটন শিল্প সম্পর্কিত সমস্ত ব্যবসা ও যাত্রী পরিবহন ব্যবসাও বন্ধ রয়েছে। এই ব্যবসাগুলিতে জড়িত লোকেরা তাদের চাকরি হারানোর একটি বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। সকল মানুষ বিশেষ করে যারা দিনমজুর তাদের আয় যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে। এই ধরনের অনিশ্চয়তা লোকদের আস্থা হ্রাস করে, যা তাদের ক্রয় সিদ্ধান্তকে বিলম্বিত করে। সুতরাং, বাজারে চাহিদা যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে, যা ক্ষুদ্র উংপাদনকারীর উৎপাদন কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে হ্রাস করেছে। এর মধ্যে তাদেরকে কর্মীদের বেতন দিতে বলা হচ্ছে। এছাড়াও, তাদের ভাড়া, ইউটিলিটি বিল এবং করের জন্য অর্থ প্রদান করতে হবে। একদিকে তাদের ব্যবসা কমে যাচ্ছে, অন্য দিকে তাদেরকে এইসব ব্যয় বহন করে হবে। কিন্তু, এই মহামারীকালীন সময়ে দীর্ঘ মেয়াদে এতগুলো ব্যয় বহন করার মতো ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাগুলোর পর্যাপ্ত রিজার্ভ সাধারণত থাকে না। অর্থনীতিবিদরা বলছে এই মহামারীর একটি নিম্নগামী দুষ্টচক্র থাকতে পারে, যা প্রতিষ্ঠানের অবস্থাকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাবে। এই চক্রটি রোধে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন; অন্যথায় এসএমইগুলো অনেক ভোগবে এবং ক্ষেত্রবিশেষে অনেকের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

• উৎপাদন খাত

উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলি, বিশেষত যারা তাদের উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল আমদানি উপর নির্ভরশীল, তারা বিশ্বব্যাপী লকডাউনের জন্য বেশি প্রভাবিত হবে। উদাহরণস্বরূপ, অটোমোবাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস, ইলেকট্রনিক্স, রাসায়নিক পণ্য প্রস্তুতকারক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের কাঁচামাল মূলত বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ লকডাউনের কারণে চাহিদা পড়ে যাওয়ায় এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলির সেল্স্ টার্নওভার ও ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। যদিও এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো আকারে বড় হয় এবং এ জাতীয় মহামারীতে টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ রিজার্ভ থাকে, তবুও মহামারী দীর্ঘায়িত হলে তাদের পক্ষেও টিকে থাকা কঠিন হবে। মূলত, যে প্রতিষ্ঠানগুলি অধিক ঋণ মূলধন আছে তারা আরও বেশি বিপদে পড়বে। তাদের টিকে থাকার জন্যও সরকারের সহায়তার প্রয়োজন পড়বে।

• আরএমজি

আরএমজি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। দেশের রপ্তানিতে এর অবদান প্রায় ৮০ শতাংশেরও মত। আরএমজি পণ্যগুলি মূলত ইউরোপে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হয়। যেহেতু মহামারী দ্বারা এই দেশগুলোই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, সেহেতু আমাদের আরএমজি খাত একটি বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। মহামারীর কারণে এই খাত প্রথম ধাক্কাটা ইতোমধ্যে খেয়েছে যখন বিদেশি ক্রেতারা দেড় বিলিয়ন ডলারের পোশাক অর্ডার বাতিল করে। বিজিএমইএ সভাপতি দাবি করেছেন যে এর ফলে এক হাজারেরও বেশি কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি আশঙ্কা করছেন যে, এই মহামারীর কারণে অনেক ছোট ছোট কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তিনি আরও আশঙ্কা করছেন যে, এমনকি কিছু বড় বড় কারখানাও সমস্যায় পড়বে এবং অনেক ক্ষেত্রে বন্ধও হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। যেহেতু এই খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রয়েছে, সেহেতু উদ্ভূত পরিস্থিতি হতে এই খাতকে রক্ষা করার জন্য সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া এবং পর্যাপ্ত সহায়তা প্রদান করা উচিৎ। তবে আশার কথা যে, সরকার ইতোমধ্যে এই খাতকে সহযোগিতা করার জন্য একটি প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।

• রেমিট্যান্স

আরএমজির মতো, রেমিট্যান্সকেও বাংলাদেশের অর্থনীতির খুব গুরুত্বপূর্ণ চালক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। জিডিপিতে এই খাতের অবদান ৫ শতাংশেরও বেশি। রেমিট্যান্স খাতও এই মহামারী দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের বেশিরভাগ অভিবাসী শ্রমিক উপসাগরীয় দেশগুলিতে কাজ করেন। উপসাগরীয় দেশগুলির অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে তেল, কিন্তু মহামারীর ফলে তেলের দাম হঠাৎ করে হ্রাস পেয়েছে যার ফলে অভিবাসী শ্রমিকরা তাদের চাকরি হারাতে পারেন। এই মহামারীর কারণে প্রায় অর্ধ মিলিয়ন অভিবাসী শ্রমিক বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। এছাড়াও, এখনও যারা বিদেশে অবস্থান করছেন তারা মহামারীজনিত অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ভবিষ্যতে তাদের চাকরি হারাতে পারেন। এইসব বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য খুব কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করবে, যেহেতু বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি এই রেমিট্যান্সের দ্বারাই পূরণ হয়।

• ব্যাংকিং খাত

বেশ কয়েক বছর ধরে ব্যাংকিং খাত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে যেমন; খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি, তরলতার ঘাটতি ইত্যাদি। এগুলির মধ্যে ব্যাংক সবচেয়ে ভুগছে খেলাপি ঋণ নিয়ে যার দরুন তরলতার ঘাটতিও দেখা দিচ্ছে। সম্প্রতি খেলাপি ঋণের পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যাইহোক, এই মহামারী ব্যাংকিং খাতকে আরও বিপদে ফেলে দিয়েছে।স্বল্প সময়ে ব্যাংকিং খাত আরও তারল্য সংকটের পড়বে। এই তারল্য সংকট মোকাবেলাই বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু আর্থিক নীতি নিতে পারে। তবে, বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন ব্যাংকের সিআরআর এবং রেপো হার কমিয়েছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়ীত হলে ব্যাংকগুলির খেলাপি ঋণের পরিমাণ নিঃসন্দেহে আরও বাড়বে। অধিকন্তু, যেহেতু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এই মহামারী দ্বারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেহেতু ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ প্রদানের হার ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। এমতাবস্থায়, যেসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি আছে তাদের টিকে থাকা খুব কঠিন হবে। আমরা হয়ত আগামীতে ব্যাংকগুলির মধ্যে একত্রীকরণের বেশকিছু উদাহরণ দেখতে পাব।

• পুঁজিবাজার

যেমনটি আমি আগেই বলেছি যে মূলধন বাজারকে ইতোমধ্যে জবাই করা হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে মহামারী মূলধন বাজারকে কবর দিয়ে দেবে। মহামারীজনিত কারণে যেহেতু তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ব্যবসা অনেক হ্রাস পাবে, সেহেতু তাদের শেয়ারের মূল্যও অনেক পড়ে যাবে। এমনিতেই শেয়ারের মূল্য তলানি পড়ে গেছে, তার উপর মহামারীর কারণে আরও পড়ে গেলে বাজারকে বাঁচানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে।

• রিয়েল এস্টেট খাত

রিয়েল এস্টেট খাতও এই মহামারীতে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। এই মহামারীর ফলে জনগণের আয় যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে এবং সামনে আরও পাবে। তাদের যা সঞ্চয় আছে তা দিয়ে তারা নিজেদের বেঁচে থাকার জন্যই ব্যবহার করবে, আবাসনের জন্য তা ব্যবহার করার সম্ভাবনা খুবই কম। সুতরাং আবাসন খাতে যারা ইতোমধ্যে বিনিয়োগ করেছে, সেই বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার করাই তাদের কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

• মেগা উন্নয়ন প্রকল্প

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, বাংলাদেশ সরকার একের পর এক মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে যেমন; পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ফ্লাইওভার ইত্যাদি। এই প্রকল্পগুলি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মেগা প্রকল্পগুলির অগ্রগতি সামনে হ্রাস পেতে পারে, কারণ এই মহামারীজনিত অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলা করতে সরকার ভবিষ্যতে তাদের উন্নয়ন বাজেট কমাতে বাধ্য হবে। এছাড়াও এই উন্নয়ন প্রকল্পগুলির কাঁচামাল মূলত বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতির কারণে বাধাগ্রস্ত হবে। যদি সত্যই এটি ঘটে, তবে সামনে বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়নের অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

• কৃষি খাত

বাংলাদেশের আর একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ খাত হল কৃষি খাত। যদিও দেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান অনেক কমে গেছে, তথাপি এই খাতে এখনও দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ জনগণ তাদের জীবিকার জন্য নির্ভরশীল। এই কৃষি খাতের জন্যই আজ বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। যাইহোক, এই খাতও মহামারীতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যেহেতু মহামারীর কারণে অন্যান্য পণ্যের মত কৃষি পণ্যের মূল্যও কমে যেতে পারে, সেহেতু কৃষকরাও এই মহামারীর কারনে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যদি এই ক্ষাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দেশের জনগণের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ কর্মহীন হয়ে পড়বে এবং দেশে খাদ্যের সংকট দেখা দিতে পারে। কাজেই, সরকারকে এই খাতের দিকেও নজর দিতে হবে।

উল্লিখিত খাতগুলি বাদে, আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক উভয় খাতের অন্যান্য ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানও এই মহামারী দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে।

পদক্ষেপসমূহ

এই অর্থনৈতিক সঙ্কট এড়াতে সরকারকে আর্থিক ও রাজস্ব উভয় নীতি গ্রহণ করতে হবে। তবে বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে এই অর্থনৈতিক মন্দা নিরসনে বেশ কিছু আর্থিক ও রাজস্ব নীতি গ্রহণ করেছে। দুঃস্থ ও দিনমজুর যাদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে তাদেরকে সরকার প্রতিনিয়ত রিলিফ দিচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তার জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করেছে। ৫ এপ্রিল সকালে প্রধানমন্ত্রী নতুন করে ৪টি প্যাকেজে ৬৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তার কথা ঘোষণা করেছেন। ৫টি প্যাকেজে মোট আর্থিক সহায়তার পরিমাণ দাঁড়ালো ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। এই প্যাকেজগুলোর আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন খাতকে যেমন; শিল্প ও সার্ভিস খাত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত, রপ্তানি ও এর সংশ্লিষ্ট খাত; ঋণ আকারে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। তবে এই ঋণের সুদের একটা নির্দিষ্ট অংশ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান দেবে এবং বাকি অংশ সরকার দেবে। আমার মনে হয়, সবাইকে ফ্ল্যাট রেটে ঋণ সুবিধা না দিয়ে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে আরও শ্রেণিবিন্যাস করে তাদের আর্থিক অবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী সুদের হার কমবেশি করা যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে সুদমুক্ত ঋণ দিতে হবে। আর একটা বিষয় সরকার উপেক্ষা করছে, সেটা হলো বর্তমান ঋণ। এই বিষয়ে কি করা হবে তা পরিষ্কার করা উচিৎ। বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ৩০ জুন পর্যন্ত কোনো গ্রাহক যদি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারলেও তাদের ঋণকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে না। যদি এই মহামারী দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এই সাহায্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পর্যাপ্ত হবে না। এ ক্ষেত্রে ঋণের আংশিক বা সম্পূর্ণ সুদ মওকুফ করার প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া, কিছু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি এবং এমনকি বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন কর সুবিধা যেমন; কর ছাড় বা মওকুফ; দেওয়া যেতে পারে। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক অনেক খাত আছে যেমন স্টক একচেঞ্জের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফ্রিলাঞ্চার, ভ্রাম্যমাণ দোকান ব্যবসায়ী, পোলট্রি, ডেইরী, চিংড়ি, শুটকি ইত্যাদি, যেগুলো এই মহামারীর কারণে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকারের কাছ থেকে যথাযথ সাহায্য না পেলে তাদের কার্যক্রম একেবারে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আর একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ খাত সরকারের এই প্রণোদনায় অনুপস্থিত, সেটা হল কৃষি খাত। যেহেতু এই খাত সারা দেশের খাদ্যের যোগান দিচ্ছে এবং দেশের জনগণের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশের জীবিকা এই খাতের উপর নির্ভরশীল, সেহেতু সরকারকে এই খাতের দিকেও নজর দিতে হবে।
এখন পর্যন্ত সরকার যে উদ্যোগগুলো নিয়েছে তা প্রশংসনীয়। তবে সরকারের এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা। কারণ, এর আগে অনেক উদাহরণ দেখেছি যে, সরকারের সংশ্লিষ্ট কিছু লোকের দুর্নীতির কারণে অনেক ভালো উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।

উল্লেখ্য যে, অতিসম্প্রতি সরকারের ত্রাণ বিতরণে বেশ কিছু অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর পাওয়া গেছে। আর যেন এমনটা না হয় সে বিষয়ে সরকারকে সজাগ থাকতে হবে। যেহেতু এই মহামারীটি খুব শিগগিরই শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম, সেহেতু সরকারের উচিৎ অনতিবিলম্বে দক্ষ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা, যাদের কাজ হবে এই আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে সহায়তা করা এবং নিয়মিতভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক উভয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সরকারকে এই অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবিলায় বিভিন্ন কার্যকর পরামর্শ প্রদান করা। পরিশেষে, আমরা আশা করি যে, বাংলাদেশ খুব শিগগিরই এই মহামারীটি জয়লাভ করবে এবং তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের (ভিশন-২০৪১) দিকে এগিয়ে যাবে।

ড. মোঃ বখতিয়ার হাসান : ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া এর ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক

এমএএস/এসএইচএস/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।