মালয়েশিয়ায় রায়হান ইস্যুর সমাপ্তি কোন পথে?

রফিক আহমদ খান
রফিক আহমদ খান রফিক আহমদ খান , মালয়েশিয়া প্রবাসী সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৮:৩৩ এএম, ২৯ জুলাই ২০২০

এম রায়হান কবির, নারায়ণগঞ্জের ছেলে। সম্ভবত ২০১৪ সালে শিক্ষার্থী ভিসায় মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন। মালয়েশিয়ায় গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ কমিউনিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে বহুবার দেখেছি। আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টেও সংযুক্ত আছে সে। কখনো কথা বলা হয়নি তার সাথে। তারপরও তাকে যা দেখেছি তাতে, তাকে একজন সাহসী ও নির্ভীক তরুণ হিসেবে জানতাম। জুলাই মাসের ৩ তারিখে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরায় মালয়েশিয়ায় বিদেশি শ্রমিকদের নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচারিত হয়।

‘লকডআপ ইন মালয়েশিয়ান লকডাউন-১০১ ইস্ট’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে মালয়েশিয়ায় থাকা প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি লকডাউন চলাকালে দেশটির সরকারের নিপীড়নমূলক আচরণ উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদনে সাক্ষাৎকার দিয়েছিল বাংলাদেশি তরুণ রায়হান কবির। প্রতিবেদনটি প্রচারিত হওয়ার পর ক্ষেপে ওঠে মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ তথা মালয়েশিয়া সরকার। মালয়েশিয়ার পুলিশ সদরদফতর থেকে মোস্টওয়ান্টেড ঘোষণা করে রায়হান কবিরকে খুঁজতে থাকে। অবশেষে গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ কুয়ালালামপুরের জালান পাহাং থেকে রায়হানকে আটক করে।

মালয়েশিয়া অভিবাসন বিভাগ রায়হানকে আটক করেছে ঠিকই। তাকে (রায়হান) নিয়ে দেশে-বিদেশে অবস্থানরত তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা যতটা ভয় পাচ্ছেন, রায়হানের কোনো ক্ষতি হবে কিনা- আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি রায়হান কবিরের তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। প্রবাসজীবন সূত্রে মালয়েশিয়ার সাথে বিগত সতের বছরের সম্পর্ক আমার, সেই অভিজ্ঞতায় বলব, মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ বা পুলিশ বিভাগ রায়হানর শারীরিক ক্ষতি করবে না, এবং তার বড় কোনো সাজাও হবে না।

মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ ইতোমধ্যে রায়হানের ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করেছে; বড় ক্ষতি যা হওয়ার মূলত এটাই। শেষমেশ মালয়েশিয়ান কর্তৃপক্ষ রায়হানকে দেশে পাঠিয়ে দেবে। সেই সাথে কালো তালিকাভুক্ত করবে। এই কালো তালিকাভুক্ত করাটা বিরাট কোনো ব্যাপার না। এই যে সারা বছর ধরে মালয়েশিয়ায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ অভিবাসী আটক করা হয়, তারা কম-বেশি জেল খেটে নিজ দেশে ফিরলেই সবাইকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয় পাঁচ বছরের জন্য।

এই আইন সম্ভবত ২০১৪ সাল থেকে চালু হয়েছে। তাই রায়হানকে দেশে পাঠিয়ে দেয়ার পর কালো তালিকাভুক্ত হবে, সেটা স্বাভাবিক ব্যাপার। রায়হানের শারীরিকভাবে কোনো নির্যাতনের শিকার না-হওয়াটাই হবে তার ও তার শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রাপ্য। আটকের আগে রায়হান যে ভিডিও বার্তা দিয়েছে তাতে রায়হান নিজেও সুস্থভাবে নিজ দেশে ফেরত আসার আশা ব্যক্ত করেছেন। আমার ধারণা শেষ পর্যন্ত সেটাই হবে।

আর রায়হানের কারণে মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের কোনো ক্ষতি বা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারেও নেতিবাচক কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ আল-জাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে রায়হানের বক্তব্যগুলো বহু প্রবাসীর মনের কথা হলেও মুখের কথা নয়; এমনকি বাংলাদেশ হাইকমিশনের বা বাংলাদেশ সরকারেরও নয়। তাই এ নিয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার প্রশ্নই আসে না।

বরং রায়হান ইস্যুর ফলাফল হিসেবে সামান্য হলেও ইতিবাচক প্রভাব অদূর ভবিষ্যতে পাবে মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিসহ অন্যান্য দেশের নাগরিকরা বা মালয়েশিয়ায় কর্মরত বিদেশি শ্রমিকরা। বিদেশি শ্রমিকদের প্রতি অমানবিক আচরণের প্রশ্ন যখন উঠেছেই, সেটা মালয়েশিয়া সরকার মুখে অস্বীকার করলেও ভবিষ্যতে সে ব্যাপারে আরও আন্তরিক হবে আশা করি। কারণ এটাই স্বাভাবিক কেউ একজন আমাদের দোষত্রুটি ধরলে আমরা প্রথমে নারাজ হই, অস্বীকার করি; কিন্তু পরবর্তীতে নিজেই সে ভুলত্রুটি কাটিয়ে উঠতে বা পরবর্তী কার্যক্রমে যেন এমন ভুল আর না- হয় সে চেষ্টা করি। মালয়েশিয়াও এমনটাই করবে আশা করি।

তাই বলতেই পারি রায়হান কবিরের ঘটনায় ভবিষ্যতে প্রবাসীরা সামান্য হলেও উপকৃত হবেন। যদিও আপাতত রায়হানকে রক্ষায় বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার কয়েকটি সংগঠন/প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর তেমন কেউ এগিয়ে আসছেন না। এমনকি আমার জানা মতে রায়হান কবির মালয়েশিয়ায় যে সংগঠনের সাথে জড়িত ছিল সে সংগঠনও না। সংগঠনটির মুরুব্বিরাও না। কারণ কেউ এসব ঝামেলায় জড়াতে চায় না। অন্তত প্রবাসে সবাই-ই সংশ্লিষ্ট দেশের আইনের সাথে বা প্রশাসনের সাথে ও সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকদের সাথে ঝামেলা এড়িয়ে চলতে চায়। মূলত রায়হান কবিরের যদি কোনো ভুল থাকে, তাহলে ভুলটা এখানেই, সেই এই ব্যাপারটা বুঝেনি; মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেরই মতামত এটাই।

পরিশেষে বলব, রায়হান সুস্থ শরীরে সুষ্ঠুভাবে ফিরে আসুক দেশে; মায়ের কোলে। মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরাও ভালো থাকুক সে দেশে। মালয়েশিয়া-বাংলাদেশের ভাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কও অটুট থাকুক। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে অন্তর দিয়ে অনুভব করেছি মালয়েশিয়ানরা বিশেষ করে মালয়রা বাংলাদেশিদের বিশেষভাবে পছন্দ করেন। এ জন্যই সমগ্র মালয়েশিয়ার আনাচে-কানাচে বাংলাদেশিদের বসবাস বহু বছর ধরে। মালয়েশিয়ায় দেশ থেকে যারা বেড়াতে যান তারা দেখেন মালয়েশিয়ার সব জায়গায় বাঙালি আছেন; নগর থেকে শহর, শহর থেকে উপশহর, সবখানেই বাঙালির ছোঁয়া, বাঙালির ছায়া লেগে আছে। বলতেই হয়, মালয়রা নিশ্চিতভাবে ভালো জাতি।

এইচআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]