বাংলার আকাশজুড়ে ছিলেন তিনি

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:২৭ পিএম, ১৪ আগস্ট ২০২০

শামীমা আক্তার তন্দ্রা

মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক ঘৃণ্য ও নৃশংসতম শোকের দিন ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঘাতকচক্রের হাতে বাঙালির হাজার বছরের আরাধ্য পুরুষ, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। সেদিন ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম এই হত্যাকাণ্ডে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী মহীয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, জাতির জনকের জ্যেষ্ঠ পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন শেখ কামাল, দ্বিতীয় পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল, কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শেখ ফজলুল হক মণি, জাতির জনকের ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, কনিষ্ঠ পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, তাঁর ছোট মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত আব্দুল্লাহ বাবু, ভাইয়ের ছেলে শহীদ সেরনিয়াবাত, আব্দুল নঈম খান রিন্টু,বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা অফিসার কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদ ও কর্তব্যরত অনেক কর্মকর্তা- কর্মচারী নিহত হন। কিন্তু ওই সময় দেশে না থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা।

বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে সপরিবারে হত্যার পর দীর্ঘ দিন বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশ ছিল তিমিরাচ্ছন্ন। তিনি ছিলেন বাঙালির হৃদয়ের আকাশজুড়ে। বঙ্গবন্ধুকে দৈহিকভাবে হত্যা করা হলেও তাঁর মৃত্যু নেই, তিনি চিরঞ্জীব। বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং স্থপতি তিনিই। যতদিন এ রাষ্ট্র থাকবে, ততদিন অমর তিনি। সমগ্র জাতিকে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রেরণায় প্রস্তুত করেছিলেন ঔপনিবেশিক শাসক-শোষক পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে। তাই চিরঞ্জীব তিনি এ জাতির চেতনায়। বঙ্গবন্ধু কেবল একজন ব্যক্তি নন, এক মহান আদর্শের নাম। যে আদর্শে উজ্জীবিত হয়েছিল গোটা দেশ। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষ দর্শনে দেশের সংবিধানও প্রণয়ন করেছিলেন স্বাধীনতার স্থপতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। শোষক আর শোষিতে বিভক্ত সেদিনের বাস্তবতায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন শোষিতের পক্ষে।

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী (রেসিডেন্ট পিএ জনাব আ ফ ম মোহিতুল ইসলাম এর এজাহারে বর্ণানুসারে) ১৯৭৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িতে কর্মরত ছিলেন। ১৪ আগস্ট (১৯৭৫) রাত আটটা থেকে ১৫ আগস্ট সকাল আটটা পর্যন্ত তিনি ডিউটিতে ছিলেন ওই বাড়িতে। ১৪ আগস্ট রাত বারোটার পর ১৫ আগস্ট রাত একটায় তিনি তাঁর নির্ধারিত বিছানায় শুতে যান।মামলার এজাহারে জনাব মোহিতুল উল্লেখ করে বলেন, ' তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম তা খেয়াল নেই। হঠাৎ টেলিফোন মিস্ত্রি আমাকে উঠিয়ে ( জাগিয়ে তুলে) বলেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব আপনাকে ডাকছেন। তখন সময় ভোর সাড়ে চারটা কী পাঁচটা। চারদিকে আকাশ ফর্সা হয়ে গিয়েছে। বঙ্গবন্ধু ফোনে আমাকে বললেন, সেরনিয়াবাতের বাসায় দুষ্কৃতকারী আক্রমণ করেছে। আমি জলদি পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করলাম। অনেক চেষ্টার পরও পুলিশ কন্ট্রোল রুমে লাইন পাচ্ছিলাম না।

তারপর গণভবন এক্সচেঞ্জে লাইন লাগানোর চেষ্টা করলাম। এরপর বঙ্গবন্ধু ওপর থেকে নিচে নেমে এসে আমার কাছে জানতে চান পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে কেন কেউ ফোন ধরছে না। এসময় আমি ফোন ধরে হ্যালো হ্যালো বলে চিৎকার করছিলাম। তখন বঙ্গবন্ধু আমার হাত থেকে রিসিভার নিয়ে বললেন আমি প্রেসিডেন্ট বলছি। এ সময় দক্ষিণ দিকের জানালা দিয়ে একঝাঁক গুলি এসে ওই কক্ষের দেয়ালে লাগলো। তখন অন্য ফোনে চিফ সিকিউরিটি মহিউদ্দিন কথা বলার চেষ্টা করছিলেন। গুলির তাণ্ডবে কাঁচের আঘাতে আমার ডান হাত দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে।এ সময় জানালা দিয়ে অনর্গল গুলি আসা শুরু হলে বঙ্গবন্ধু শুয়ে পড়েন। আমিও শুয়ে পড়ি।

মোহিতুল ইসলামের এজাহারের বর্ণনায় বলেন,' আক্রমণকারীদের মধ্যে কালো পোশাকধারী ও খাকি পোশাকধারী ছিল।এসময় আবার আমরা গুলির শব্দ শোনার পর দেখি ডিএসপি নূরুল ইসলাম খানের পায়ে গুলি লেগেছে। তখন আমি বুঝতে পারলাম আক্রমণকারীরা আর্মির লোক। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সাথে সাথে সেদিন ঐ কুলাঙ্গারেরা বাংলাদেশের সকল স্বপ্নকে হত্যা করেছিল। বঙ্গবন্ধু না থাকলে হয়তো আজো আমরা বাংলাদেশ কী তা জানতাম না। হয়তো পূর্ব পাকিস্তান নাম নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হতো। বঙ্গবন্ধু যদি সেদিন মারা না যেতেন তাহলে আমাদের দেশ হয়তো আজ অনেক দূর এগিয়ে যেতো।

বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা তাঁর বাবার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য অনেক কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। বাংলাদেশকে তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশে পরিণত করেছেন। এইতো কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশের মানুষ মোবাইল ফোনের নাম শুনলেই চমকে উঠতো। কিন্তু আজ কাজের মহিলা, রিক্সাওয়ালা সবার হাতেই আমরা মোবাইল ফোনের ব্যবহার দেখতে পাই। বঙ্গবন্ধু ঠিক এরকম একটিই বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। যেখানে কোনো অভাব থাকবে না কোনো হাহাকার থাকবে না। যদিও তাঁর সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা বাবার স্বপ্ন পূরণে সদা তৎপর আছেন।

বঙ্গবন্ধু যদি আজ আমাদের মাঝে থাকতেন তাহলে আমাদের দেশ এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে উন্নত দেশ হতে পারতো, অসম্ভব কিছুই ছিলো না। কারণ বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন আদর্শ নেতা। আর যে দেশে তাঁর মতোন আদর্শ নেতা থাকতেন সে দেশে একনিষ্ঠ কর্মীর ও অভাব হতোনা। তিনি এমন একজন নেতা ছিলেন যিনি কিনা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ভুলে গিয়ে কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে কাজ করতে পছন্দ করতেন। তাকে শুধু বাংলাদেশের নেতা বললে ভুল হবে। কারণ তিনি ছিলেন সকল দেশের সকল নেতার উত্তম আদর্শ। বঙ্গবন্ধুকে সবসময়ের জন্য বলা উচিৎ বিশ্বনেতা। আজ বঙ্গবন্ধু যদি আমাদের মাঝে থাকতেন তাহলে হয়তো এই দেশ অনেক আগেই উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছাতো।

১৫ আগস্ট জাতীয় শোকের দিন। বাংলার আকাশ- বাতাস আর প্রকৃতিও অশ্রুসিক্ত হওয়ার দিন। কেননা ১৯৭৫ সালের এই দিনে আগস্ট আর শ্রাবণ মিলেমিশে একাকার হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর রক্ত আর আকাশের মর্মছেঁড়া অশ্রুর প্লাবনে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সুবহে সাদিকের সময় যখন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে নিজ বাসভবনে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে বুলেটের বৃষ্টিতে ঘাতকরা ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল,তখন যে বৃষ্টি ঝরছিল, তা যেন ছিল প্রকৃতিরই অশ্রুপাত। ভেজা বাতাস কেঁদেছে সমগ্র বাংলায়। ঘাতকদের উদ্যত অস্ত্রের সামনে ভীতসন্ত্রস্ত বাংলাদেশ বিহ্বল হয়ে পড়েছিল শোকে আর অভাবিত ঘটনার আকস্মিকতায়। কাল থেকে কালান্তরে জ্বলবে এ শোকের আগুন।

প্রতি বছর ১৫ আগস্ট জাতি গভীর শোক ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সকল সদস্যদের।পালিত হয় জাতীয় শোক দিবস। এবারের শোক দিবস ও মুজিব বর্ষ উপলক্ষে আমাদের চাওয়া এই যে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নগুলো যেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বাস্তবায়ন হয়। সেই কালরাত্রির করালগ্রাসে নিহতদের আত্মার চির শান্তি কামনা করছি।

লেখক : সদস্য , বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, সাবেক শিক্ষার্থী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

এইচআর/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]