গোপাল সূত্রধরের মৃত্যু : এই মৃত্যু উপত্যকা আমাদের দেশ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা , প্রধান সম্পাদক, জিটিভি
প্রকাশিত: ১১:৩২ এএম, ৩০ জানুয়ারি ২০২১

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একাত্তর টেলিভিশনের খবরে সিসিটিভি ফুটেজটি দেখার পর আমার কেবলই মনে হতে থাকল এমন মৃত্যু-মিছিলই আমার দেশ, আমার উপত্যকা। বলছিলাম এই টিভি চ্যানেলের ভিডিও এডিটর গোপাল সূত্রধরের কথা। ৩৫ বছরের তরতাজা যুবক আগের দিন মারা গেছেন বাসচাপায়। স্থান যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের সড়ক প্রগতি সরণি, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরারের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল আরেক ঘাতক বাস। সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট মাত্রাতিরিক্ত গতির কারণেই ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের বাসটি কত ভয়ঙ্ককরভাবে গোপালের মোটরসাইকেলকে আঘাত করে তাকে হত্যা করেছে।

ভিডিও সম্পাদনা করতেন গোপাল। এমন অনেক ছবি তার প্যানেলে তাকে খবরের জন্য বাছাই করতে হয়েছে। আজ সে রকম এক ছবি হয়ে গেলেন তিনি নিজেই। কফিনে ঢুকে মৃত্যু-মিছিলে নিজেকে তিনি শামিল করে নিয়েছেন।

ছোট চাকরি, স্বল্প বেতন। কিন্তু মনের ভেতর লালন করতেন স্বপ্নের চেয়েও বড় আশা। বছরের পর বছর, খেয়ে না খেয়ে টাকা জমিয়ে স্বপ্নের বাইক কিনেছিলেন তিনি। এগুলো কেউ আমরা জানতাম না। জানলাম তিনি মারা যাওয়ার পর, তার ফেসবুক টাইমলাইন দেখে। দেখে ভারী আশ্চর্য হয়েছি আমরা, তার চেয়েও বেশি ভারী এখন আমাদের মন। দরিদ্র পরিবারের একমাত্র ভরসার এই মানুষটির মৃত্যুর সাথে সাথে শেষ হয়ে গেল একটা পরিবারের আরও অসংখ্য বড় আর ছোট ছোট স্বপ্ন।

কেন এভাবে মরতে হলো সংবাদমাধ্যমের একজন কর্মীকে? রক্তমাংস আনন্দবেদনা মিলন-বিরহ আর সঙ্কটে গড়া এক-একটা আস্ত জীবন এত সস্তা এই শহরে?

এই শহর, এই দেশ কোটি কোটি শিক্ষার্থীর সড়ক আন্দোলন দেখেছে, বিস্মিত আর ব্যথিত হয়েছে, তারপর আইন হয়েছে। কিন্তু সেই আইন প্রায় পুরোটাই হয়েছে উচ্ছৃঙ্খল গণপরিবহনের মালিক আর শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা করে। কিন্তু সেটিও বাস্তবায়িত হয়েছে সংসদে পাস হওয়ার এক বছরেরও বেশি সময় পর এবং তাও মালিক-শ্রমিকদের চাপে নানা কাটছাঁট করে। বারবারই বলে আসছি, দেখে আসছি বাংলাদেশে একমাত্র সড়ক পরিবহন খাতেই মালিক-শ্রমিক ভয়ংকর ঐক্য বিরাজমান এবং সেটা নৈরাজ্যের পক্ষে। কোনো বিবেচনাতেই মানুষের কথা গুরুত্ব পায়নি। পেলে বাংলাদেশের সড়কে সাধারণ মানুষের জীবন কি এমন দুর্বিষহ হয়ে থাকতে পারে?

২০২০ সালে দেশে চার হাজার ৭৩৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ হাজার ৪৩১ জন নিহত এবং সাত হাজার ৩৭৯ জন আহত হয়েছেন বলে রোডটি সেফটি ফাউন্ডেশনের ‘সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২০’ এ বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত পাঁচ হাজার ৪৩১ জনের মধ্যে ৮৭১ জন নারী ও ৬৪৯ জন শিশু।

ঢাকায় ইদানীং দুর্ঘটনা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞ না হয়েও বোঝা যায় রাজধানীর রাস্তাগুলো পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়নি। অধিকাংশ সড়কে আবার সংযোগ সড়ক আছে। এ শহরের গণপরিবহন সুশৃঙ্খল নয়। যাত্রী তোলার জন্য পর্যাপ্ত বাস স্টপেজ নেই। চালকরা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন। সড়কগুলো পথচারীবান্ধব নয়। যত্রতত্র পথচারী পার হচ্ছেন। এসব কারণে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনা হচ্ছে।

কিন্তু সবগুলোর মধ্যে একটা হলো- চালকরা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন। কারণ তারা সবদিক থেকেই সুরক্ষিত। তাদের কোনো অপরাধই অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় না পরিবহন মালিক আর শ্রমিক সংগঠনগুলোর কাছে। তারা প্রচণ্ড শক্তিশালী, কোনো নিয়ম বা আইনের তোয়াক্কা করেন না এবং তারা এতটাই বেপরোয়া যে, তারা আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে গিয়ে ধর্মঘট ডেকে দেশ অচলও করে দিতে পারেন।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিশেষজ্ঞরা যেসব পরামর্শ দেন সেগুলো হলো- দক্ষচালক তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে; চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করতে হবে; বিআরটিএর সক্ষমতা বাড়াতে হবে; পরিবহনের মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে; মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল বন্ধ করে এগুলোর জন্য আলাদা পার্শ্বরাস্তা তৈরি করতে হবে; পর্যায়ক্রমে সকল মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করতে হবে; গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে; রেল ও নৌপথ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে সড়ক পথের ওপর চাপ কমাতে হবে; টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে ইত্যাদি।

কিন্তু বাসচালক আর হেল্পারদের ঠিক করবে কে? সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সহসা দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হবে না, কারণ পরিবহন খাতের নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনার পক্ষে সক্রিয় ভয়াল চেহারার কতগুলো পেশিশক্তি। এদের দাপটের কারণে শেষপর্যন্ত সমস্ত দোষ চাপে ভিক্টিমদের ওপর। একটা বড় কারণ এই যে, সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া বেশিরভাগ মানুষ অতিসাধারণ, তাই তাদের জন্য দাঁড়াবার কেউ নেই, কোনো সক্রিয় উদ্যোগও নেই।

কী কী কারণে এত বেশি দুর্ঘটনা ঘটে, কী কী পদক্ষেপ করলে দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনা সম্ভব- এসব বহু-আলোচিত। অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোই যে আসল কারণ, পরিবহন চালক ও তাদের সহযোগীদের বেপরোয়া মনোভাবই যে পিচঢালা কাল রাজপথকে বারবার রক্তাক্ত করছে, এ কথা বুঝলেও শক্ত করে বলার লোক নেই মাফিয়াধর্মী কিছু নেতার কারণে। পরিবহন শ্রমিকদের উচ্ছৃঙ্খলাতার বহু নজির আছে যেখানে আইনরক্ষকদের ঢিলেঢালা ভাব সবসময়ই পরিলক্ষিত হয়েছে।

বেশ কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেল নগরকর্তারা আন্ডারপাস আর ওভারপাস নির্মাণে তৎপর হয়ে যান কোনো দুর্ঘটনায় বড় আন্দোলন হলে। কিন্তু সব মৃত্যুতে-তো আর আন্দোলন হয় না, যেমন হয়নি গোপাল সূত্রধরের বেলায়ও।

বিদায় গোপাল। ক্ষমা করবেন আমাদের। বেঁচে থাকতে যা কিছু বলা, ভাবা, লেখা- মৃত্যু যে কীভাবে মুহূর্তমধ্যে তাকে অনেকগুণ বেশি অর্থবহ করে তুলতে পারে, আরও একবার তা বলে গেলেন আপনি। যে রাস্তায় আপনি বহুবার হেঁটে গেছেন আর স্বপ্ন দেখেছেন আরও দ্রুত ধাবমান হবেন বলে, সেখানেই আপনাকে স্পন্দনহীন করে দেয়া হয়েছে। এ শহর আপনার আমার স্বপ্নভঙ্গের শহর।

এইচআর/বিএ/এমএস

ঢাকায় ইদানীং দুর্ঘটনা বেড়েছে। এ শহরের গণপরিবহন সুশৃঙ্খল নয়। যাত্রী তোলার জন্য পর্যাপ্ত বাস স্টপেজ নেই। চালকরা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন। সড়কগুলো পথচারীবান্ধব নয়। যত্রতত্র পথচারী পার হচ্ছেন। এসব কারণে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনা হচ্ছে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]