বহুগামিতা : ভালোবাসা না প্রতারণা?

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:৪৪ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১

তানজিনা পৃথা

বহুগামিতা; ভালোবাসার আশ্বাসে ইচ্ছে পূরণের নষ্টামী। সত্যিকারের কাউকে ভালোবাসলে বহুগামী হওয়া অসম্ভব। মনে রাখা জরুরি মন ভাগ করা যায় না বরং সময় ভাগ করে বহুজনকে বিলানো যায়। এটাও সত্যি যে, সময় বিলানো আবেগী মুহূর্ত নয়; কেবলই শারীরিক সম্পর্কের অভিপ্রায়। যেখানে মনের টান নিছক অর্জনের প্রণোদনায় গুটিকয়েক বাক্য ব্যয়।

জাগতিক দায়িত্বের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হলে সম্মানের সাথে দূরে সরে যাওয়া উত্তম। সাথে থেকে বহুগামী মানসিকতায় শুধু নিজেকে সহজলভ্য সস্তা পণ্য বানানো। ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশে শরীরী সম্পর্ক যেখানে মুখ্য, বহুগামিতার আগমন ঠিক সেখানেই। অস্তিত্ব সঙ্কটে থাকা মানব মনের সব পেতে চাওয়ার মানসিকতায় বহুগামিতার জন্ম।

পরিসংখ্যানের উদাহরণ বলে মেয়েদের তুলনায় ছেলেরাই বেশি বহুগামিতার চর্চায় অভ্যস্ত। ইদানীং সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে এ শব্দটি। শব্দহীন কান্নায় সম্মান আর মিথ্যা ভালোবাসার মোহে প্রতিদিন হাজারও মনে দানা বাঁধছে কষ্টের পাহাড়। ভালোবাসার ব্যাকুলতায় মেনে নেয়া বহুগামিতার অন্যায় মানুষকে শুদ্ধ করে না বরং তাকে অন্যায়ের সুযোগ তৈরি করে দেয়।

নির্লজ্জ সততায় বহুগামিতার বিচরণ; যাকে ঘৃণা করাও অসাধ্য। কেউ যদি ভালোবাসা বিভাজিত করে তবে বুঝতে হবে সে ভালোবাসার সঙ্কটে আছে। আত্মবিশ্বাসের অভাবে প্রতিনিয়ত সে অন্যের আবেগ নিয়ে খেলা করছে যা মিথ্যা ভালোবাসার মোড়কে জড়ানো ধ্বংসাত্মক লোভ। যার শিকার হয়ে প্রতি মুহূর্তে মারা যায় ভালোলাগার অনুভূতি। আবেগী মনের তীব্র বাসনায় অপেক্ষমাণ ভালোবাসা অভিমানে দূরে সরে যায়। বহুগামী মানুষ তখন নতুন কাউকে কাছে টেনে নেয়, কেননা সে একা থাকতে পারে না। প্রতি মুহূর্তে তার সঙ্গী চাই যার জন্য একসাথে সে অনেকগুলো সম্পর্কে জড়ায়। সে আত্মকেন্দ্রিক, তার মিথ্যা ভালোবাসাও নিজের মতো করে সাজিয়ে বহু মানুষের মনে বসবাস করে। সংকট কাটাতে কেউ না কেউ তার সাথে থাকবেই। সেখানে অন্যকে গুরুত্ব দেয়া বাহুল্য মাত্র।

না বলা এ বিষয় নিয়ে আজ আমার লেখার একটি কারণ রয়েছে। আধুনিকায়নের বিলাসিতায় সমাজ আজ বহুগামিতার ব্যাধিতে আক্রান্ত। প্রতিনিয়ত বিভাজিত ভালোবাসায় মানসিক অত্যাচারের শিকার হচ্ছে অসংখ্য মানব মন। সাহস করে মুখ খুলবার জো নেই পাছে লোকে মন্দ বলে। কিন্তু যে ভালোবাসার নামে মন প্রতারিত তার দায় তো বহুগামিতার শিকার মানুষের নয়। অবশ্য এমন অসম্মান সমঝোতার আড়ালে সততার বহিঃপ্রকাশ বলে দাবি বহুগামীর।

ভালো থাকার খোলসে লুকিয়ে থেকে প্রতি মুহূর্তে সহিংসতার শিকার হয় বহুগামীর সঙ্গী। শরীরের আঘাত দৃশ্যমান বলে তা নিয়ে গণমাধ্যমে, সুশীল সমাজে হাজারো তোলপাড়, আলোড়ন; উচ্চারিত হয় কঠিন বাক্য। সবাইকে সচেতন করার আপ্রাণ চেষ্টায় নিয়োজিত থাকে প্রতিবাদ। কিন্তু আমার প্রশ্ন সুশীল সমাজের কাছে, বহুগামিতার মানসিক নির্যাতনের খবর কি আমরা জানি? দামি পোশাক, সাজসজ্জা আর অর্জিত ভারী পদবির আড়ালে নিষ্ঠুরতার শিকার মানুষ কেমন করে যুদ্ধ করে; নিজেকে টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে?

অধিকাংশ মানুষ শুধুই একজনের হতে চায়,পরিপূর্ণ ভালোবাসা চায়। অংশীদারিত্ব কিংবা ছায়ার আবরণ মানব মনে ভালোবাসার মৃত্যুর কারণ। বহুগামী ভালোবাসার নামে বিভাজিত নষ্টামিতে প্রতিনিয়ত ক্ষয় হচ্ছে মেধা। অভিশপ্ত হচ্ছে বিশ্বাস আর ক্ষয় হচ্ছে মূল্যবোধ। সবাইকে ভালো রাখার দায় আপনার একার নয় আবার প্রতিনিয়ত মানসিকভাবে রক্তাক্ত করবেন সেই অধিকারও আপনার নয়। জীবনটা হয়তো উপভোগ করছেন কিছু আবেগ ভোগের মাধ্যমে। অথচ খণ্ডিত ভালোবাসার নোংরামিতে নিঃস্ব হচ্ছেন প্রতি মুহূর্তে যার দায়ভার একা আপনার। এক জীবনে কারও সুখের কারণ হওয়াটা যেমন অর্জন ঠিক তেমনি কারো সর্বনাশের কারণ হওয়াটা অভিশাপ। বহুগামী ব্যাধি মূল্যবোধের অবক্ষয় যার প্রভাবে সমাজ কলুষিত। বহুগামিতা অন্যায় আর বহুগামিতা প্রশ্রয় দেয়া অপরাধ, সিদ্ধান্ত একান্ত আপনার কিন্তু তার প্রভাবে সমাজ সংক্রমিত।

শেষের কথা বলি, মনের ওপর জোর দিয়ে কাউকে ‘ভালোবাসি’ না বলে মনকে স্থির করে সত্যি যাকে ভালোবাসেন তাকে প্রতিশ্রুতি দিন আর বাকি সবাইকে অপেক্ষার দায় থেকে মুক্তি দিন। তাতে আপনি যেমন খুঁজে পাবেন শান্তির ঠিকানা, জীবন্ত লাশ হয়ে যাওয়া মৃত মানুষগুলো ফিরে পাবে প্রাণ। এই আয়োজনই হতে পারে আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দায়হীন পথচলার আপনার দেয়া দায়িত্বপূর্ণ উপহার।

 এইচআর/এএসএম

মনের ওপর জোর দিয়ে কাউকে "ভালোবাসি" না বলে মনকে স্থির করে সত্যি যাকে ভালোবাসেন তাকে প্রতিশ্রুতি দিন আর বাকি সবাইকে অপেক্ষার দায় থেকে মুক্তি দিন। তাতে আপনি যেমন খুঁজে পাবেন শান্তির ঠিকানা, জীবন্ত লাশ হয়ে যাওয়া মৃত মানুষগুলো ফিরে পাবে প্রাণ।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]