গণরায়, আকাশপথের রাজনীতি এবং ম্যানচেস্টার–সিলেট ফ্লাইট
নির্বাচন ঘিরে শঙ্কা ছিল প্রবল। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন—আসলে কি ভোট হবে? হলেও তা কতটা গ্রহণযোগ্য হবে? কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শেষ পর্যন্ত নির্বাচন আয়োজন করে এবং ফল ঘোষণার পর যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, তা হলো—বড় কোনো রাজনৈতিক দলই ভোটের নিরপেক্ষতা নিয়ে আনুষ্ঠানিক আপত্তি তোলেনি। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। সহিংসতা হয়নি, বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেনি।
নির্বাচন-ফল ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রত্যাশিত ফল পেয়েছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসনে জয় নিশ্চিত করেছে এবং তাদের জোটসঙ্গী হিসেবে এনসিপির ৬ জন নেতা সংসদে প্রবেশ করেছেন। বিশ্লেষকদের একাংশের পূর্বাভাস ছিল—জোটটি ৫৫–৬০ আসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। বাস্তবে তারা সে সীমা অতিক্রম করেছে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” বা আন্তর্জাতিক প্রভাবের নানা আশঙ্কা উচ্চারিত হয়েছিল। কিন্তু ফলাফল ও অংশগ্রহণের চিত্র বলছে—ভোটার উপস্থিতি এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা সেই আশঙ্কাকে অন্তত এই মুহূর্তে দুর্বল করেছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, বিজয়ী ও পরাজিত—উভয় পক্ষই নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হতে পারে।
সিলেট বিভাগে ১৯টি আসনের মধ্যে ১৮টিতে বিএনপির জয় রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সিলেটকে ঐতিহাসিকভাবে শাহজালালের পুণ্যভূমি বলা হয়। ধর্মীয় ঐতিহ্য এখানে সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এবারের ভোটে দেখা গেছে—ধর্মীয় আবেগ নয়, বরং রাজনৈতিক আস্থা ও ক্ষমতার বিকল্প কাঠামো নির্মাণই ছিল ভোটারদের বড় বিবেচ্য বিষয়।
এটি স্পষ্ট যে, বিএনপির পক্ষে শুধু দলীয় ভোট নয়—অন্যান্য দলের সমর্থকদের ভোটও পড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। গোপালগঞ্জের মতো একটি প্রতীকী ও রাজনৈতিকভাবে আলোচিত জায়গায়ও বিএনপির সাফল্য বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। ফলে জাতীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য নতুন করে নির্ধারিত হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ১৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করবে এবং দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারেন। তাঁর নেতৃত্বে নতুন সরকারের সামনে থাকবে অর্থনীতি, কূটনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কঠিন চ্যালেঞ্জ।
এই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই সামনে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু—ম্যানচেস্টার–সিলেট ফ্লাইট। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে—আগামী মার্চ থেকে ম্যানচেস্টার–সিলেট রুট বন্ধ করা হবে। প্রশ্ন হচ্ছে: কেন?
১. রুটটি কি অলাভজনক?
সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া পরিসংখ্যান বলছে—রুটটি ধারাবাহিকভাবে ক্ষতি কমিয়ে ব্রেক-ইভেন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছিল। একটু পেছনে তাকালে দেখা যায়, ২০২০–২১ অর্থবছরে ক্ষতি ছিল ৮৩ কোটির বেশি। পরের বছরে তা কমে প্রায় ৪০ কোটিতে নেমে আসে। তৃতীয় বছরে ক্ষতি ২০ কোটির নিচে নেমে যায়।
আরও যুক্তিসঙ্গত কারণেই স্থগিত থাকা ফ্লাইট গত আগস্টে প্রবাসীদের আন্দোলনের মুখে পুনরায় চালু হলে, প্রথম মাসেই প্রায় এক কোটি টাকা মুনাফা হয় বলে জানা যায়। এরপর মাসভিত্তিক আয় বাড়ছিল। স্বাভাবিকভাবেই কোনো আন্তর্জাতিক রুট সব মাসে সমান লাভজনক হয় না—কিন্তু দ্রুত ক্ষতি কমে আসা একটি রুট বন্ধের সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিকভাবে কতটা যৌক্তিক, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনি পর্ব অতিক্রম করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করে বিদায় নিচ্ছে—এটি তাদের ঐতিহাসিক অর্জন। এখন দায়িত্ব নতুন সরকারের—অর্থনীতি ও প্রশাসনের পাশাপাশি প্রবাস-সম্পর্ককে কৌশলগত গুরুত্ব দেওয়া। ম্যানচেস্টার–সিলেট ফ্লাইট ইস্যু তাই কেবল আঞ্চলিক দাবি নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও বৈশ্বিক বাংলাদেশ গঠনের প্রশ্ন।
বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থাগুলো কৌশলগত কারণে কিছু অলাভজনক রুট চালু রাখে—কূটনৈতিক, প্রবাসসংযোগ বা বাজার সম্প্রসারণের স্বার্থে। বিমানের ক্ষেত্রেও অন্তত ১৪টি অলাভজনক রুট সচল রয়েছে বলে জানা যায়। তাহলে তুলনামূলকভাবে উন্নতির পথে থাকা ম্যানচেস্টার–সিলেট কেন বন্ধ হবে?
২. প্রবাসনীতি ও উত্তর ইংল্যান্ডের বাস্তবতা
ম্যানচেস্টার ও সমগ্র নর্থ ইংল্যান্ডে বৃহৎ সিলেটি-বাংলাদেশি কমিউনিটি বসবাস করে। তাদের জন্য সরাসরি সিলেট ফ্লাইট শুধু ভ্রমণ-সুবিধা নয়—এটি অর্থনৈতিক সংযোগ, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও পারিবারিক বন্ধনের সেতু।
প্রবাসীরা ইতোমধ্যে জনসংযোগ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু করেছেন। প্রশ্ন তুলেছেন—নতুন সরকার গঠনের ঠিক আগে কেন এই সিদ্ধান্ত এত জরুরি হয়ে উঠল?
৩. নীতিগত সামঞ্জস্যের প্রশ্ন
সম্প্রতি করাচির সঙ্গে ঢাকা রুট চালু করা হয়েছে। যদি নতুন বাজার সম্প্রসারণ কৌশলের অংশ হিসেবে তা হয়ে থাকে, তবে একই সময়ে একটি স্থিতিশীল প্রবাসভিত্তিক রুট বন্ধের যুক্তি কী? বাণিজ্যিক, নাকি রাজনৈতিক অগ্রাধিকার—কোনটি এখানে প্রাধান্য পেয়েছে?
এই ইস্যুটি কেবল একটি বিমান রুটের প্রশ্ন নয়; এটি প্রবাসনীতি, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার পরীক্ষাও বটে। জনাব তারেক রহমান নিজে দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে বসবাস করেছেন এবং নিজেকে ‘হাফ সিলেটি’ বলে পরিচয় দিয়েছেন। ফলে উত্তর ইংল্যান্ডের বাংলাদেশি কমিউনিটির আবেগ, অর্থনৈতিক অবদান ও রাজনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে তাঁর ধারণা না থাকার কথা নয়। তিনি ইংল্যান্ডের সিলেটি তথা বাংলাদেশি কমিউনিটির বাস্তবতাও ভালো করেই জানেন।
তাই আবারও জোর দিয়ে বলা যায়, ম্যানচেস্টার–সিলেট রুট চালু রাখা মানে প্রবাসীদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক জোরদার করা, রেমিট্যান্স-নির্ভর অর্থনীতিকে সহায়তা করা এবং রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থাকে বাজারভিত্তিক দক্ষতায় পরিচালনার বার্তা দেওয়া। রুটটি বন্ধ করা হলে তা শুধু একটি ফ্লাইট বাতিল নয়—বরং নতুন সরকারের প্রবাস-সংবেদনশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।
বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনি পর্ব অতিক্রম করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করে বিদায় নিচ্ছে—এটি তাদের ঐতিহাসিক অর্জন। এখন দায়িত্ব নতুন সরকারের—অর্থনীতি ও প্রশাসনের পাশাপাশি প্রবাস-সম্পর্ককে কৌশলগত গুরুত্ব দেওয়া। ম্যানচেস্টার–সিলেট ফ্লাইট ইস্যু তাই কেবল আঞ্চলিক দাবি নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও বৈশ্বিক বাংলাদেশ গঠনের প্রশ্ন। নতুন সরকার যদি এই রুট সচল রাখে, তবে সেটি হবে অর্থনৈতিক যুক্তি ও প্রবাস-সম্মানের পক্ষে এক সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা।
লেখক : বৃটেনপ্রবাসী কলামিস্ট।
এইচআর/এমএস