জাদুকর বাবা!

তুষার আবদুল্লাহ তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত: ০১:২৮ পিএম, ২০ জুন ২০২১

স্কুলে যাওয়ার পথে যানজট। সিগন্যালে মিনিটের পর মিনিট পার হচ্ছে। স্কুলের গেইট বন্ধ হতে আর বাকি নেই বেশি। কিন্তু লালবাতি সবুজ হচ্ছেই না। মেয়ের মনে হলো, বাবাকে একটা ফোন দেই। বাবা বললেই, সিগন্যাল সবুজ হয়ে যাবে।

কোথায় যেন মারামারি ভাঙচুর হয়েছে। স্কুল থেকে বেরিয়ে দেখে রাস্তাঘাট বন্ধ । গাড়ি- রিকশা কিছুই চলছে না। সবকিছু আটকে আছে। কি হয়েছে, কখন আবার পথ ঘাট স্বাভাবিক হবে কেউ বলতে পারছে না কিছুই । মেয়ে ভাবলো, বাবাকে একটা ফোন দেই। বাবা সবকিছু স্বাভাবিক করে দেবে। পরীক্ষা চলে এসেছে । কিন্তু সিলেবাস শেষ হয়নি। পরীক্ষা একটু পিছিয়ে দেওয়া যায় না, কিভাবে সম্ভব? সব সম্ভব হবে, যদি বাবাকে বলা যায়। বাবা একটা হরতাল ডেকে দেবে।

রোদে পুড়তে পুড়তে বাড়ি ফেরা। কিন্তু বৈশাখের বিকেলেও মেয়ের আষাঢ়ের মতো ভিজে বাড়ি ফেরার ইচ্ছে হয়। কিন্তু গ্রীষ্মের তাতানো রোদে মেঘ উড়িয়ে আনবে কে? অবশ্যই বাবা।

কন্যার কাছে বাবাই সকল ক্ষমতার উৎস। বাবাই জগত সেরা জাদুকর। কন্যার কথা কেন বলে যাচ্ছি এভাবে, পুত্রও কি এই ভাবনার বাইরে যেতে পেরেছে? মোটেও না। তার মাছ ধরার ইচ্ছে হলো। বড়শী চাই । বড়শী এলো। লেকে ফেলা বড়শীতে তার ইলিশ মাছ চাই। একমাত্র বাবাই পারবে লেকে ইলিশ মাছ এনে দিতে।

একালে বাবা এবং মা দুজনেই রোজগার করেন। কাজের জন্য বাইরে যান। আমাদের শৈশব-কৈশোরে বাবারাই রোজগারে ছিলেন বেশি। তাই আবদার সরাসরি হয়তো বাবা’র কাছে করা হয়নি, করেছি মায়ের কাছে। কিন্তু আবদার পূরণের উৎস ছিলেন বাবাই। অফিস ফেরত বাবা’র জন্য জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা, দূর থেকে বাবার পরিশ্রান্ত মুখটি দেখতে পেলে প্রশান্তিতে ভরে যেত। বাবা না ফেরা পর্যন্ত কখনই খেতে বসা হতো না ।বাবা’র বিষণ্ণতা , উৎফুল্ল হবার সঙ্গে পরিবারের আবহাওয়ার অদল-বদল ঘটতো । নিজে কতোটুকু ভোগ উপভোগ করলেন, সেই হিসাব বাবা করেননি কখনও। আমাদের হাসিই ছিল প্রশান্ত জলাশয়।

আমার বন্ধুদের কারো কারো বাবা ছিলেন না। ওদের ছোট রেখেই, বাবা চলে গেছেন। দেখেছি ওদের মাকে বাবার রূপে বদলে যেতে। কারো দাদা, চাচা, মামাও আর্বিভূত হয়েছেন বাবাতে। বাবা শুধু সন্তানের জন্মদাতা নন। বাবা হচ্ছেন- পথের, ময়দানের ছায়া বৃক্ষ। এই বৃক্ষ শুধু পরিবারে নয়- কাজের জায়গায়, সমাজ, রাষ্ট্রে প্রয়োজন। সন্তানের বিপন্নতায় তাকে বুকে জড়িয়ে রাখবে। সকল বিপদের প্রতিরোধক হবেন বাবা ।

এমন বাবা আছেন জগত জোড়া, একথা যদি বলি- তবে সেটা আবেগের প্রলাপ হবে। আজ অবয়বপত্র হয়তো বাবাদের প্রতি সন্তানদের ভালোবাসা জলোচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে। বাবাদের দায়িত্বশীলতা ও ভালোবাসার তপোধ্বনি হচ্ছে। কিন্তু এমন অনেক বাবা’র কথা জানি যারা পরিবার ও সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল নন। সন্তানরা তাদের জীবনের সংকটের সময়ে বাবাকে কাছে পান না। সন্তানের ভুল সংশোধন করতে এগিয়ে আসেন না বাবা। তার প্রমাণতো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। সন্তানেরা কিশোর গ্যাং তৈরি করছে , হারিয়ে যাচ্ছে মাদকের নীলে। বাবা তার অবৈধ আয়ে ভোগে বেসামাল করে তুলছে সন্তানকে।

সন্তানের কাছে বাবা বিস্ময়, ইচ্ছে পূরণের দৈত্য কিংবা স্বর্গ হয়েই থাকবেন। বাবার যে কোন বিপন্ন সময়ে সন্তানই চিৎকার করে বলবে- আব্বু তুমি কানতাছো যে? কন্যার সঙ্গে, পুত্রের সঙ্গে আমারও আড়ি- ভাব চলে। খুব সচেতন আমি, আবেগে সংযমী এমন সোচ্চার দাবি করতে পারবো না । তবে খেয়াল রাখি আমার দুই হাতের দুই আঙুল থেকে যেন- পুত্র আমার , কন্যা আমার খসে না পড়ে ।

আমার সন্তান যেন সারা জীবন জেনে যায়- ওর জন্য আমি সব অসম্ভবকে সম্ভব করার ক্ষমতা রাখি। অবশ্যই সেই অসম্ভবের নাম সুন্দর!

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।

এইচআর/জিকেএস

আমার সন্তান যেন সারা জীবন জেনে যায়- ওর জন্য আমি সব অসম্ভবকে সম্ভব করার ক্ষমতা রাখি। অবশ্যই সেই অসম্ভবের নাম সুন্দর!

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]