সন্তানেরা রাজপথে অভিভাবকরা কি বেহুঁশই থাকবে

মোস্তফা হোসেইন
মোস্তফা হোসেইন মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত: ১২:৩৬ পিএম, ২৮ নভেম্বর ২০২১

আমাদের কোমলমতি সন্তানেরা রাজপথে নেমেছে আবার। তিন বছর আগেও নিরাপদ সড়কের দাবি নিয়ে আন্দোলন করেছিলো এই শিক্ষার্থীরা। তারা কোনো রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি করেনি। বরং কিছু অপরাজনীতিবিদ তাদের ব্যবহারে চেষ্টা করেছিল তখন।

গতসপ্তাহে নটরডেম কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থী নাঈম হাসানের মৃত্যুর পর আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে রাজপথে নেমে এসেছে। এবার এমন সময় তারা স্কুল কলেজের বাইরে এসেছে, যখন তাদের মাথার উপর প্রায় দুই বছরের শিক্ষার ক্ষতির বোঝা। তাদের সেই ক্ষতি পোষানোর জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করার কোনো মুখ কি আমাদের আছে?

তিনবছরে আমরা নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে পারিনি। রাজনৈতিক সরকার,রাজনৈতিক দল কিংবা অভিভাবকমহল আমরা কেউ কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবো যে আমরা এই শিশুকিশোরদের ন্যায্য দাবি পূরণে আন্তরিকতার প্রমাণ দিতে পেরেছি? জবাবটা অত্যন্ত সোজা। আমরা পারিনি।

একই দাবি নিয়ে যখন শিক্ষার্থীরা আবার রাজপথে নেমেছে- এবং তারা যখন গত বুধবার থেকে রাজপথে চিৎকার করছে, তখনও কি দায়িত্বশীল কারো টনক নড়েছে? জবাব খুঁজতে গিয়ে দেখতে পাবো ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার তাপস সাহেব তাদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। যা একদিক দিয়ে ইতিবাচক আবার অনেক প্রশ্নেরও জন্ম দিতে পারে। তিনি এমন সময় দাবির প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করলেন, যখন অভিযোগের তীরটা তার দিকেও তাক করা। এই নিবন্ধ লেখার সময় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের তৃতীয়দিন চলছে। এই সময় পর্যন্ত দায়িত্বশীল কোনো কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের দাবি সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো কথা বলেনি।

শুধু বাস মালিকদের প্রতিক্রিয়া জানাতে শোনা গেছে, তারা বাসের চাকা বন্ধ করে দেবে তবুও শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী ভাড়ায় কোনো ছাড় দিতে পারবে না। অন্যদিকে তারা সুস্পষ্টভাবে চেপে গেছে নিরাপদ সড়কের দাবির বিষয়টি। নিরাপদ সড়কের নিশ্চয়তা দিতে হলে সরকারি আরো সংস্থার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, তাদেরও কাউকেই পাওয়া যায়নি। বুঝতে পারছি না,শিক্ষার্থীদের রাজপথে নেমে আসাকে তারা কোন দৃষ্টিতে দেখছেন। ২০১৮ সালে কিভাবে সারাদেশে তাদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিলো সেই স্মৃতি নিশ্চয়ই তারা ভুলে যাননি। ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটার পরও কি তারা বুঝতে পারছেন না দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যেতে পারে এই ইসুকে কেন্দ্র করে?

তারা যেসব দাবি করছে, তা কি অযৌক্তিক? তাদের দাবিগুলোর সঙ্গে কি সবশ্রেণি পেশার সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিশেষ করে নিরাপত্তা জড়িত নয়? তাদের প্রথম দাবি, নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসানসহ সড়কে দুর্ঘটনায় যারা মৃত্যু বরণ করেছেন তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তারা কিন্তু নাঈমের বাবা-মাকে সন্তান ফিরিয়ে দিয়ে ক্ষতিপূরণ করার কথা বলেনি। এটা সম্ভবও নয়। তার মানে হচ্ছে,সড়ক দুর্ঘটনায় যে ক্ষতি হয়, তার সামান্য অংশ পূরণ করার দাবি তারা করেছে। নাঈমের বাবা প্রতিদিন ৭ কিলোমিটার হেঁটে বাসায় আসা যাওয়া করতেন ছেলের পকেট খরচ জোগাতে। ওই বাবার আশা-ভরসার স্থল ধ্বংস করে দিয়েছে সিটি কর্পোরেশনের একজন অবৈধ গাড়ি চালক। যে নাকি তার দায়িত্বের বাইরে গিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলো। হয়তো গাড়ি চালক অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলো বলে। হয়তো তাকেই সিটি কর্পোরেশন এই কাজে নিয়োজিত করেছিলো।

তেল চুরির পেশায় নিয়োজিত বলে যে খবর হয়েছে তাকে কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী এই ঘটনার নায়ক সিটি কর্পোরেশনের কোনো কর্মচারীই নয়। অবৈধভাবে সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি চালাতো সে। কোনো বেতনভাতাও সিটি কর্পোরেশন থেকে সে নিতো না। দিনশেষে গাড়ি থেকে ১৬/১৭ লিটার তেল সরিয়ে বিক্রি করতো। আর পয়সাটা পকেটে ঢুকিয়ে নিতো। এমতাবস্থায় এই হত্যাকাণ্ডের দায় সিটি কর্পোরেশন এড়াতে পারে কিভাবে?

সুতরাং আমরা অন্তত এটুকু প্রত্যাশা করতে পারি, যেভাবে মাননীয় মেয়র শিক্ষার্থীদের আবেগের সঙ্গে সুর মিলিয়ে তাদের স্বান্ত্বনা দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নের জন্য অতি দ্রুত নাঈম হাসানের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দানের ঘোষণাটা দেবেন। তিনি শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণাকালে বলেছেন, তিনিও খুনীর ফাঁশি চান। অবশ্যই তাঁর এই বক্তব্য প্রশংসনীয়। তিনি যদি একইসঙ্গে সিটি কর্পোরেশনের পরিবহন বিভাগের অসঙ্গতিগুলো দূর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং তা প্রকাশ করেন তাহলে অন্তত রাজপথের শিক্ষার্থীরা কিছুটা হলেও আশ্বস্ত হবে। যদিও নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশনের করণীয় সমগ্র ব্যবস্থাপনার একটি অংশমাত্র। তারপরও এই মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রসমনে সহযোগিতা করবে বলে মনে করা যায়।

সিটি কর্পোরেশনে যে পরিবহন ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত নাজুক তা বোঝা যায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ময়লা গাড়ির আরেকটি দুর্ঘটনার পর। নাঈম হাসানের মৃত্যুর পরদিন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আরেকটি ময়লার গাড়ি পান্থপথে চাপা দিয়ে সংবাদকর্মী আহসান কবীর খানকে হত্যা করে। প্রকাশিত সংবাদে জানা যায় ২৬ নভেম্বর উক্ত গাড়ির চালক মোহাম্মদ হানিফকে র্যাব চাঁদপুর থেকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।এই হানিফ সিটি কর্পোরেশনের কোনো কর্মচারীই নয়। পরিবহন বিভাগের সহযোগিতায় সে তেল চুরি করে বিক্রি করতো। আর এটাই ছিলো তার উপার্জন। যেহেতু দুই সিটি কর্পোরেশনেই একইরকম অস্বাভাবিক ও অনৈতিক কাজ হচ্ছে, তাই ধারণা করা যায়, তেলচুরির এই অভ্যাসটা অনেক পুরনো। হয়তো একিভুত সিটি কর্পোরেশন থাকাকালেও চলতো। এখন দুইভাগে ভাগ হয়ে গেছে। অথচ আমাদের শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির মধ্যে গাড়ির কর্মচারীদেরও যদি কেউ আহত হয়, তার ক্ষতিপূরনের কথাও বলা হয়েছে।

তারা দাবি করেছে, যানবাহনে শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়ায় যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হবে। ইতোমধ্যে বি আরটিসিতে অর্ধেক ভাড়ায় শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের বিষয়টি নীতিগতভাবে মেনে নেয়া হয়েছে। কিন্তু বেসরকারি পরিবহন মালিকরা হুমকি দিয়েছে, তারা বাস বন্ধ করে দিতে পারে। শিক্ষার্থীরা সুনির্দিষ্টভাবে বাস মালিকদের দোষারোপ করেনি। তাদের ব্যবসায় বন্ধের করে দেওয়ার মতো নেতিবাচক কিছু বলেনি। বাস মালিকদের অবহেলা এবং লোভের কারণে যে মানুষ মারা যাচ্ছে তার একটা সুরাহা করার দাবি জানিয়েছে তারা।

একজন নাগরিক হিসেবে আমিও মনে করি বাস মালিকদের অবহেলা এবং লোভের কারণেই রাস্তায মানুষ মৃত্যুর হার এত ব্যাপকতর এখনও। ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানোর প্রসঙ্গটি আসে, এর জন্য আবার শুধু বাস মালিক নয় সরকারি কিছু সংস্থারও দায় আছে। শুধু ঢাকা শহরে একাধিক রুট আছে যেখানে ফিটনেস আছে এমন গাড়ি হাতেগোণা মাত্র। লক্কর মার্কা গাড়িগুলো দিনের আলোর মতোই স্বচ্ছ। বি আরটিএ কিংবা সংশ্লিষ্টগণ এগুলোকে রাস্তায় চলাচলে অনুমতি দিয়ে একই অন্যায় করছে। সুতরাং গাড়ির চাকায় পিষ্ট করে মানুষ হত্যার দায় তাদেরও আছে।

শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে একটিতে স্পষ্টভাবে বিআরটিএ-র কথা বলা হয়েছে। তাদের দুর্নীতি অদক্ষতা এবং লোভ পরিবহন খাতকে নরকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এমন সংবাদ তো প্রায় নিয়মিত প্রকাশ হয়। বাস্তবতা হচ্ছে তাদের কানে গুঁজে রাখা তুলো আর সরে না। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন ও পরিবহনকর্মীদের প্রশিক্ষণের কথাও তারা বলেছে। এগুলো তো প্রতিটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। দায়িত্ব পালনে অবহেলা কিংবা দুর্নীতি প্রতিরোধের আন্দোলন যখন রাজপথও কাঁপায় তখনও কি তাদের দৃষ্টি পড়বে না। নাকি তারা চায় দেশটা আবার অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাক।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

এইচআর/জেআইএম

বাস্তবতা হচ্ছে তাদের কানে গুঁজে রাখা তুলো আর সরে না। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন ও পরিবহনকর্মীদের প্রশিক্ষণের কথাও তারা বলেছে। এগুলো তো প্রতিটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। দায়িত্ব পালনে অবহেলা কিংবা দুর্নীতি প্রতিরোধের আন্দোলন যখন রাজপথও কাঁপায় তখনও কি তাদের দৃষ্টি পড়বে না। নাকি তারা চায় দেশটা আবার অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাক।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]