মাদ্রাসা কৃষি শিক্ষকদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ
বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালার কিছু অসংগতি স্নাতক কৃষি শিক্ষকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে, মাধ্যমিক স্কুল এবং মাদ্রাসার (দাখিল) স্নাতক ডিগ্রিধারী কৃষি শিক্ষকদের বেতন স্কেল ও গ্রেডের ক্ষেত্রে যে অযৌক্তিক বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে, তাকে শিক্ষক সমাজ 'বিমাতাসুলভ আচরণ' হিসেবে দেখছেন।
সর্বশেষ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৬ অনুযায়ী, সহকারী শিক্ষক (কৃষি) পদে স্নাতকধারীদের বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হয়েছে ১১তম গ্রেডে (১২,৫০০-৩০,২৩০ টাকা)। অথচ সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা (কৃষি) পাচ্ছেন ১০ম গ্রেড (১৬,০০০-৩৮,৬৪০ টাকা)। একই পাঠ্যক্রম এবং একই জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুসরণ করেও মাদ্রাসার শিক্ষকরা আর্থিক ও সামাজিকভাবে কেন নিচে থাকবেন, সে প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাদ্রাসার কৃষি শিক্ষকদের বঞ্চনার এই চিত্র অত্যন্ত পরিকল্পিত ও নিবিড়। দীর্ঘদিন ধরে তাদের সাথে ইঁদুর-বিড়াল টাইপের খেলা হচ্ছে।
২০১৮সালের ১৯ জুলাই প্রণীত মাদ্রাসা জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা "ঘ" এর ক্রমিক ২৬ অনুযায়ী বিএডসহ বিএসসি পাস/সম্মান সহকারী শিক্ষক (কৃষি)দের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বেতন স্কেল ও গ্রেড ছিল ১০ম অর্থাৎ ১৬০০০-৩৮৬৪০ টাকা। কিন্তু পরবর্তীতে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো: আলমগীরের ৩১ মার্চ ২০১৯ তারিখের পরিপত্রে "বিএড ডিগ্রি আবশ্যকতা নেই" মর্মে সংশোধনী জারি করা হয়।আশ্চর্য্যভাবে লক্ষ্য করা যায়, মাদ্রাসার উক্ত ২০১৮ সালের নীতিমালায়,যা ২৩ নভেম্বর ২০২০ পর্যন্ত সংশোধিত, তাতে স্নাতকদের জন্য পুনরায় "বিএড ডিগ্রি" সন্নিবেশিত করে ১০ম গ্রেড রাখা হয়।
অপরদিকে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮ (ভোকেশনাল,বিএম,কৃষি ডিপ্লোমা ও মৎস্য ডিপ্লোমা,২৩ নভেম্বর ২০২০ পর্যন্ত সংশোধিত)- এর পরিশিষ্ট "ঘ" ২৬ ক্রমিকে বিএসসি ইন কৃষি শিক্ষকদের বেতন ১০ম গ্রেডেই বহাল আছে। সেখানে ৩ বা ৪ বছর মেয়াদি কৃষি ডিপ্লোমাধারিদের ক্ষেত্রে ১১৩ম গ্রেড উল্লেখ আছে।
আশ্চর্যজনকভাবে লক্ষ্য করা যায়,কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের স্বাক্ষরিত ৪ ডিসেম্বর ২০২৫-এর এক রহস্যজনক পরিপত্রে পুনরায় সংশোধনের মাধ্যমে "পরিশিষ্ট ঘ" এ উল্লিখিত সাধারণ পদসমূহে নিয়োগ সুপারিশের জন্য কাম্য শিক্ষাগত যোগ্যতা সমতাকরণের" অজুহাতে মাদ্রাসার স্নাতক সহকারী কৃষি শিক্ষকদের অবদমন করে,মান ক্ষুণ্ণ করে ১১তম গ্রেডে অর্থাৎ ১২৫০০-৩০২৩০ এ নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
একজন ১০ম গ্রেডধারী শিক্ষক যেখানে ১৬,০০০ টাকা মূল বেতনে চাকরি শুরু করেন, সেখানে ১১তম গ্রেডধারী শিক্ষকের শুরু হয় ১২,৫০০ টাকায়। পদোন্নতি এবং বাৎসরিক ইনক্রিমেন্টের হিসাবে এই ব্যবধান সময়ের সাথে সাথে লক্ষ লক্ষ টাকায় দাঁড়ায়। একই সিলেবাস পড়িয়ে এবং একই রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে কেন একদল শিক্ষককে দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়।
যেখানে সরকার শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করার কথা বলছে, সেখানে মাদ্রাসার ২০২৬ সালের নতুন নীতিমালায় এ ধরনের বৈষম্যমূলক ধারা যুক্ত হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। এটি কেবল শিক্ষকদের পেশাগত মানকেই ক্ষুণ্ণ করছে না, বরং কৃষি শিক্ষার প্রতি মেধাবীদের অনাগ্রহ তৈরি করছে। সর্বোপরি, রাষ্ট্র নিজেই নিজের শিক্ষা দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থানে দাঁড়াচ্ছে।যে দেশে কৃষিকে বলা হয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড, সেই দেশে কৃষি শিক্ষকদের এই অবস্থা রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। যেখানে সরকার শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করার কথা বলছে, সেখানে মাদ্রাসার ২০২৬ সালের নতুন নীতিমালায় এ ধরনের বৈষম্যমূলক ধারা যুক্ত হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। এটি কেবল শিক্ষকদের পেশাগত মানকেই ক্ষুণ্ণ করছে না, বরং কৃষি শিক্ষার প্রতি মেধাবীদের অনাগ্রহ তৈরি করছে। সর্বোপরি, রাষ্ট্র নিজেই নিজের শিক্ষা দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থানে দাঁড়াচ্ছে।যে দেশে কৃষিকে বলা হয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড, সেই দেশে কৃষি শিক্ষকদের এই অবস্থা রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক।
মাদ্রাসার স্নাতক কৃষি শিক্ষকদের এই চরম বঞ্চনা নিরসনে অতি দ্রুত নীতিমালার সংশোধনী প্রয়োজন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের উচিত বৈষম্যমূলক ৪ ডিসেম্বরের পরিপত্র পুনর্বিবেচনা করে সকল স্নাতক কৃষি শিক্ষকের জন্য সমমর্যাদা ও ১০ম গ্রেড নিশ্চিত করা। অন্যথায়, এই অসন্তোষ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সুষম বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সাবেক সভাপতি, রাজশাহী প্রেসক্লাব।
[email protected]
এইচআর/জেআইএম