কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট
১ জুন থেকে শুরু হচ্ছে বাজেট অধিবেশন। এই অধিবেশনেই পাশ হবে ২০১৫-২০১৬ এর জাতীয় বাজেট। কেমন হবে এই বাজেট? কেমন বরাদ্দ থাকবে কৃষিখাতে? কেমন প্রত্যাশা দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের? এনিয়ে ‘কৃষি বাজেট, কৃষকের বাজেট’ প্রস্তাবনায় ওঠে এসেছে কৃষকদের প্রস্তাব, দাবি ও চাহিদার কথা। এসব নিয়েই জাগো নিউজে লিখেছেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ। সাত পর্বের ধারাবাহিক লেখায় আজ থাকছে প্রথম পর্ব।
এ বছর একাদশবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো তৃণমূল পর্যায়ে প্রাক বাজেট আলোচনা, কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট। দেশের তিনটি স্থানে যথাক্রমে পঞ্চগড়, টাঙ্গাইল ও খুলনা জেলায় প্রত্যন্ত এলাকার কৃষকদের সঙ্গে খোলা প্রাঙ্গণে কৃষির বর্তমান সমস্যা, সংকট, প্রত্যাশা, দাবি ও চাহিদা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
আলোচনাগুলোতে প্রতিবারের মতোই এবারও সরকারের মন্ত্রী পরিষদের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া স্ব স্ব জেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কৃষি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিকও উপস্থিত ছিলেন। দিনের পর দিন কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট কার্যক্রমটি কৃষক ও খামারিদের অনেক বেশি আগ্রহ কাঁড়ছে। যে কারণে, অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়েও দূর দূরান্তের কৃষক-কৃষাণী একত্র হয়ে তাদের সমস্যার কথাগুলো অকপটে তুলে ধরেন। তারা বিশ্বাস করছেন, সরকারের কাছে কৃষকের কণ্ঠস্বর পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এই কার্যক্রমটি তাদের কাছে অনেক বেশি কার্যকর।
প্রতি বছর জাতীয় বাজেটের বেশ আগেই চ্যানেল আই-এর হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানের পক্ষ থেকে এই প্রাক বাজেট আলোচনার প্রস্তুতি শুরু হয়। সাধারণত মার্চ মাস থেকে শুরু হয়ে যায় আলোচনা। এবার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, টানা অবরোধ-হরতালের কারণে কার্যক্রমটি দুই মাস পিছিয়ে যায়। এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে গিয়ে শুরু করা সম্ভব হয় এবারের কৃষি বাজেট, কৃষকের বাজেট। মাঠে তখন রবি ফসলের প্রাচুর্য, এমনকি আমন ফসল যখন কোনও কোনও এলাকায় তখনও কাটা চলছে, দেশের অনেক এলাকায় শুরু হয়েছে বোরো রোপন। কোথাও প্রস্তুতি চলছে।
ফসলের বহুমুখি বৈচিত্র্যের ভেতর কৃষকের সমস্যা, সংকটগুলো আরো নিবিড়ভাবে হিসেবের মধ্যে আনার স্বার্থেই সময়টি বেছে নেয়া হয়। তবে একথা অবশ্যই বলতে হবে যে, কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট চ্যানেল আই এর হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানের উদ্যোগে মোটামুটি তিন মাসব্যাপী একটি আয়োজন হলেও এ কার্যক্রমকে অর্থবহ করতে এবং জাতীয় বাজেটে সরকারের বিবেচনায় আনার জন্য সারা বছরই আমরা কৃষকের বিভিন্ন সংকট, সমস্যা ও সম্ভাবনা বিষয়ে অনুসন্ধান, মাঠ পর্যায়ে এক ধরনের জরিপ পরিচালনা ও তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রাখি। যার ভেতর দিয়ে কৃষি, ফসল উৎপাদন তথা গ্রামীণ জীবন ও পরিবেশের বিভিন্ন তথ্য ও প্রবণতা আমাদের চোখে ধরা পড়ে। যেগুলোর কিছু অংশ আমি তুলে ধরছি।
ক. ঋণগ্রস্ত কৃষক আছেন মহা সংকটে
গত এক দশকে দেশে উচ্চমূল্যের ফল ফসল উৎপাদন, বাজারজাতকরণের মধ্য দিয়ে পুষ্টি উন্নয়ন ও সামগ্রিক কৃষি সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছেন উদ্যোক্তা শ্রেনির কৃষক। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাহসী উদ্যোগে পাল্টে গেছে দেশের কৃষির চেহারা। একেকজন উদ্যোক্তা কৃষকের হাত ধরে হাজার হাজার কৃষক যুক্ত হয়েছেন উচ্চমূল্যের ফল ফসল আবাদে। তারা স্থানীয় এনজিও, মহাজন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রায়ত্ব ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণেরও সুযোগ লাভ করে। কিন্তু ফসল উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে বাজারজাতকরণের অনুকূল ব্যবস্থা ও নিশ্চয়তা না থাকার কারণে গত তিন বছরে এমন উদ্যোক্তা শ্রেণির শত শত কৃষক চরম লোকসানের শিকার হয়েছেন। পথে বসে গেছেন কোনও কোনও কৃষক। ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে ব্যাংকের মামলা মাথায় নিয়ে ঘুরছেন অনেকেই। এমতাবস্থায় গত একদশকের উচ্চমূল্যের ফল ফসল আবাদের ধারাবাহিক সাফল্য বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে। কারণ সফল অনেক কৃষকই তার আকাক্সক্ষা অনুযায়ী ফসল উৎপাদনে মনোনিবেশ করতে পারছেন না। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকের কল্যাণে একটি বিশেষ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
খ. সরকারি ধান চাল সংগ্রহ অভিযানের সুফল কখনওই কৃষক পান না
এটি একটি অমীমাংসিত বঞ্চনা কৃষকের জন্য। কৃষক কখনোই সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধান-চাল বা গম বিক্রি করতে পারেন না। অথচ সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায় বিষয়টিকে কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান-চাল কেনার কথা বলা হয়। গত দশ বছরে কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট আয়োজনে এ বিষয়টি বারবার উত্থাপিত হয়ে আসছে। সরকারের পক্ষ থেকেও এর একটি সুরাহা করার জন্য অব্যাহতভাবে প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু একটি সুষ্ঠু অবকাঠামো ও ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। যার মাধ্যমে কৃষক তার উৎপাদিত ধান-চাল সরকার নির্ধারিতমূল্যে সরকারি গুদামে বিক্রি করতে পারে। সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ও বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম কৃষি বাজেট, কৃষকের বাজেট আলোচনায় এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য বিগত বছরগুলোতে প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
গ. বিনাশুল্কে চাল আমদানি বন্ধ করতে হবে, দেশের ধান চালের দাম বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে
নতুন ওঠা বোরো ধানের মূল্য পাচ্ছে না কৃষক। তাদের অভিযোগ বাজারে দেদারছে বিক্রি হচ্ছে ভারতীয় চাল। সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়ে চাল আমদানি হচ্ছে। তবে সরকারি পর্যায়ে আমদানির পরিমাণ বেশি। ২০১৪ সালের জুলাই থেকে চলতি ২০১৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যে পরিমাণ চাল আমদানি হয়েছে, এর ৯১ শতাংশই হয়েছে সরকারি পর্যায়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আড়াই হাজার কোটি টাকার চাল আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি হয়েছে মাত্র ২৩৯ কোটি টাকার চাল। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালের জুলাই থেকে চলতি ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৯ লাখ ২৬ হাজার টন চাল আমদানি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে চালের আমদানি আরো বেড়েছে। ১৭ মার্চ পর্যন্ত চাল আমদানি হয়েছে ১১ লাখ ৯ হাজার টন। পরে আবারো আমদানি ঋণপত্র খোলা হয় ১৩ লাখ ৩৪ হাজার টনের। দেশ খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও বিনাশুল্কে চাল আমদানির বিষয়টি পরিস্কার নয়। এ বিষয়ে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। পাশাপাশি দেশের বাজারগুলোতে ধান-চালের দাম বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। চলবে...
এইচআর