ভূমি ব্যবহারের নীতিমালা মানতে হবে
১ জুন থেকে শুরু হচ্ছে বাজেট অধিবেশন। এই অধিবেশনেই পাশ হবে ২০১৫-২০১৬ এর জাতীয় বাজেট। কেমন হবে সেই বাজেট? কেমন বরাদ্দ থাকবে কৃষিখাতে? কেমন প্রত্যাশা দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের? এনিয়ে ‘কৃষি বাজেট, কৃষকের বাজেট’ প্রস্তাবনায় উঠে এসেছে কৃষকদের প্রস্তাব, দাবি ও চাহিদার কথা। এসব নিয়েই জাগো নিউজে লিখেছেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ। সাত পর্বের ধারাবাহিক লেখায় আজ থাকছে পঞ্চম পর্ব।
(পূর্ব প্রকাশের পর)
১. তিন ফসলি কৃষি জমিকে অকৃষি খাতের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে হবে :
ইতোমধ্যেই সরকার ভূমি ব্যবহার নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। কিন্তু তারপরও দেশের বিভিন্ন এলাকায় তিন ফসলি কৃষি জমিতে অকৃষি স্থাপনা, কলকারখানা, আবাসন তৈরি তৎপরতা এখনো বন্ধ হয়নি। ঢাকার আশপাশের কয়েকটি জেলা গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও নরসিংদী থেকে শুরু করে দেশের অনেক জেলায় কৃষি জমি ব্যাপকহারে কমতে শুরু করেছে।
ইতোমধ্যেই ১৬০ উপজেলায় সরকারের ল্যান্ড জোনিং প্রজেক্টের কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু তারপরও ভূমি ব্যবহারের কোনো নীতিমালাই কেউ মানছেন না। এ ব্যাপারে সরকারের আরো শক্তিশালী উদ্যোগ প্রয়োজন। গ্রাম পর্যায়ে কৃষকদের জন্য স্বল্প ব্যয়সম্পন্ন আবাসন ব্যবস্থা করা গেলে ফসলি জমিতে বাড়িঘর করার প্রবণতা কমবে। এক্ষেত্রে সরকারের স্থানীয় সরকার ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কৃষি ভূমি রক্ষা করে স্বল্প ব্যয় সম্পন্ন আবাসন কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে।
২. শিল্প বর্জ্যরে দূষণ থেকে কৃষি ও পরিবেশ রক্ষা :
পরিবেশ দূষণও কলকারখানার বর্জ্য থেকে কৃষি জমি, জলাশয়, বনভূমিসহ সামগ্রিক পরিবেশকে রক্ষা করতে হবে। গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত কলকারখানাগুলো কোনোভাবেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ম মেনে চলছে না বিধায়; বিষাক্ত বর্জ্যের প্রভাবে একরের পর একর কৃষি জমির জৈব শক্তি হারিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদী পরিণত হয়েছে মেগাসিটি ঢাকার ভাগাড়-এ। নদীর পানিতে মাছসহ সকল জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ নিঃশেষ হয়ে গেছে। মারা যাচ্ছে গবাদি পশু। একই সমস্যার মধ্যে পড়েছে কর্ণফুলি নদীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীগুলো। যতোদূর ক্ষতি হয়েছে তা থেকে বাঁচার জন্য বিজ্ঞানসম্মত গবেষণার আলোকে বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে মাটি, পানি ও পরিবেশ শুদ্ধিকরণের উদ্যোগ নিতে হবে।
এবারের কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট কার্যক্রমে কুমিল্লা ইপিজেড-এর শিল্পবর্জ্যের দূষণে শহর থেকে ৬ কিলোমিটার এলাকার আবাদি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিক্ষুব্ধ কৃষকদের দাবি এই দুষণ বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। মানিকগঞ্জে পৌরসভার ডাস্টবিন নির্মাণ করা হচ্ছে কৃষিজমি দখল করে। যার তীব্র প্রতিবাদ করেছেন কৃষকরা। প্রত্যেক কৃষি আবাদি এলাকার মাটি, পানিসহ সার্বিক পরিবেশকে যেকোনো ধরনেরর দুষণের হাত থেকে রক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে।
৩. কৃষিক্ষেত্রে নব্য প্রচলিত তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার পরীক্ষিত ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে :
দেশে কল সেন্টার, মোবাইল কোম্পানিসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা কৃষিতে তথ্যসেবা চালু করেছে। এটি সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কৃষক ওইসব মাধ্যম থেকে কার্যকর সেবা পাচ্ছেন না বরং কৃষক বিভিন্নভাবে হয়রানি ও ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। এক্ষেত্রে সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিসের মাধ্যমে ওইসব সেবাপ্রদানকারী সংস্থার সমন্বয়ে সব ধরনের কৃষি সমস্যার তাৎক্ষণিক ও বিনামূল্যে সমাধান দেয়ার জন্য একটি বিশেষ স্টেশন তৈরি করতে হবে। সেখানে একাধিক টোলমুক্ত ফোনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ে চালু হওয়া কৃষি তথ্যসেবা কেন্দ্রের সঙ্গে কৃষি তথ্য সার্ভিসের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি তথ্যসেবায় এবার বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন।
৪. সবজি ও ফল ফসলের জন্য বিশেষায়িত হিমাগার স্থাপন :
সবজি ও ফল ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য অন্তত প্রত্যেক জেলায় একটি করে হিমাগার স্থাপন করতে হবে। আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় মৌসুমে কৃষক তার সবজি ও ফলের ন্যায্যমূল্য পান না। অনেক সময় বিভিন্ন সবজি ফসলের মূল্য একেবারে পড়ে যাওয়ার কারণে কৃষকের ক্ষেতেই পচে নষ্ট হয় হাজার হাজার টন সবজি। কৃষক বাজারে নিয়েও সেগুলো পায়ের নিচে ফেলে নষ্ট করতে বাধ্য হয় এমন নজিরও আছে। এ অবস্থার অবসানকল্পে সবজি উৎপাদনে সফল প্রধান প্রধান জেলাগুলোতে একটি করে হিমাগার থাকলে সারা বছর সবজির মূল্য কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের কাছেই লাভজনক করে তোলা সম্ভব।
৫. দেশীয় চা চাষ ও শিল্প রক্ষার উদ্যোগ :
একসময় চা ছিল বাংলাদেশের রফতানিযোগ্য কৃষিপণ্য। কিন্তু বিশ্ববাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও দেশীয় বাণিজ্য পরিকল্পনার দুর্বলতায় রফতানির বদলে এখন দেশে চা আমদানি হয়। কিন্তু দেশে চা চাষের জন্য একটি নতুন ক্ষেত্র হিসেবে উত্তরাঞ্চলে দারুণ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। যুক্ত হয়েছে অসংখ্য সাধারণ কৃষক। কিন্তু তারা চায়ের বাজারমূল্য পাচ্ছেন না।
চা চাষি ও শিল্প মালিকদের সমন্বিত দাবি, চায়ের ট্যারিফ বাড়িয়ে বিদেশ থেকে চা আমদানি নিরুৎসাহী করতে হবে। চা চাষ প্রকল্প বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে পরিবর্তন করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিতে হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে চা আমদানি করতে হয়। আমদানিকারকরা আন্ডার ইনভয়েস দিয়ে চা আমদানি করছে। যেমন, ১৫০ টাকা কেজির চা ৫০ টাকা কেজির এলসি খুলে বাকি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাঠিয়ে চা আমদানি করা হচ্ছে। এটি বন্ধে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।
৬. খামার যন্ত্রপাতি আমদানি ও ক্রয়ে বিশেষ সুবিধা :
ক. সরকারি ও বেসরকারি হিসেব মিলিয়ে কৃষি আবাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ৭০ ভাগ (বেসরকারি কোনো কোনো কোম্পানির হিসেবে ৯০ ভাগ) খামার যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে। এ যান্ত্রিকীকরণের আওতায় এখন কৃষক পর্যায়ে ট্রাক্টর ব্যবহার হচ্ছে ৩০ ভাগ এবং পাওয়ার ট্রিলার ৭০ ভাগ। ২০১০-১১ ও ২০১১-১২ অর্থবছরে সরকার পাওয়ার ট্রিলার ও ট্রাক্টর আমদানিতে ২৫ ভাগ সরাসরি অর্থ প্রণোদনা দিয়েছিল। এ দুই বছরে দেশে পাঁচ হাজারেরও বেশি ট্রাক্টর বিক্রি হয়। তার আগে ট্রাক্টর বিক্রির হার ছিল তিন হাজারের মতো। ২০১২-১৩ অর্থবছরে সরকার অর্থ প্রণোদনা ও ভর্তুকি তুলে নেয়ার কারণে ট্রাক্টরের সংখ্যা আর তেমন বাড়েনি। বহু বেকার তরুণ ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষের কাজে যুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিলেও পরে আর যুক্ত হতে পারেনি। দেশের কৃষির সার্বিক কল্যাণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও বহু মানুষের কর্মসংস্থানের বিবেচনায় ট্রাক্টর ও পাওয়ার ট্রিলারের ওপর আবারো ভর্তুকি প্রদানের জন্য সুপারিশ করছি।
খ. দেশে বছরে ৪০ হাজার পাওয়ার ট্রিলার আমদানি হয়। ১৬ হর্স পাওয়ার শক্তিসম্পন্ন পাঁচ লাখ ইঞ্জিন কৃষির বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে। এগুলোর আমদানিকৃত যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে স্থানীয়ভাবে পূর্ণাঙ্গ কৃষিযন্ত্র তৈরি, মেরামত ও নতুন নতুন উদ্ভাবনী যন্ত্রাংশ তৈরি করা হয়। যা সামগ্রিক কৃষি ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠির জীবন-মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ আমদানিতে ৩৫ শতাংশ কর বহাল থাকায় আমদানিকৃত যন্ত্রপাতির সঙ্গে বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হচ্ছে আমাদের স্থানীয় যন্ত্রপাতির। বছরে দেশে ১২’শ কোটি টাকার কৃষি যন্ত্রাংশ আমদানি হয়। এক্ষেত্রে শূন্য কর সুবিধা দেয়া হলে কৃষিযন্ত্র উদ্ভাবন ও এসেমব্লিংয়ে বিশাল সাফল্য সূচিত হতে পারে।
গ. একটি কম্বাইন্ড হারভেস্টার বা সমন্বিত ফসল তোলা যন্ত্রের মূল্য ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। কিন্তু ধান কাটার যন্ত্রের দাম ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ধান কাটার যন্ত্র দিনে তিন একর জমির ধান কাটতে পারবে। ফসল তোলার সময় ৩২ থেকে ৪০ ভাগ যে ক্ষতি হয় এ যন্ত্র ব্যবহারে ওই ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। ধান কাটার এ যন্ত্রের পর ৩০ ভাগ ভর্তুকি দাবি করছেন কৃষক। পাশাপাশি কম্বাইন্ড হারভেস্টার বা সমন্বিত ফসল তোলা যন্ত্রের মাধ্যমে দিনে ৩০ একর জমির ধান কাটা, মাড়াই ও বস্তাজাত করা সম্ভব। এর মধ্য দিয়ে ফসলের সার্বিক উৎপাদন খরচ কমে আসবে।
দেখা গেছে, এক একর জমি ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করলে কৃষকের ব্যয় হয় ৮’শ টাকা। পাওয়ার ট্রিলার দিয়ে চাষ করলে ব্যয় হয় ১৪০০ টাকা, গরু দিয়ে চাষাবাদ করলে ব্যয় ২২০০ টাকা। প্রচলিত চাষাবাদ ব্যবস্থায় এক কেজি ধানের উৎপাদন ব্যয় ১৬ টাকা, গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসেবে ২০ থেকে ২২ টাকা। কিন্তু ব্যাপকভাবে যান্ত্রিকীকরণ করা গেলে উৎপাদন ব্যয় ৩০ ভাগ কমে আসবে। এক কেজি ধানের উৎপাদন পৌঁছতে পারে ১০-১১ টাকা মাত্র। এ কারণেই উৎপাদন পর্যায়ে ও ফলন পরবর্তী ব্যয় কমাতে খামার যান্ত্রিকীকরণের দিকে দৃষ্টি দেয়ার জন্য অনুরোধ জানাই আমরা।
ঘ. এক বিঘা জমিতে ধান রোপণে ব্যয় হয় দুই হাজার টাকা। কিন্তু রাইস ট্রান্সপ্লান্টার বা রোপণ যন্ত্রের মাধ্যমে তা করলে ব্যয় নেমে আসে মাত্র ৭’শ টাকায়। এ কারণে রাইন ট্রান্সপ্লান্টার যন্ত্রের ওপর বিশেষ ভর্তুকি প্রদানের জন্য অনুরোধ জানাই। (চলবে )
এইচআর/বিএ/এমএস