লাঞ্ছনা নয় জয়যাত্রায় নারী
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্য ঈর্ষণীয় পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সনের ‘তলাবিহিন ঝুড়ি’ এখন ‘দ্যা ইমাজিং টাইগার’ হয়ে উঠেছে। আর এই অর্থনৈতিক উন্নয়নে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অবদানও কম নয়। এদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি যে দুটি খাতের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে সেই পোশাক শিল্প আর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সেও কম নয় নারীর অবদান। পোশাক শিল্পে নারীই মুখ্য কারিগর। তাদের শ্রম, মেধা আর ঘামে পোশাক শিল্প ক্রমশ উন্নতি করছে।
পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও বিদেশে যাচ্ছে। তারাও এদেশে বসবাসরত প্রিয়জনদের নিকট পাঠাচ্ছে রেমিটেন্স। যা এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। নারীরা শুধু অর্থনীতিকেই সমৃদ্ধ করছে না। দেশে-বিদেশে এদেশের মর্যাদা ও সম্মান অনেক উচুঁতে নিয়ে গেছে। সম্প্রতি ব্রিটেনের নির্বাচনে তিন বাঙালি কন্যা টিউলিপ সিদ্দিকী, রূপা হক আর রুশনারা আলীর জয় লাভ এদেশের নারীদের নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। একদা ব্রিটিশরা আমাদেরকে শাসন করেছিল। আর আজ এ তিন বাঙালি নারী সেই ব্রিটিশদেরকেই শাসন করবে ভাবতেই অন্য রকম এক অনুভূতি মনে দোলা দেয়।
নারীদের এ অর্জন শুধু রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি মিশনে এদেশের নারীরা কাজ করছে। দেশের ভেতরও তাদের অর্জন কম নয়। নারীরা এখন সেনাবাহিনীতে কাজ করছে। কয়েক দশক আগেও যা ছিল কল্পনার বাইরে। নারীরা সেই অসাধ্য সাধন করেছে মাত্র কয়েক বছরে। তাই বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরের নারী সৈনিকদের সমাপনী কুচকাওয়াজ দেখে আবেগে আপ্লুত না হয়ে পারিনি। নারীর ওপর নানা লাঞ্ছনা আর বঞ্চনা সত্ত্বেও নারীরা যে এগিয়ে যাচ্ছে এটি তার বড় প্রমাণ।
বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, সেতারা বেগম, প্রীতিলতা প্রমুখ মহিয়সী নারীরা নারী মুক্তির যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই স্বপ্ন তেঁতুল হুজুরের নারীদের কেবলমাত্র ক্লাস ফাইভ পাশ করার তত্ত্বে ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু সেই তত্ত্বকে উপেক্ষা করে সরকারের সেনাবাহিনীতে নারীদের অন্তর্ভুক্তি আমাদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে যে নারীদের আজ আর কেউ ঘরে বন্দি করে রাখতে পারবেন না। মহীয়সী নারীদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। সেই স্বপ্নের পথেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। জঙ্গিবাদ-ধর্মান্ধ শক্তির উত্থানে সারাবিশ্ব যখন আতঙ্কিত, সেই সময়ে আমাদের মেয়েদের এতো সব অর্জন নিঃসন্দেহে অন্যদের প্রগতিশীলতার পথ দেখাবে।
ঔপনিবেশিক শাসনামলে ইংরেজ নারীদের সংস্পর্শে বাংলার উচ্চবৃত্ত নারীরা নিজেদেরকে স্বাধীনচেতা ভাবতে শুরু করে। অনেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে সাহসী কর্মেও যুক্ত হয়। তবে তাদের ওই অগ্রযাত্রা অনেকটা সমাজসেবার গণ্ডিতে আবদ্ধ থেকেছে। আর ওই সময় তাদের ওই অগ্রযাত্রা সমাজের নিবৃত্ত নারীদের স্পর্শ করেনি। ফলে পুরুষশাসিত সমাজে নারীরা কেবল পুরুষের সেবাদাসী হয়েই বেঁচে থাকাকে নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছে। তবে পাকিস্তান শাসনামলে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে নারী জাগরণ বেশ গতি পেয়েছে।
এর আগে এক সঙ্গে এতো নারীকে পুরুষের পাশাপাশি মিছিল-মিটিংয়ে প্রকাশ্য অংশ নিতে দেখা যায়নি। ঢাকার নারীদের পাশাপাশি ওই আন্দোলনে জেলা শহর বা উপ-শহরের নারীরাও নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৪৮ সালে যশোর ভাষা সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হামিদা রহমান ও নারায়ণগঞ্জের আন্দোলনের অগ্নিকন্যা মর্গান বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মমতাজ বেগম তার বড় প্রমাণ। এভাবে সিলেট, কুমিল্লা, খুলনা, দিনাজপুর, রাজশাহী, বরিশাল প্রভৃতি অঞ্চলে নারীরা ভাষা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রথম শোভাযাত্রাতে মেয়েরাই প্রথম ছিলেন। জাতীয় অধ্যাপক সুফিয়া আহমদসহ অনেক নারী সেদিন রাজপথে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান তুলেছে।
ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে স্বাধিকার অন্দোলনের প্রতিটি পর্বে নারীর অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্ব ও নয় মাসের প্রত্যক্ষ সংগ্রামে নারীরাও মা-মাতৃভূমির রক্ষায় অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে। স্বাধীনতার পর অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নারীর অগ্রযাত্রা থেমে গেলেও গত এক দশকে নারী শিক্ষাসহ নানা ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে।
১৮৭৬ সালে প্রথম বাঙ্গালি নারী হিসেবে চন্দ্রমুখী বসুর এন্ট্রান্স বা প্রবেশিকা পাশ করার মাধ্যমে যে নারী শিক্ষাযাত্রা শুরু হয়েছিল তারা এখন ছেলেদের সঙ্গে সমান তালে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করছে। এসএসসি ও এইচএসসির গত কয়েক বছরের ফলাফল বলে দেয় ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সাফল্যর হার বেশি। বিসিএস পরীক্ষায়ও প্রথম হওয়ার কৃতিত্ব রয়েছে তাদের। ৩১তম বিসিএস পরীক্ষায় এক লাখ ৬৪ হাজার ১৬৭ জন পরীক্ষার্থীকে পেছনে ফেলে প্রথমস্থান অর্জন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর ছাত্রী ফারহানা জাহান।
গবেষণার ক্ষেত্রেও নারীরা বেশ খ্যাতি অর্জন করেছে। পাটের জিন উদ্ভাবন থেকে শুরু করে ইতিহাস গবেষণায় নারীরা বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। পাটের জিন আবিষ্কারক বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের প্রধান সহযোগী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসিনা খান। অন্যদিকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আয়শা বেগম তার মৌলিক গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন পুরস্কার এবং বিশ্ব ভারতীয় পুরস্কার পাওয়ার মতো গৌরব অর্জন করেছেন।
নারীরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বও পালন করছেন। জাবি ও বুয়েটের উপাচার্য যথাক্রমে অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম ও খালেদা একরাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য নাসরিন আহমদের দায়িত্ব গ্রহণই প্রমাণ করেছে নারীরা শুধু শিক্ষকতায় নয়, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের চ্যালেঞ্জিং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনেও পারদর্শী। সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রেও নারীরা পিছিয়ে নেই। তাই ফেসবুক-টুইটারের যুগে নারী লেখকদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। নারী উদ্যোক্তারা সফল ব্যবসায়ে। বিশ্বমানের অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নারীদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।
দুর্গমগিরি কান্তার মেরুতেও বাংলাদেশি মেয়েদের পায়ের ধুলা পড়েছে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ এভারেস্ট থেকে আফ্রিকার কিলিমাঞ্জারো পর্যন্ত তারা ছুটে চলেছে। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে মুসা ইব্রাহিমের এভারেস্ট বিজয়ের আনন্দ মুছে যেতে না যেতেই প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে নিশাত মজুমদার বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন এভারেস্টে। নিশাত মজুমদার হিমালয়ের পাদদেশ থেকে ফিরতে না ফিরতেই দ্বিতীয় বাংলাদেশি নারী হিসেবে ওয়াসফিয়া নজনীন পা রেখেছেন এভারেস্টে। পৃথিবীর সাত মহাদেশের সাতটি চূড়া জয়ের লক্ষ্যে তিনি এখন ছুটে বেড়াচ্ছেন দেশ থেকে দেশান্তরে। আধুনিক নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূত মুন্নী সাহার পদাঙ্ক অনুসরণ করে সংবাদ মাধ্যমগুলোতে কাজ করছেন একঝাঁক উচ্চ শিক্ষিত মেধাবী তরুণী।
নারী সাফল্যের আর একটি অর্জন নাজনীন সুলতানার বাংলাদেশের প্রথম নারী ডেপুটি গর্ভনর নিযুক্তি। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়ে ড. ইউনূস যেমন বাংলাদেশকে দিয়েছেন বিশ্ব পরিচিতি তেমনি এশিয়ার নোবেল খ্যাত র্যামন ম্যাগসাসে পুরস্কার পেয়ে বাংলাদেশের নারীর কৃতিত্বকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করিয়েছেন বেলার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ রিজওয়ানা হাসান। কানাডার নিউ ফাউন্ডল্যান্ডে এসটি জোনস শহরে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব উইমেন পুলিশের ৫০ তম বার্ষিক সম্মেলনে ‘আইএডব্লিউপি-২০১২’ পুরস্কারে ভূষিত হন আর এক বাংলাদেশি কৃতিনারী আবিদা সুলতানা। শুধু পুলিশে নয়, সেনাবাহিনীর প্রথম ছত্রী নারী সেনা হওয়ার গৌরব অর্জন করে ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদৌস নারীর অর্জনকে নিয়ে গেছেন নতুন উচ্চতায়।
রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ নতুন নয়। এখন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রধান, স্পিকার, মন্ত্রী সংসদ সদস্যসহ নানা পদে দায়িত্ব পালন করে রাজনীতিতে কেবল তাদের সরব উপস্থিতি নয়; প্রভাব বজায় রেখেছেন। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে যে নারীর নব যাত্রা শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টের গর্বিত সদস্য হওয়ার মাধ্যমে তা পরিপূর্ণতা প্রাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
তবে এখনো পয়েলা বৈশাখে টিএসসি, জবি ও জাবিতে নারী লাঞ্ছনার মতো অনেক ঘটনা ঘটছে। আজও পুরুষদের একটি অংশ নারীদেরকে কেবল সেবাদাসী ভাবছে। উচ্চশিক্ষিত হওয়ার পরও নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পায়নি নারী। তাই নারীর এ অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে পাল্টাতে হবে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল : [email protected]
এইচআর/বিএ/পিআর