নজরুল জীবনে নার্গিস প্রমীলা


প্রকাশিত: ০৭:২৫ এএম, ২৬ মে ২০১৫

(পূর্ব প্রকাশের পর)

চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবীকেও নজরুল সীমাহীন শ্রদ্ধা করতেন। বাসন্তী দেবীরও বিদ্রোহী কবি নজরুলের প্রতি অপরিসীম মমত্ব বোধ ছিল। ১৯২১ সালে চিত্তরঞ্জন দাশের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ‘বাঙলার কথা’ পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। একই বছর ১০ ডিসেম্বর সরকার তাঁকে কারারুদ্ধ করলে তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবী কাগজের হাল ধরেন। পত্রিকাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এই মহীয়সী নারী সেদিন প্রাণান্তকর প্রয়াস চালান। এ প্রসঙ্গে মুজফ্ফর আহমদ জানিয়েছেন, ‘কাজী বাসন্তী দেবীর ডাক পেয়ে যথারীতি ‘ভাঙার গান’ কবিতাটি লিখে পাঠালেন। বাসন্তী দেবীর বাড়িতে একদিন খেতেও গিয়ে ছিলেন নজরুল।’

১৩৩২ বঙ্গাব্দের ২ আষাঢ় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ দার্জিলিঙে পরলোক গমন করেন। এ সময় কবি হুগলিতে বসবাস করছিলেন। বিদ্যুৎগতিতে মহৎপ্রাণ চিত্তরঞ্জনের মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র দেশে। হুগলিতে বসেই পর দিন ৩ আষাঢ় কবি রচনা করেন ‘অর্ঘ্য’ কবিতাটি। এরপর ৬ আষাঢ় আরিয়াদহে রচনা করেন ‘অকাল সন্ধ্যা’। ১৩৩২ এর শ্রাবণ সংখ্যা ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় এটি মুদ্রিত হয়। শিরোনামের সঙ্গে লেখা ছিলো ‘জয়-জয়ন্তী কীর্তন-একতালা’। আর পাদটীকায় উল্লেখ ছিলো ‘স্বর্গীয় দেশবন্ধুর শোক যাত্রার গান।’ ১১ আষাঢ় কবি হুগলিতে পুনরায় রচনা করেন ‘ইন্দ্র-পতন’। ১৬ ও ১৭ আষাঢ় যথাক্রমে লেখেন ‘সান্ত্বনা’ ও ‘রাজভিখারী’ কবিতা দুটি। এর মধ্যে  

‘সান্ত্বনা’ ‘বিজলী’ পত্রিকার ৫ম বর্ষ ৩১শ সংখ্যায় (আষাঢ় ১৩৩২) এবং ‘রাজভিখারী’ ‘কল্লোল’ পত্রিকার শ্রাবণ ১৩৩২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। কবি হৃদয়ের অর্ঘ্য এসব কবিতা-গান নিয়ে ১৩৩২ এর শ্রাবণে প্রকাশিত হয়েছে ‘চিত্তনামা’ কাব্যগ্রন্থটি। এর ‘উৎসর্গ-পত্র’ কবি রচনা করেন নিম্নরূপভাবে, ‘উৎসর্গ/ মাতা বাসন্তী দেবীর শ্রীশ্রীচরনারবিন্দে/ - নজরুল ইসলাম।’

চট্টগ্রামের শামসুন নাহার মাহমুদের (১৯০৮-৬৪) সঙ্গে কবির ছিলো স্নেহের সম্পর্ক। এই মহীয়সী নারীর একেবারে কিশোরী বয়সেই পরিচয় হয় কবির সঙ্গে। শামসুন নাহারের জন্ম ১৯০৮ সালে বর্তমান ফেনী জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। চট্টগ্রামের তামাকুমন্ডির হবীবুল্লাহ বাহার (১৯০৬-৬৫) চৌধুরী ছিলেন বেগম শামসুন নাহারের ভাই। বাহার সাহেব একাধারে ছিলেন লেখক, ‘বুলবুল’ পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশক, ক্রীড়াবিদ-সংগঠক। রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন তিনি এবং মন্ত্রিত্বের পদও অলংকৃত করেন। শামসুন নাহার ছিলেন পিতৃহীনা। চট্টগ্রামের তামাকুমন্ডিস্থ নানা খান বাহাদুর আবদুল আজিজের বাড়িতে তিনি মা ও ভাই হবীবুল্লাহর সঙ্গে প্রতিপালিত হন। শিশুকাল থেকে বেড়ে উঠে ডাক্তার খাস্তগীর স্কুলে লেখাপড়ার সূচনাও তাঁর নানার বাড়িতেই।
    
মোট ৩ বার চট্টগ্রাম সফরকালে প্রথম দু’বার ১৯২৬ ও ১৯২৯ সালে কবি বাহার নাহারদের বাড়িতেই ওঠেন। এখানে বসেই কবি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত কিছু অমর সৃষ্টি। তার মধ্যে উল্লে¬খযোগ্য হচ্ছে ‘সিন্ধু’, ‘শীতের সিন্ধু’, ‘গোপন প্রিয়া’, ‘অনামিকা’, ‘কর্ণফুলী’, ‘মিলন-মোহনায়’, ‘সাতভাই চম্পা’ এবং অন্তত দু’টি বিখ্যাত অভিভাষণ যথা, ‘প্রতি নমস্কার’ ও ‘মুসলিম সংস্কৃতির চর্চা’।
    
চট্টগ্রাম থেকে ফিরেই কবি প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত প্রেম ও প্রকৃতি চেতনার কাব্য ‘সিন্ধু হিন্দোল’। ডি-এম. লাইব্রেরির গোপাল দাশ কর্তৃক ১৯২৭ সালে এটি প্রকাশিত হয়। এই বইটি কবি উৎসর্গ করেন চট্টগ্রামের দুই ভাই-বোন বাহার ও নাহারকে। উৎসর্গ পত্রটি ছিলো নিম্নরূপ, ‘উৎসর্গ/ - আমার এ লেখাগুলি/ বাহার ও নাহারকে দিলাম -/ কে তোমাদের ভালো?/ ‘বাহার/ আন গুল্শানে গুল্, ‘নাহার’ আন আলো।/ ‘বাহার’ এলে মাটির রসে ভিজিয়ে সবুজ প্রাণ,/ ‘নাহার’ এলে রাত্রি চিরে জ্যোতির অভিযান।/ তোমরা দু’টি ফুলের দুলাল, আলোয় দুলালী,/ একটি বোঁটায় ফুটলি এসে,- নয়ন ভুলালি!/ নামে নাগাল পাইনে তোদের নাগাল পেল বাণী।/ তোদের মাঝে আকাশ ধরা করছে কানাকানি।’
    
কবিতার নিচে রচনার স্থান হিসেবে উল্লেখ রয়েছে ‘তামাকুমন্ডি, চট্টগ্রাম’, তারিখ ৩১ জুলাই ১৯২৬। উৎসর্গ পৃষ্ঠার আগে ৩০ জুলাই ১৯২৬ তারিখের ডেটলাইনে একই স্থানের রেফারেন্সে দু’টি কবিতার লাইন উল্লেখ করেছেন কবি। যা নিম্নরূপ,
    
‘আলোর মত জ্বলে ওঠ। উষার মত ফোটো! / তিমির চিরে জ্যোতির মত প্রকাশ হ’য়ে ওঠ!’ এর আগে ১৯২৪ সালে বিয়ের পর কবি যখন সপরিবারে হুগলিতে বসবাস করছেন, সে সময় কবির ঘনিষ্ঠ বন্ধু খান মইনুদ্দীনের (১৯০১-৮১) সঙ্গে হবীবুল্লাহ বাহার একদিন কবির বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হন। আরজি পেশ করেন, ছোট বোন শামসুননাহারের ‘পুণ্যময়ী’ গ্রন্থের জন্য আশীর্বাণীর। নজরুল নিম্নরূপে আশীর্বাণীটি লিখে দেন,
    
‘কল্যাণীয়া শামসুন নাহার/ জয়যুক্তাসু,/ শত নিষেধের সিন্ধুর মাঝে/ অন্তরালের অন্তরীপ,/ তারি বুকে নারী বসে আছে জ্বালি/ বিপদ বাতির সিন্ধুদীপ।/ শাশ্বত সেই দীপান্বিতার/ দীপ হতে আঁখি দীপ বরি/ আসিয়াছ তুমি অরুণিমা আলো/ প্রভাতী তারার টিপ পরি।/ ... ’
    
প্রথমবার চট্টগ্রাম থেকে ফিরে ১৯২৬ সালের ১১ আগষ্ট কবি কৃষ্ণনগর থেকে নাহারকে তাঁর চিঠির একটি দীর্ঘ উত্তর লেখেন। ১৩৪৩ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা ‘বুলবুল’ পত্রিকায় চিঠি শিরোনামে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। চিঠির শেষে পাদটীকায় উল্লেখ করা হয়, ‘চিঠিখানি কবি নজরুল ইসলাম তাঁর প্রতি শ্রদ্ধান্বিতা কোনো বালিকাকে কয়েক বছর আগে লিখে ছিলেন।’
    
চট্টগ্রামে নজরুলের এই সফরগুলো এবং বাহার-নাহারদের বাড়িতে অবস্থানের পাশাপাশি সেখানে রচিত কবিতা-গানগুলোর মধ্যে ‘বিস্ময়কর এবং চির অমর’ কিছু সৃষ্টি রয়েছে। তারমধ্যে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’। বাহার-নাহারদের তামাকুমন্ডির বাসার যে ঘরটিতে নজরুলকে থাকতে দেয়া হয়েছিল, তার জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই চোখে পড়ত এই গুবাক তরুর সারি। এইসব গুবাক তরুকে নিয়েই করি রচনা করেন ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’। এর কয়েকটি চির-অমর লাইন হচ্ছে, ‘তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু/ আর আমি জাগিব না/ কোলাহল করি সারা দিনমান/ কারো ধ্যান ভাঙ্গিবনা/ নিশ্চল-নিশ্চুপ / আপনার মনে পুড়িব একাকী/ গন্ধ বিধূর ধূপ।’

আরো বহু নারীর মাতৃস্নেহ- মমতা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়েছেন কবি। অগ্নিনাগিনী কন্যা হেমপ্রভা তেমনি আরেক উল্লেখযোগ্য নারী। তাকে নিয়ে কবি রচনা করেন ‘হেমপ্রভা’ কবিতাটি। উদ্ধৃতিটি বিবেচ্য, ‘হেমপ্রভা / কোন অতীতের আঁধার ভেদিয়া/ আসিলে আলোক-জননী। / প্রভায় তোমার উদিল প্রভাত/ হেম-প্রভ হ’ল ধরণী / ভগ্ন দুর্গে ঘুমায়ে রক্ষী /এলে কি মা তাই বিজয়-লক্ষ্মী, / ‘ময় ভূখা হুঁ’র ক্রন্দন-রবে / নাচায়ে তুলিলে ধমনী / এস বাঙলার চাঁদ- সুলতানা / বীর-মাতা বীর-জায়া গো / তোমাতে পড়েছে সকল কালের / বীর-নারীদের জায়া গো / তোমাতে পড়েছে সকল কালের / বীর-নারীদের ছায়া গো। / শিব-সাথে সতী শিবানী সাজিয়া/ ফিরিছ শ্মশানে জীবন মাগিয়া,/ তব আগমনে নব-বাঙলার/ কাটুক আঁধার রজনী’

১৯২৬ সালে এই কবিতাটি রচিত হলেও এরমধ্যে কবির ১৯২২ সালের ‘ধূমকেতু’র বিপ্লবী চেতনার প্রত্যক্ষ ছাপ লক্ষ করা যায়। ঐ যে ‘ময় ভূখা হুঁ’র ক্রন্দন রবে/ নাচায়ে তুলিলে ধমনী।’ ইতোপূর্বে এই ‘ময় ভূখা হুঁ’ শিরোনামে ‘ধূমকেতু’তে তীব্র জ্বালাময়ী ভাষায় বিপ্লবাত্মক প্রবন্ধ লিখে ছিলেন কবি।

এ পর্যায়ে কবি জীবনের একটি করুণ অধ্যায়ের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। ‘ধূমকেতু’ মামলায় কারামুক্ত হয়ে কবি কাউকে কিছু না জানিয়ে সোজা চলে গিয়ে ছিলেন কুমিল্লায় প্রিয়তমা প্রমীলার সান্নিধ্যে। কলকাতায় তাঁর যেসব বন্ধু তাঁকে কারামুক্তি উপলক্ষে সংবর্ধনা জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কবির সাক্ষাৎ না পেয়ে তাঁরা বিস্ময়ে হতবাক এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে উঠলেন। এ প্রসঙ্গে ‘যুগস্রষ্টা নজরুল’ গ্রন্থে খান মঈনুদ্দীন বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। কুমিল্লা থেকে ফিরে কবি মেদিনীপুর সাহিত্য সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মেদিনীপুর শাখার এই একাদশ অধিবেশনটি ১৯২৪ সালের ২২ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার দিন ধরে চলে। নজরুল এর সবকটি অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন।

নজরুল গবেষক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম : জীবন ও সাহিত্য’ গ্রন্থে জানাচ্ছেন, ‘ .. এই সভাকে কেন্দ্র করে একটি করুণ ঘটনা ঘটে। মেদিনীপুর নিবাসী আজহারউদ্দীন খান ‘বাংলা সাহিত্যে নজরুল’ গ্রন্থে লিখেছেন, তাঁর গান ও আবৃত্তিতে মুগ্ধ হয়ে জনৈক হিন্দু মহিলা নিজ গলার হার খুলে নজরুলকে উপহার দেন। তখনকার সমাজ এই সামান্য জিনিসটাকে সুস্থচিত্তে ও খোলাভাবে গ্রহণ করতে পারেন নি, মুসলমান তরুণের উপর হিন্দু মেয়ের এই টান তাঁর পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজন ধিক্কারের চোখে দেখে ছিলেন। সমাজের গঞ্জনায় অতিষ্ঠ হয়ে মেয়েটি নাইট্রিক এসিড পান করে আত্মহত্যা করে।

কারামুক্ত হওয়ার পর কলকাতায় কবির বন্ধুরা তাঁকে যে সংবর্ধনা জানাতে চেয়ে ছিলেন, মেদিনীপুর সাহিত্য সম্মেলনে পক্ষান্তরে তারই প্রতিধ্বনি ঘটলেও কবির প্রতি অনুরক্তা জনৈকা হিন্দু রমণীর আত্মহত্যার মর্মান্তিক পরিণতিটি বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থার সাম্প্রদায়িক বিভেদভাবের কুৎসিত দিকটিকেই ফুটিয়ে তুলেছে। অনেক অনুসন্ধান সত্তে¡ও আত্মহত্যাকারী মহিলার নামটি উদ্ধার করা সম্ভব হয় নি। যারা এ বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন, তারাও সচেতনভাবেই নামটি এড়িয়ে গেছেন- সম্ভবত ঐ মহিলার পরিবারকে সামাজিক গঞ্জনার হাত থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে।

দেওঘর থেকে মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে ফিরে এলেও দ্বিতীয়বার ‘নবযুগে’ কাজ করতে যাওয়ার সময়টাতে নজরুল আফজালুল হক সাহেবের সঙ্গে ছিলেন এবং কিছু দিনের মধ্যেই বত্রিশ নং কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ অফিসে পুনরায় মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে থাকতে আসেন। এখানেই পুস্তক ব্যবসায়ী আলী আকবর খানের সঙ্গে পরিচয় নজরুলের। খান সাহেব নজরুলকে নিয়ে তাঁর গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার দৌলতপুর গ্রামে বেড়াতে যান। এখানে খান সাহেবের বোনের মেয়ে সৈয়দা খাতুন ওরফে নার্গিস আসার খানমের সঙ্গে নজরুলের প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নার্গিসকে নিয়ে কবি বেশ কটি কবিতা-গানও রচনা করেন। এ ধরনের উল্লেখযোগ্য একটি কবিতা হচ্ছে,

‘নার্গিস-বাগম মে বাহার কি আগ মে ভরা দিল দাগ মে-/ কাঁহা মেরি পিয়ারা, আও আও পিয়ারা।/ দুরু দুরু ছাতিয়া ক্যায়সে এ রাতিয়া কাটু বিনু সাথিয়া/ ঘাবরায়ে জিয়ারা, তড়পত জিয়ারা।/ ...’ কিন্তু পল্লীবালা সৈয়দা খাতুন ওরফে নার্গিস আসার বানু যে কবির এ আকুলতার কাছে উদ্দাম ঝড়ের ন্যায় ধরা দেন না। লজ্জাবতী নারীর নিরুত্তাপ অথচ ইঙ্গিতময় অভিসার কবিকে আরো বেশি আকুল করে তোলে। ‘ফুল-কুড়ি’ কবিতায় কবির সে আকুলতা লক্ষ্য করা যায়। কবিতাটি দৌলতপুরে রচিত এবং ‘পূবের হাওয়া’ কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। উদ্ধৃতি বিবেচ্য, ‘আর পারিনে সাধতে লো সই এক-ফোঁটা এই ছুড়িকে/ ফুটবে না যে ফোটাবে কে বল লো সে ফুল কুড়িকে।/ ঘোমটা-চাপা পারুল-কলি/ বৃথাই তা’রে সাধলো অলি,/ পাশ দিয়ে হায় শ্বাস ফেলে যায় হুতাশবাতাস ঢলি।’

‘দুপুর অভিসার’ কতিাটিতেও নজরুল-নার্গিসের প্রণয় লীলার ব্যঞ্জনা পরিলক্ষ্য। দৌলতপুর ছেড়ে, নার্গিসকে ত্যাগ করে চলে আসার দীর্ঘ ১৫ বছর পর নজরুল নার্গিসের একটি মিনতিপূর্ণ চিঠি পান। সময়ের হিসেব বিবেচনা করে দেখা যায়, এই চিঠি নার্গিস কবিকে লিখে ছিলেন তাঁর দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণের অল্প কিছুদিন আগে। কবি এই চিঠি প্রাপ্তির সময় সেখানে শৈলজানন্দ উপস্থিত ছিলেন। নজরুল তাকে পত্রখানা পড়তে দেন। পড়ার পরে নজরুলকে পত্রোত্তর দিতে বলার অল্পক্ষণের ভিতরে কবি একটি গান লিখে শৈলজানন্দের হাতে দিয়ে বলেন, এইতো পত্রোত্তর দেওয়া হলো। পত্রোত্তরের সঙ্গে এই গানটিও নজরুল নার্গিস বেগমকে পাঠিয়েছিল কিনা তা আমি জানিনা। (কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা। ৩য় সংস্করণ। পৃ: ১২৩) গানটি শিল্পী সন্তোষকুমার সেনগুপ্ত গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ডে গেয়ে ছিলেন।

‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই/ কেন মনে রাখ তারে।/ ভুলে যাও তারে ভুলে যাও একেবারে।/ আমি গান গাহি আপনার দুখে,/ তুমি কেন আসি দাঁড়াও সমুখে,/ আলেয়ার মত ডাকিও না আর/ নিশীথ-অন্ধকারে।’

নার্গিসের পত্রের উত্তর কেবল গানের মাধ্যমেই পরিপূর্ণভাবে দেয়া সম্ভব ছিলো না- এটা কবি নিষ্ঠার সঙ্গেই উপলব্ধি করেছিলেন। ফলে ১৯৩৭ সালের ১ জুলাই কলকাতার ১০৬ নং আপার চিৎপুর রোডের গ্রামোফোন রিহার্সেল রুম থেকে নার্গিসকে একটি চিঠিও লিখে ছিলেন কবি।

প্রমীলার সঙ্গে নজরুল ইসলামের প্রথম পরিচয় ঘটে ১৯২১ সালের মার্চ মাসে। আলী আকবর খানের সঙ্গে তাঁর গ্রামের বাড়ি দৌলতপুর গমনের পথে কবি কুমিল¬ায় খান সাহেবের স্কুল জীবনের বন্ধু শ্রী বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাসায় এসে ওঠেন। বীরেন্দ্রর বাবা ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত ছিলেন ত্রিপুরা জেলার কোর্ট অব ওয়ার্ডের ইন্সপেক্টর। আর দোলন ওরফে প্রমীলা হচ্ছেন বীরেন্দ্রর জ্যেঠতুত বোন। আলী আকবর খানের বন্ধু হিসেবে বীরেন্দ্রদের বাড়িতে এটা নজরুল ইসলামের প্রথম পদার্পণ হলেও প্রথম যাত্রায় দৌলতপুর গমনের পথে যে ৪/৫ দিন কবি এ বাড়িতে ছিলেন, তার মধ্যেই বাড়ির সকলকে আপন করে নিলেন। গৃহকর্তা ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তও এই যুবক সৈনিক কবিকে নিজ বাড়িতে সাদর আমন্ত্রণ জানালেন। আর্থিক দিক থেকে খুব একটা স্বচ্ছল ছিলো না পরিবারটি, কিন্তু তা সত্তে ও ইতোমধ্যেই ভারতজোড়া খ্যাতি কুড়িয়েছেন যে কবি, তাঁকে নিজ বাড়িতে পেয়ে ইন্দ্রকুমার সন্তুষ্টই হলেন। খবর পেয়ে কবিকে দেখতে আসলেন শহরের তরুণ-যুবক আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। এদের সবাইকে হাসিমুখে বরণ করছেন তিনি। এদিকে ইন্দ্রকুমারের স্ত্রী, বীরেন্দ্রর মা বিরজাসুন্দরী দেবীকে ‘মা’ ডেকে মন্ত্রমুগ্ধই করে ফেললেন কবি এবং মৃত্যু অবধি এই মহীয়সী নারীই নজরুল ইসলামের মায়ের আসন জুড়ে থাকলেন। এ বাড়ির প্রতিটি সদস্যের উপস্থিতিতে আন্তরিক পরিবেশে গান গেয়ে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আবৃত্তি করে প্রাণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেন। কবির কুমিল্লা জীবনের অকৃত্রিমভক্ত সুলতান মাহমুদ লিখেছেন,

‘ ..... নজরুল কুমিল্লা থাকাকালে সন্দেহাতীতভাবে বুঝতে পারলাম যে নজরুলের সঙ্গে তাঁর ভাবী পত্নী কুমারী প্রমীলা সেনগুপ্তার পূর্বরাগ চলছে। নজরুল আমাকে নিতান্ত ছেলে মানুষ মনে করতেন। খেয়ালী কবি অসাবধান মুহূর্তে আমার মতো এক অসমবয়স্ক ভক্তের কাছে নিঃসঙ্কোচে তাঁর পূর্বরাগের অনেক কথাই বলতেন। কোনো কোনো সময় আমাকে দৌত্যকার্য করতে হতো। এই দৌত্যকার্যে আমি কোনও দিন তাঁর বিশ্বাস ভঙ্গ করিনি। কবি মনে করতেন, আমি কিছুই বুঝি না। আমি কিন্তু সবই বুঝতাম, তবে মুখ ফুঁটে রা’টি করিনি। অবস্থা বিপর্যয়ে কোন নদীর জল কোন সাগরে গড়াবে তাই শুধু ভাবতাম।

কবি একদিন মার্চ মাসের প্রথম ভাগে আমার হোস্টেলে কবিতা লিখতে বসলেন। আর কোন দিন তিনি হোস্টেলে বসে কবিতা লিখেন নি। আমি নিকটে গেলে বললেন, ‘প্রেমপত্র নয়, কবিতা।’ এ কথার পর আমি কামরার বাইরে গিয়ে নজরুলের চায়ের জোগাড় করলাম ও ঝারু মোল্লার কামরাতেই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম।

প্রায় আধঘণ্টা পর কবি আমাকে ডাকলেন ও কবিতাটি যে কাগজে লিখে ছিলেন সে কাগজটা ভাঁজ করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, আমি যেন সেটা তখনই দুলীর হাতে পৌঁছে দিয়ে আসি। তাঁর নাকি তখন সোনারং কম্পাউন্ডে যাবার কথা। সেখান থেকে অতীন্দ্রমোহন রায়কে নিয়ে তিনি কুমিল্লা চকবাজারের ধারে গোমতীর তীরে এক ফকিরের সন্নিধানে যাবেন। বোধহয়, সে ফকিরকে লোকে ‘বাশাডার ফকির’ বলতো। আমি বললাম, - ‘কবিতা পড়তে পারি?’ তিনি বললেন, - ‘খুউব পড়তে পার’। ততক্ষণে চা এসে গেলো। তিনি চায়ে চুমুক দিলেন, আমি মনে মনে কবিতাটি পড়লাম। কবিতাটির নাম ‘বিজয়িনী’।

কবিতাটি উদ্ধৃতি করছি। ‘হে মোর রানী! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে।/ আমার বিজয়-কেতন লুটায় তোমার চরণ-তলে এসে। / আমার সমর-জয়ী অমর তরবারী/ দিনে দিনে ক্লান্তি আনে, হ’য়ে উঠে ভারী, / এখন এ ভার আমার তোমায় দিয়ে হারি / এই হার-মানা-হার পরাই তোমার কেশে / ওগো জীবন- দেবি!/ আমায় দেখে কখন তুমি ফেললে চোখের জল, / আজ বিশ্ব-জয়ীর বিপুল দেউল তাইতে টলমল! / আজ বিদ্রোহীর এই রক্ত রথের চূড়ে,/ বিজয়িনী! নীলাম্বরীর আঁচল তোমার উড়ে, / যত তুণ আমার আজ তোমার মালায় পুরে, / আমি   বিজয়ী আজ নয়ন জলে ভেসে।’ (চলবে)....



এইচআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।