নেপাল নয়, ‘প্রকৃতির’ জন্য মন কাঁদে..

সম্পাদকীয় ডেস্ক
সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:২৮ পিএম, ২৯ মে ২০১৫

সৌদি আরবের মসজিদে বোমা হামলা হয়েছে ক’দিন আগে। দেশটির পবিত্র দুটি জায়গার ভবিষ্যত কি? আমার কাছে সেদিন জানতে চাইলেন উদ্বিগ্ন এক লোক। বললাম জানি না। আসলে জানতে চাচ্ছি না। আমার নিজের এটা হয় নাকি আরও মানুষের আমি জানি না। মাঝে মাঝে একটা পিঁপড়ার মৃত্যুও আমাকে ব্যথিত করে আবার অনেক বড় বিপর্যয়ও তেমন করে আলোড়ন তুলে না মনের মধ্যে। যেমনটা নেপাল। গত মাসের ভূমিকম্পে এতো বড় একটা মানবিক বিপর্যয় হলো নেপালে, আমার কেন জানি সে রকম কাতরতা হয়নি এই মানুষগুলোর জন্য। মনে হয়েছে এটাই স্বাভাবিক। আজ এক মাসের উপর হল, আমার নেপালিদের জন্য যতনা মন পোড়ে তারচেয়ে বেশি মনে পড়ে ‘প্রকৃতির’ কথা। প্রকৃতি আমার এক নেপালি বান্ধবী। সেকি বেঁচে আছে- এটা নেপাল টিকে আছে কিনা তার চেয়ে বড় জিজ্ঞাসা জাগায় মনে। ইচ্ছে হয় ছুটে গিয়ে দেখে আসি। কিন্তু কোথায় খুঁজবো তারে! ঠিকানা নেই। আর নেপালে দ্বিতীয়বার ভ্রমণে যাওয়ারও ইচ্ছে নেই আমার।

নেপাল গিয়েছি সেই কবে ২০০১ সালে। আজ থেকে প্রায় ১৪ বছর আগে। রাজা বীরেন্দ্র এবং রাজপরিবারের হত্যাকাণ্ডের ফলোআপ রিপোর্ট করতে। উঠেছিলাম কাঠমাণ্ডু শহরের কেন্দ্রে একটি গেস্ট হাউসে। নাম মনে নেই এখন। একটু কাছেই ছিল সার্ক সচিবালয়। তখন বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে সার্ক সচিবালয়ে পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন আমার অত্যন্ত প্রিয়জন মাসুদ বিন মোমেন। বর্তমানে জাপানে নিযুক্ত আমাদের রাষ্ট্রদূত। মাসুদ ভাই পরিচয় করাতে নিয়ে গেলেন তখনকার সার্ক সেক্রেটারি জেনারেল নিহাল রডরিগোর রুমে। রিপোর্টের কাজেও তার সঙ্গে কথা বলা দরকার ছিল।

রুমে ডুকতেই সার্ক মহাসচিব রডরিগো বললেন, আমিতো তাকে চিনি। আমি খুব বিব্রত হলাম মনে করতে না পারায়। তিনিই বললেন, কলম্বোতে আমাদের দেখা হয়েছে, আরসিএসএস-এর অনুষ্ঠানে। আমি অত্যন্ত লজ্জা পেলাম এ জন্য যে, এতোবড় একজন লোক আমাকে একটুখানি দেখায় মনে রেখেছেন অথচ আমি তাকে প্রথম দেখায় কেন মনে করতে পারিনি। আসলে তখন থেকে দেড় বছর আগে কলম্বোতে আরসিএসএস (Regional Centre for Strategic Studies)-এর একটি কর্মশালায় যোগ দিতে গেলে একদিন আমাদের সঙ্গে লাঞ্চ করেছিলেন তিনি। তখন তিনি শ্রীলংকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বড় কর্মকর্তা। পরে শ্রীলংকার রাষ্ট্রপতির পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা এবং পররাষ্ট্র সচিবও ছিলেন তিনি।

মাসুদ ভাইয়ের সঙ্গে কাঠমাণ্ডুর বিখ্যাত পশুপতিনাথ মন্দিরে গিয়েছিলাম। যাওয়ার পথটা অনেক সুন্দর ছিল। মন্দিরে গিয়ে তেমন ভক্তি আসেনি। ময়লা পরিবেশ, তবে দেখার মতো জায়গা ছিল। মাসুদ ভাই অনেক সময় দিয়েছেন সেদিন। একসঙ্গে তারকাখচিত সুন্দর একটি হোটেলে আমরা লাঞ্চও করেছিলাম মনে পড়ছে।

ওই সফরে আমাদের স্থানীয় রাষ্ট্রদূত সিরিল শিকদারের আপ্যায়নের কথাও মনে পড়ছে। তার বাড়িতে একদিন লাঞ্চের দাওয়াত দিয়ে তিনি অনেক আপ্যায়ন করেছেন। তার অফিসিয়াল গাড়িটি আমার আপত্তি সত্ত্বেও ঘুরতে দিয়েছেন, আসার দিন সেই গাড়িতে এয়ারপোর্টে নামানোর ব্যবস্থাও করেছেন। অত্যন্ত সহজ সরল ছিলেন লোকটি। কিছুদিন আগে মারা গেছেন তিনি।

দু’জন লোকের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেও হয়ননি। সেটা বেশ মন খারাপের ঘটনা ছিল। একজন আমার স্থানীয় সাংবাদিক বন্ধু কসমস। কসমস একটি ইংরেজি পত্রিকা চালাতো তখন, এখন কি করে জানা নেই। এখন দেখা হচ্ছে, তখন দেখা হচ্ছে করে করে শেষ পর্যন্ত ওর সঙ্গে দেখাই হয়নি। অন্যজন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দেব মুখার্জি। মুখার্জি এর আগে ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার ছিলেন, সে সূত্রে পরিচয় ছিল। বাংলাদেশের একজন ভাল বন্ধুও তিনি। ফোনে তিনি দূঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন- অসুস্থতার জন্য দেখা করতে পারবেন না বলে। বললেন অসুস্থতার জন্য তিনি অফিসও করতে পারছেন না। কি আর করা! নেপালে ভারতীয় দূতাবাসের প্রবল প্রভাব। ‘রয়েল ম্যাসাকার’ নিয়ে উনার মনোভাব জানতে না পারাটা অতৃপ্তির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল।

অন্য সব কিছু ভালোই হয়েছিল। রিপোর্টও পেয়েছিলাম খারাপ না। কিন্তু জানি না যে দেশটিতে কাজে বা বেড়াতে গিয়েছিলাম সেটি আমার একটুও ভালো লাগেনি। চারিদিকে নোংরা, ঢাকার চেয়ে বেশি নোংরা। মানুষগুলো আমাদের থেকেও গরীর। আবার খুব বাড়তি কোনও আন্তরিকতাও নেই আমাদের জন্য। সাদা চামড়ার লোকদের জন্য ছিল কিনা খেয়াল করিনি। গরীর দেশের লোকের আরেকটি গরীর দেশ দেখা আর তার লোকদের সঙ্গে মেশায় কি আর এক্সসাইমেন্ট থাকে বলেন! আমরা যদি নিজেরা ধনী হতাম অন্যের গরীবী দেখে হয়তো অন্যরকম অনভূতি হতো, যেটা এখন পশ্চিমাদের আমাদের এখানে এসে হয়। আমরা গরীবরা বড় বড় দেশে গিয়ে দেখবো, মিশবো, শিখবো- এটা আমার থিউরি। গরীবের দেশে কিসের ট্যুর!

অনেকে বলেন, পোখরা যাও, গোখরা যাও- সেখানে নাকি নানা সৌন্দর্য পড়ে আছে। আমার কাছে কোনও দেশের মানুষের চেয়ে তার দালান কোঠা প্রকৃতি বেশি সৌন্দর্যের নয়। মানুষই ভালো লাগছে না, পোখরা আর গোখরা দিয়ে কি হবে! ওদের নাকি ক্যাসিনো আছে, অনেক মজার। আমি আমেরিকার আটলান্টাতে দু’বার ক্যাসিনোয় গিয়েছি। বাংলাদেশ থেকে যারাই নিউ ইয়র্কে যায়, একবার বোধহয় ঘুরে আসেই। আমি টাকা উড়ানো, জুয়া খেলার মধ্যে কোনও মজা পাইনি। দু’বারই আমি কমপক্ষে ২০০ ডলার করে হারিয়েছি, যদিও টাকা আমার পকেটের ছিল না কিন্তু কষ্টটা কম পাইনি। আমার মনে হয় সেখানে রিয়েল মজা তারাই নিতে পারে যাদের বাবার টাকা খরচ করার জায়গা নেই, বা নিজের সম্পদের হিসাব নেই। টাকা থাকলে মজা নেওয়ার উপাদান আছে অস্বীকার করার কিছু নেই। কিন্তু দু’চার টাকা নিয়ে ক্যাসিনোতে যাওয়ার মানে নেই। আর লাসভেগাস না হোক, আটলান্টার ক্যাসিনো দেখার পর কাঠমাণ্ডুর ক্যাসিনোতে কি দেখার আছে!

যারা প্রাকৃতিক সৌন্দের্য দেখতে নেপাল যেতে চান আমি তাদের বলি- ভূটান যান। যে টাকায় নেপাল ভ্রমণ করতে লাগে তার চেয়ে কম টাকায় গিয়ে দেখেন গরীব হলেও কেমন আন্তরিক সেদেশের মানুষ, কত বিচিত্র তাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। ওই দেশটি আমাদেরকে প্রথম স্বীকৃতিদাতা দেশও (ভারত প্রথম স্বীকৃতিদাতা দেশ নয়, অনেকে ভুল জানেন, এমন কি অনেক বইতেও ভুল আছে)। আর ভারত দেখার কথা কি বলবো- পৃথিবীর নানান দেশের চাইতে ভারত ভ্রমণ আমার কাছে অনেক অনেক আনন্দের। পৃথিবীর পুরো বৈচিত্র ওই দেশে।

অনেকে বলেন, নেপালের আছে হিমালয়। সেটা দেখা আর তাতে উঠা নাকি আরও মহা এক্সসাইটমেন্ট। জানি না মুসা ইব্রাহিমরা এতে কি আনন্দ পেয়েছেন, নিশ্চয়ই পেয়েছেন। কিন্তু আমি পাবো না। ঠাণ্ডা আমার প্রধান শত্রু। আগুনে ঝাপ দিতে রাজি আছি বরফে না। আর যে জিনিস আমি হেলিকপ্টারে ঘুরে দেখে আসতে পারি তা দেখতে মাসের পর মাস আজাইরা শীত খাওয়া, সময় ব্যয়, অর্থ ব্যয় আর জীবনকে হুমকিতে ফেলার কি কারণ থাকতে পারে। এই আত্মত্যাগ মানব জাতির, আমার পরিবারের কোন কাজে আসবে?

যাই হোক, নেপালে একবার ভ্রমণ করে আসার পর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেখানে দ্বিতীয় বার যাব না। এর মধ্যে একবার সার্ক সামিট কাভার করতে আমার পত্রিকা থেকে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হলে বিনীতভাবে প্রত্যাখ্যানও করেছি। পরে অনেক আনন্দে আমার আরেক সহকর্মী গিয়েছেন।

যে দেশটিতে আর যাব না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি গত এক মাস ধরে সে দেশটিকে মন থেকে মুছে দিতে পারছি না ‘প্রকৃতির’ জন্য। ভূমিকম্পে প্রায় ৭ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। সংখ্যা হয়তো এদিক সেদিক হতে পারে। অনেক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশও দেশটির এই মানবিক বিপর্যয়ে কাজ করছে। নেপালি ছাত্র-ছাত্রীরা বাংলাদেশে ভিক্ষা করছেন স্বদেশবাসীর জন্য। গরীর দেশের গরীর লোক বলে আমার এদের জন্য কিছু করার ক্ষমতা সীমিত। সত্যি কথা বললে, আফসোফ আর দোয়া করা ছাড়া এখনও কিছু করতেই পারিনি।

আগেই বলেছি, আমার খুব মনে পড়ছে প্রকৃতির কথা। সে আমার এক সাংবাদিক বন্ধু । আমি যখন নেপাল যাই তখন সে কাঠমাণ্ডুতে আমেরিকান দূতাবাসে তথ্য শাখায় কাজ করতো। এখন কোথায় আছে জানি না। একদিন সে আমার হোটেলে এসে আমাকে তুলে নিয়ে শহরের নানা গিফট শপে ঘুরিয়েছে। একটি ভেসপা চালাতো সে। কাঠমাণ্ডুর রাস্তায় কোনও তরুণীর পেছনে বসে শহরে চক্কর দেওয়া- সে দেশের জন্যও মনে হয় তখন খুব কমন দৃশ্য ছিল না। অনেকে আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল। বাংলাদেশেও আমি এ দৃশ্য দেখেছি বলে মনে পড়ে না। একজন মেয়ে মোটরসাইকেল চালাচ্ছে, ছেলেটা তার পেছনে। ওটা কোনও তরুণীর পেছনে আমার প্রথম মোটরসাইকেলে চড়াও। সেটাই প্রথম, সেটাই শেষ এখন পর্যন্ত।

জানি না প্রকৃতি এখন কোথায় কেমন আছে! তার পরিবার কেমন আছে! এই মানবিক বিপর্যয় তার দেশ কবে কাটিয়ে উঠতে পারবে!

আনিস আলমগীর : সাংবাদিক
[email protected]

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।