নির্বাচনি প্রচারণায় বেড়েছে হেলিকপ্টারের চাহিদা, খরচ কেমন?

মুসা আহমেদ
মুসা আহমেদ মুসা আহমেদ
প্রকাশিত: ১১:১৩ এএম, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
নির্বাচনি প্রচারেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে হেলিকপ্টার/জাগো নিউজ গ্রাফিক্স
দেশে ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে হেলিকপ্টারে ভ্রমণ। ভোগান্তিবিহীন যাত্রা আর জরুরি প্রয়োজনে হরহামেশা ব্যবহার হচ্ছে আকাশপথের এই সেবা। বিয়ে, প্রবাসীদের বাড়ি ফেরা, জরুরি চিকিৎসার কাজের পাশাপাশি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণার কাজেও প্রতিদিন ব্যবহার হচ্ছে হেলিকপ্টার।

বিএনপি, জামায়াত, গণঅধিকার পরিষদসহ দলগুলোর শীর্ষ নেতারা নির্বাচনি গণসংযোগে ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেতে নিয়মিত হেলিকপ্টার ব্যবহার করছেন। নির্বাচন কেন্দ্র করে গণসংযোগ শুরুর আগেও নেতাদের হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে দেখা যায়। বিশেষ করে যে সব জেলায় উড়োজাহাজ যোগাযোগ নেই সেখানে অল্প সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন তারা।

হেলিকপ্টার খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আকাশপথে হেলিকপ্টারে ভ্রমণ এখন আর বিলাসের বিষয় নয়। জরুরিভিত্তিতে করপোরেট যাতায়াত, বিদেশি বিনিয়োগকারী-ক্রেতাদের কারখানায় আনা-নেওয়ায় যেমন হেলিকপ্টার ব্যবহার হচ্ছে, ঠিক তেমনি ঈদের আগে বাড়ি ফেরা, এমনকি ঘোরাঘুরির (ট্যুরিজম) ক্ষেত্রেও ওই বাহনের চাহিদা বাড়ছে। এছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মুমূর্ষু রোগীদের বহন করে ঢাকায় আনায়ও এ সেবা মিলছে। নির্বাচন কেন্দ্র করে চাহিদা বাড়ায় ভাড়াও এখন কিছুটা বাড়তি।

আসন্ন ভোট ঘিরে সরগরম হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার-প্রচারণা। এ কারণে সভা-সমাবেশ বা প্রচারণায় যোগ দিতে হেলিকপ্টারে ভ্রমণ করছেন দলীয় প্রধানরা। এতে অল্প সময়ে একাধিক কর্মসূচিতে যোগ দিতে পারছেন তারা।

দেশে হেলিকপ্টার সেবা

১৯৯৯ সালে সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে দেশে হেলিকপ্টার সেবা যাত্রার শুরু হয়। এরপর ক্রমেই এ খাতের সম্প্রসারণ হয়েছে। এখন দেশে প্রায় ১৩টি বেসরকারি কোম্পানি হেলিকপ্টার সেবা দিচ্ছে। তাদের বহরে রয়েছে প্রায় ৩৫টি হেলিকপ্টার।

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত হেলিকপ্টারের সংখ্যা ৪২টি। এর মধ্যে কার্যক্রমে রয়েছে প্রায় ৩৫টি। যা পরিচালনা করছে ১৩টি ব্যবসায়িক গ্রুপ।

প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- স্কয়ার এয়ার লিমিটেড, মেঘনা অ্যাভিয়েশন, আর অ্যান্ড আর অ্যাভিয়েশন, বসুন্ধরা এয়ারওয়েজ, ইমপ্রেস অ্যাভিয়েশন, বিআরবি এয়ার, বাংলা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস, পারটেক্স অ্যাভিয়েশন, সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইনস, আকিজ, পিএইচপি, ফ্লাই ট্যাক্সি অ্যাভিয়েশন ও প্রবাসী হেলিকপ্টার। এসব হেলিকপ্টার বাণিজ্যিক ব্যবহারের পাশাপাশি নিজ প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যবহার হচ্ছে।

নির্বাচনে হেলিকপ্টারের ব্যবহার

হেলিকপ্টারে যাত্রী বহনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, এখন নির্বাচনি ভ্রমণ অত্যন্ত সংবেদনশীল। সম্প্রতি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধি সংশোধন করে চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

ইসির সংশ্লিষ্টরা জানান, নির্বাচনে দলীয় প্রধান, সাধারণ সম্পাদক বা সমপর্যায়ের ব্যক্তিরা নির্বাচনি প্রচারে হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে পারবেন। তবে হেলিকপ্টার থেকে কোনো লিফলেট বা প্রচারসামগ্রী বিতরণ করা যাবে না এবং হেলিকপ্টারে ঝোলানো যাবে না কোনো ব্যানার। এর আগে শুধু দলীয় প্রধান বা সমপর্যায়ের নেতাদের হেলিকপ্টার ব্যবহারের অনুমতি ছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যাতায়াতে হেলিকপ্টারে ভ্রমণ করে আলোচনায় আসেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হলে নতুন করে ফের আলোচনায় আসেন তিনি।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন জেলায় সড়ক ও আকাশপথে ভ্রমণ করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সবশেষ গত রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) হেলিকপ্টারে খুলনায় যান তারেক রহমান। একই দিনে শেরপুরে নির্বাচনি সফরে যান জামায়াত আমির। যদিও দুজনেরই নির্বাচনি প্রচারণার জন্য বিশেষ বাস রয়েছে।



হেলিকপ্টার খাতের সংশ্লিষ্টরা জানান, ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি নির্বাচনি মৌসুমে ভাড়া সাধারণত ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে। কারণ, এখন একই দিন প্রার্থীদের একাধিক জেলা বা অঞ্চলে যেতে হয়। এতে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ে, অপেক্ষা বা স্ট্যান্ডবাই চার্জ যোগ হয় এবং বিভিন্ন পারমিট সংক্রান্ত খরচ যুক্ত হয়। তবে গন্তব্যের ধরন ও গুরুত্ব অনুযায়ী ভাড়া কমে ও বাড়ে।

জানতে চাইলে স্কয়ার এয়ার লিমিটেডের সেলস বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক কাইয়ুম সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের তিনটি হেলিকপ্টার রয়েছে। এগুলো করপোরেট কাজে গড়ে ৪৫ শতাংশ ব্যবহার হয়। বাকি সময় তা বাণিজ্যিক ব্যবহার হয়। এখন শীতের মৌসুম হওয়ায় দিনে এক-দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। অন্য সময় ফ্লাইট আরও বেশি থাকে।’

হেলিকপ্টারের ভাড়া

এখন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারগুলো দেশের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করে। হেলিকপ্টারের ভাড়া নির্ধারিত হয় দূরত্ব, মডেল (সিঙ্গেল বা টুইন টারবাইন), আসন সংখ্যা ও ফ্লাইট ঘণ্টার ওপর ভিত্তি করে।

দেশে দুই ধরনের হেলিকপ্টার চালু রয়েছে—এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট ও দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট। এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট হেলিকপ্টার আকাশে ওড়ার সময় ঘণ্টাপ্রতি ভাড়া ৬৫ থেকে ৭৫ হাজার টাকা, ভূমিতে অপেক্ষমাণ থাকলে ঘণ্টাপ্রতি পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা। এতে সর্বোচ্চ চারজন যাত্রী বহন করা যায়।

এছাড়া বড় এক ইঞ্জিনের (ছয় আসন) হেলিকপ্টারের ভাড়া ঘণ্টায় এক লাখ থেকে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা। দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট হেলিকপ্টারের ভাড়া ঘণ্টায় দুই লাখ ২০ হাজার থেকে দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা। এতে সর্বোচ্চ সাতজন যাত্রী ভ্রমণ করতে পারেন। রোগী পরিবহনের ক্ষেত্রে ভাড়ার ওপর ৩০ শতাংশ করছাড় দেওয়া হয়।

তবে গত কয়েক বছর ধরে শেয়ারে প্রবাসীদের বাড়ি ফেরা ও ঘোরাঘুরিতেও সেবা দিচ্ছে প্রবাসী হেলিকপ্টার। ১ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে (https://probashirhelicopter.com/) গিয়ে দেখা যায়, তারা আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি মাগুরায় জনপ্রতি ৬ হাজার ও ১৬ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদিতে ৫ হাজার টাকা করে ভাড়া অফার করেছে।

ওই ওয়েবসাইটে যাত্রীদের সতর্কতায় বলা হয়, হেলিকপ্টার ভ্রমণে- অফার ও রেট নিয়ে অনেকেই বিভ্রান্তিতে পড়েন। জনপ্রতি সর্বনিম্ন ৫ হাজার টাকায় হেলিকপ্টার ভ্রমণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেটি অবশ্যই প্রবাসী হেলিকপ্টারের পোস্ট করা অফারে যে গন্তব্য, দিন, তারিখ সময় উল্লেখ থাকে- তার সঙ্গে আপনার মিলতে হবে।

এছাড়া অন্য অফারগুলোতেও নির্দিষ্ট গন্তব্য, ফ্লাইং এরিয়া, দূরত্ব প্রযোজ্য। আর যারা রিজার্ভ নিয়ে গন্তব্যে যান তাদের জন্য হেলিকপ্টার অ্যাভেইলেবল থাকা, দূরত্ব, সময়, দিন, তারিখ, আবহাওয়া এবং কয় আসনের কপ্টার নিচ্ছেন ইত্যাদি হিসাব করে রেট দেওয়া হয়।

প্রবাসী হেলিকপ্টারের বিপণন কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রবাসী হেলিকপ্টার চালু হওয়ায় যাত্রীদের ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এর বাইরে করপোরেট ভ্রমণে তাদের হেলিকপ্টার ব্যবহার হয়। তবে গত দুই মাস ধরে আবহাওয়া খারাপ (কুয়াশা) থাকায় দিনে গড়ে মাত্র একটি ফ্লাইট পরিচালনা করা যাচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে দিনে দুই-তিনটা ফ্লাইট পরিচালনা করা যায়।’

কীভাবে হেলিকপ্টার ভাড়া করবেন

হেলিকপ্টার ভাড়া নিতে হলে যাত্রা ও গন্তব্যের স্থান, যাত্রীদের পরিচয় ইত্যাদি উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। ভাড়া অগ্রিম পরিশোধ করতে হবে। বিদেশি যাত্রীদের ক্ষেত্রে জমা দিতে হবে পাসপোর্টের ফটোকপি।

এছাড়া হেলিকপ্টার যেখানে নামবে সেখানে যাত্রীর নিরাপত্তার প্রয়োজন হলে তাকে আগেই ওই থানায় যোগাযোগ করতে হবে। বুকিং পাওয়ার পর যাত্রীর তথ্য নিয়ে হেলিকপ্টার কোম্পানিগুলো সিভিল অ্যাভিয়েশনের কাছে উড্ডয়নের আবেদন করে। সাধারণ যাত্রায় উড্ডয়নের অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে আবেদন করতে হয়।

এমএমএ/এএসএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।