খুলনা-৫
পুরোনো আসন দখলে মরিয়া পরওয়ার, ছাড় দিতে নারাজ বিএনপি
৬ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবারের বিকেল। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে টকটকে লাল বর্ণ ধারণ করেছে। খুলনা শহর থেকে শিরোমণি বাজারের উদ্দেশে মোটরসাইকেলে যাত্রা। যেতে পথে পথে চোখে পড়লো বিভিন্ন প্রার্থীর ব্যানার-ফেস্টুন। তবে সংখ্যায় কম। মাঝে মধ্যে ভ্যান-অটোতে প্রার্থীদের নির্বাচনি মাইকিং।
হঠাৎ কান ঝাঁঝালো মাইকের বক্তব্য। বক্তা বলছিলেন, ‘জামায়াত ক্ষমতায় এলে নারীর ক্ষমতায়ন হবে না। বক্তব্য শুনে বোঝা গেলো এটি বিএনপির নির্বাচনি জনসভা, যা ভাবছিলাম ঠিক তাই, মূল সড়কের পাশে জনসভাস্থলের সামনে এসে দেখা গেলো শিরোমণি স্মৃতিসৌধে চলছে বিএনপির জনসভা।’
বিএনপির জনসভা শেষ হলো মাগরিবের আগেই। মাগরিবের নামাজের পর দেখা গেলো ভিন্ন চিত্র। শিরোমণি বাজার থেকেই শুরু হলো বিশাল এক মিছিল। দূর থেকে কানে ভেসে আসছিল দাঁড়িপাল্লার শব্দ। সামনে গিয়ে দেখি দাঁড়িপাল্লার সমর্থনে তরুণ, যুবক ও বৃদ্ধরা মিছিলে অংশ নিয়েছেন।
ওপরের দুটি চিত্র তুলে ধরার উদ্দেশ্য— বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে এ আসনে। বলছিলাম খুলনা-৫ (ফুলতলা ও ডুমুরিয়া উপজেলা) আসনের বিএনপি ও জামায়াতের ভোটের কথা।
আসনটি থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার ও বিএনপির মোহাম্মদ আলি আসগার লবি। আরও রয়েছেন দুজন প্রার্থী। তারা হলেন- বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির চিত্তরঞ্জন গোলদার ও জাতীয় পার্টির শামিম আরা পারভীন (ইয়াসমীন)। তবে শেষের দুজনের প্রচারণা তেমন চোখে পড়েনি।
এখান থেকে জামায়াতে ইসলামীর হয়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছিলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তখন আওয়ামী লীগের প্রার্থী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ থেকে মাত্র ৪৫৪৮ ভোট বেশি পেয়ে জয়লাভ করেন পরওয়ার। পুরাতন আসনে আবারও জয়ী হতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। ভোটারদের দিচ্ছেন নির্ভয় এবং আশ্বাসের ঝুলি।
অন্যদিকে, বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আলি আসগার লবি চুল পরিমাণ ছাড় দিতে নারাজ। তিনি এ আসন থেকে অতীতে নির্বাচিত না হলেও ২০০১ সালের নভেম্বরে খালেদা জিয়ার ছেড়ে দেওয়া খুলনা-২ আসন থেকে উপ-নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
স্থানীয়রা বলছেন, বিএনপি ও জামায়াত দুই রাজনৈতিক দলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে এখানে। কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। দুজনেরই অভিজ্ঞতা রয়েছে। দুজনেই মানুষ হিসেবে ভালো। যে আওয়ামী লীগের ভোট বেশি টানতে পারবেন তিনিই নির্বাচিত হবেন বলে ধারণা স্থানীয়দের।

এলাকার প্রধান সমস্যা
ফুলতলা ও ডুমুরিয়া উপজেলার স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ দুই এলাকায় কৃষি সম্ভাবনা রয়েছে কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার অভাবে বেশিরভাগ মানুষের ইচ্ছা থাকলেও কৃষিকাজ করতে পারছেন না। ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদনে পিছিয়ে পড়ছেন এখনকার কৃষকরা। এখানকার আরেকটি বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা। একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তাঘাটসহ বেশিরভাগ এলাকায় পানি জমে। বিগত সরকারের আমলে জলাবদ্ধতা নিয়ে তেমন কেউ কাজ করেনি। এছাড়া বেশকিছু সড়ক রয়েছে, যা চলাচলে অনুপযুক্ত।
যা বলছেন ভোটাররা
ফুলতলার শিরোমণি বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে এসেছিলেন নূর ইসলাম। তার কাছে জানতে চাওয়া হয় আসনটি থেকে কে জয়ী হবেন। সরাসরি এমন প্রশ্নে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘কইতে পারি না কে হবেন। তবে এখানে জামায়াতের প্রভাব বেশি। বিএনপি ফাইট দেবে। হয়তো খুব বেশি পার্থক্য হবে না ভোটের পরিসংখ্যানে।’
বাজারের চা দোকানি ইব্রাহীম মন্ডল জানান, প্রতিদিনই মিছিল হচ্ছে বিএনপি আর জামায়াতের। দুই দলেরই লোক অনেক। যদি বিএনপি ১০০ লোক নিয়ে মিছিল করে এরপরই জামায়াত তার দ্বিগুণ লোক নিয়ে মিছিল করে।
ভোট সরাসরি কোন প্রতীকে দেবেন তা না জানিয়ে বিলকিস বেগম নামের একজন নারী বলেন, যারা আল্লাহর পথে থাকবে তাদেরই ভোট দেওয়ার ইচ্ছা।
ডুমুরিয়ার কাঞ্চননগর গ্রামের শশিনাথ রায় জাগো নিউজকে বলেন, আমরা হিন্দু মানুষ ভোটের সময় ভয়ে ভয়ে থাকি। সবাই আমাদের ভোট দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছেন। যে আমাদের বিপদে আপদে পাশে ছিলেন আমরা তাকেই ভোট দেবো।
ফুলতলার দামোদর কাশেম শিল্প নগরের চা দোকানি জাকির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, খুলনার ৬টা আসনের মধ্যে এ আসনে বিএনপি-জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। বিএনপির যেমন ভোট রয়েছে, তেমন জামায়াতেরও।
গণভোটের বিষয়ে তিনি বলেন, গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ জানেই না গণভোট কি, কীভাবে দিতে হবে। এলাকার নেতারা গণভোটে যেভাবে দিতে বলবে আমরা সেভাবেই দেবো।
দামোদর বাজারে ভ্যানে বসে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন সত্তরোর্ধ্ব ভ্যানচালক আত্তাব খন্দকার। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি ভ্যান চালিয়ে খাই। আওয়ামী লীগ আমলেও চালিয়েছি, এখনো চালাচ্ছি। কিন্তু কোনো এমপি আমার ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে পারলো না।’
আফসোস করে তিনি বলেন, এ বয়সেও যদি আমার ভ্যান চালাতে হয় তাহলে এ যে এত কার্ডের মাধ্যমে চাল, ডাল যারা পায় আমার কপালে কেন জোটে না। আমি চাই এমন একজন এমপি হোক যে গরিব-দুঃখী মানুষের কথা শোনবেন।

প্রার্থীদের বক্তব্য
গতকাল শুক্রবার বিকেলে ডুমুরিয়া উপজেলার শাহপুর বাজারে আয়োজিত নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, অতীতে জামায়াতের সমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলেও এখন নানান অভিযোগ ও সমালোচনা করছে। তাদের নীতি হচ্ছে— সঙ্গে থাকলে সঙ্গী, না থাকলে জঙ্গি।
তিনি বলেন, আদর্শ, চরিত্র ও নৈতিকতার মোকাবিলা দুর্নীতি আর চাঁদাবাজির মাধ্যমে করা যায় না। ভোঁতা হাতিয়ার দিয়ে সততাকে মোকাবিলা করা যাবে না। এসব অপপ্রচারের ফলে জামায়াতে ইসলামীর একটি ভোটও কমবে না ইনশাল্লাহ।
তিনি দাবি করেন, প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। জনসভায় স্থানীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন এবং নির্বাচনি প্রচারণা জোরদার করার আহ্বান জানান।
শুক্রবার সন্ধ্যায় শিরোমণি বাজারে চায়ের দোকানে জটলা দেখে সামনে এগোতে দেখা যায় ভোটারদের সঙ্গে বসে চা পান করছিলেন বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আলি আসগার লবি। পরিচয় দেওয়ার পর কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, নির্বাচনের পরিবেশ খুব ভালো, কোনো সমস্যা নেই। জনগণ আমার সঙ্গে আছে কোনো ভয় নেই।
ভোটারদের কোনো ভয় কিংবা আশঙ্কা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেদিন অনেক রাতে হিন্দু অধ্যুষিত এক এলাকায় গিয়েছিলাম। রাস্তায় কিছু নারী দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোনো সমস্যা আছে কি না? তারা বলেন- তারা কোনো কিছুতেই ভয় পায় না। যদি কেউ কিছু বলতে আসে আমরা প্রতিহত করবো।
নির্বাচিত হলে এলাকায় প্রথম কাজ কি করবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এলাকায় জলাবদ্ধতা জটিল সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে সর্বপ্রথম কাজ করবো। কৃষকরা ধান চাষ করতে পারে না, তারা যাতে ধান রোপণ করতে পারে সেই ব্যবস্থা করবো।
ভোটের হিসাব
খুলনা-৫ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর হয়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছিলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তখন আওয়ামী লীগের প্রার্থী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ থেকে মাত্র ৪৫৪৮ ভোট বেশি পেয়ে গোলাম পরওয়ার জয়লাভ করেন। আসনটি থেকে বিএনপির হয়ে গাজী আব্দুল হক মাত্র একবার নির্বাচিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এখানে জাতীয় পার্টি নির্বাচিত হয়েছিল একবার ১৯৮৬ সালে। তখন এইচ এম এ গাফ্ফার নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টি থেকে।
এছাড়া ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রার্থী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ নির্বাচিত হন।
জেলার সবচেয়ে বড় সংসদীয় আসন খুলনা-৫। এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২ হাজার ৭৯৮। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৩ হাজার ৪৪৩ এবং পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯৯ হাজার ৩৫৪। এ আসনেও নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি।
টিটি/এমএএইচ/