জাতির উদ্দেশে ভাষণ

আমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ: জামায়াত আমির

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৫২ পিএম, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। ভাষণে তিনি দেশে বৈষম্যহীন, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার জানান এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।

ভাষণের শুরুতে তিনি জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে জুলাইয়ের আন্দোলনে আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন।

তিনি বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলন হয়েছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কোনো উপভোগের বিষয় নয়। সর্বাবস্থায় আমরা স্মরণে রাখবো আমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং আমাদের দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আমরা হজরত ওমরের সেই বিখ্যাত উক্তি ও দায়িত্বশীলতা মনে রাখবো যে, ফোরাতের তীরে একটি কুকুর না খেয়ে মরে গেলেও আমি ওমর দায়ী থাকবো। আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে আমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবো, ইনশাল্লাহ।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ও পরিবারতন্ত্রের হাতে কুক্ষিগত ছিল। বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর মানবাধিকার, ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং নির্বাচনের নামে তামাশার মাধ্যমে জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এসব নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকেই রক্তক্ষয়ী জুলাইয়ের জন্ম।

তিনি তরুণ প্রজন্মকে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের মূল শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, আজকের তরুণরা পরিশ্রমী, সাহসী, মেধাবী ও প্রযুক্তি-সচেতন। তারাই নতুন বাংলাদেশ, ‘বাংলাদেশ ২.০’ নির্মাণ করবে।

তিনি বলেন, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মকে পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।

জামায়াত আমির বলেন, জনগণ চায় একটু নিরাপত্তা সুশাসন ও ইনসাফ। তাই আগামীর বাংলাদেশকে এসব অঙ্গীকার ও মূল্যবোধের আলোকে সাজাতে চাই। রাষ্ট্রের মৌলিক কিছু সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করে; কিন্তু এসব পরিকল্পনার সবগুলো যেমন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি তেমনি অনেকগুলো একদমই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাত ও প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি এবং এ সংস্কার প্রক্রিয়াকে জারি রাখাসহ সংস্কার নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের আয়োজন করা হচ্ছে। এ গণভোট জনগণের সাধারণ ইচ্ছা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এই গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে ভোট চাই।

তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়নে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে। সুযোগ পেলে সরকার গঠন করলে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

জামায়াত আমির বলেন, আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ তৈরির জন্য ৫টি বিষয়ে হ্যাঁ এবং ৫টি বিষয়ে না বলতে হবে। সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকে আমরা হ্যাঁ বলতে বলেছি। কারণ এসব মৌলিক শর্ত ছাড়া বৈষম্যহীন, উন্নত, নৈতিক মানসম্পন্ন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। পাশাপাশি দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব, চাঁদাবাজি-কে স্পষ্ট করে না বলতে হবে।

নারীদের নিয়ে জামায়াত আমির বলেন, যে সমাজ নারীর মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, সেই সমাজ কখনো সমৃদ্ধ হতে পারে না। আমরা ক্ষমতায় এলে নারীরা কেবল ঘরের ভেতরে নয়, সমাজের মূল ধারার নেতৃত্বে থাকবেন সগৌরবে। কর্পোরেট জগত থেকে রাজনীতি সবখানে তাদের মেধার মূল্যায়ন হবে কোনো বৈষম্য ছাড়াই। আমরা এমন এক দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যেখানে কোনো মা বা বোনকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না। আপনাদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে আমাদের সঙ্গী হোন। একটি উন্নত ও আধুনিক দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে আমাদের নির্বাচিত করুন।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষার অঙ্গীকার করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সবার দেশ। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কারও ওপর আঘাত এলে তা প্রতিরোধ করা হবে। পাশাপাশি ওলামায়ে কেরাম ও তাবলিগ জামাতের ভূমিকার প্রশংসা করে অতীতের নির্যাতনের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দেন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদার ভিত্তিতে বৈশ্বিক সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হবে।

প্রবাসীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, জন্মভূমি থেকে হাজার মাইল দূরে অবস্থান করেও জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে আপনারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, জেল জুলুমের শিকার হয়েছেন। এরই মধ্যে আপনারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নতুন বাংলাদেশে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে ইতিহাস রচনা করেছেন।

আগামী দিনে দেশ গড়ার এই অভিযাত্রায় আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া আমাদের নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে। প্রবাসীরাও যেন সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন সমৃদ্ধি ও উন্নয়নে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী করতে আনুপাতিক হারে সংসদে প্রবাসী প্রতিনিধি নির্বাচন বা মনোনয়নের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা। আপনাদের ঋণ শোধ করতে পারবো না।

ভাষণের শেষাংশে তিনি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়ে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেওয়ার অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব আমানত হিসেবে পালন করা হবে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তারা অঙ্গীকারাবদ্ধ।

আরএএস/এমআইএইচএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।