এনসিপির কনভেনশনে বক্তারা

দেশে শিক্ষিতদের বেকারত্বের হার কমাতে নতুন করে ভাবতে হবে  

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৩৫ পিএম, ০৩ মে ২০২৬

বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকার সমস্যা সমাধানে নতুন করে ভাবতে হবে। রাজস্ব আহরণে অটোমেশন ও বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি বন্ধসহ একাধিক উদ্যোগ নিলে অর্থনৈতিক স্থবিরতা কেটে যাবে।

রোববার (৩ মে) রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের মুক্তিযোদ্ধা হলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত ‘জ্বালানি, অর্থনীতি, মানবাধিকার, সংস্কার ও গণভোট’ শীর্ষক জাতীয় কনভেনশনের দ্বিতীয় সেশনে বক্তারা এসব কথা বলেছেন। অর্থনৈতিক পুনর্গঠন: দুদক, এনবিআর, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ও কর্মসংস্থান বিষয়ে সেশনটি আয়োজিত হয়।

আলোচনায় অংশ নেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম. মাসরুর রিয়াজ, বিডিজবস-এর সিইও ফাহিম মাসরুর, ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ এবং চার্টার্ড ফাইনান্সিয়াল এনালিস্ট আসিফ খান। সেশন পরিচালনা করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। এছাড়াও সেশনে বক্তব্য রাখেন এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ।

হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ক্যাশলেস, পেপারলেস ও এনআইডি অন্তর্ভুক্তকরণের মাধ্যমে কর ও শুল্ক অটোমেশন করা এখন সময়ের দাবি। আরজেএসসির সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ১ কোটি ২৮ লাখ টিআইএনধারী আছে। কিন্তু আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছে সাড়ে ৫ লাখের মতো, অর্থাৎ ৫ শতাংশও না। আবার আমাদের রেজিস্টার্ড বিজনেস প্রতিষ্ঠান প্রায় ১ কোটির উপরে, কিন্তু বছরে ৫ থেকে ৭ লাখ আয়কর রিটার্ন দেয়। এর কারণও আছে।

তিনি বলেন, আয়কর রিটার্নের বর্তমান সনাতনী পদ্ধতিতে অনেক জটিলতা রয়েছে। এটাকে আমরা অটোমেশন করে এনআইডি কার্ডের সঙ্গে ইন্টিগ্রেটেড করে ফেলতে পারলে টেবিলের নিচ দিয়ে যে কম্প্রোমাইজ হয়, তা-ও প্রায় শূন্যে নিয়ে আসা যাবে। ইউরোপের অনেক দেশে অনেক বছর ধরে এ অনুশীলন আছে।

তিনি বলেন, দ্বিতীয়ত দেশের যে জ্বালানি সংকট, পাম্পের দীর্ঘ লাইন কমে যাওয়ার পরও আশাবাদী হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ আমাদের ফুয়েল আমদানিনির্ভর। আমাদের দেশে লোডশেডিংয়ের কারণে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলা প্রতিবছর ক্রাইসিসের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু ভারত তাদের এনার্জি সোর্স বৈচিত্র্যময় করতে পেরেছে। তারা রিনিউয়েবল এনার্জিতে চলে গেছে। পাকিস্তান রিনিউয়েবল এনার্জিতে চলে গেছে। ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের প্রভাব কিন্তু পাকিস্তান, উরুগুয়ে, কেনিয়াতে পড়েনি। আমাদের নির্ভরতা থেকে বের হয়ে রিনিউবেল এনার্জিতে যেতে হবে।

সারজিস আলম বলেন, গত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ দেশকে লুটের রাজ্যে পরিণত করেছে। রূপপুর প্রকল্পের বিষয়ে ইউএসভিত্তিক ওয়েবসাইট গ্লোবাল ডিফেন্স কর্প তাদের পরিসংখ্যানে বলছে, ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট করতে টিউলিপ সিদ্দিককে সামনে একজন নেগোশিয়েটর হিসেবে রেখে শেখ হাসিনার সিন্ডিকেট ৫০ হাজার কোটি টাকা কমিশন নিয়েছে। যে টাকা মালয়েশিয়ার বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় টিকে থাকার ফি হিসেবে আদানির মাধ্যমে নরেন্দ্র মোদীকে ক্যাপাসিটি চার্জের মাধ্যমে টাকা পাঠিয়েছে। আপনি তার বিদ্যুৎ কেনেন আর না কেনেন প্রতি বছর আপনাকে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার তাকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হতো।

বিডিজবস-এর সিইও ফাহিম মাসরুর বলেন, বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে বেকারত্ব বড় সমস্যা না; সংখ্যায় এটা ৪-৫ শতাংশের কম। বাংলাদেশের মূল সমস্যা হল, এখানে যুবক তথা ২১ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্ব সামগ্রিক বেকারত্বের ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি। এই যুবকদের মধ্যে যারা শিক্ষিত, তাদের মধ্যে বেকাত্বের হার ৫০ শতাংশের বেশি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর ৭ লাখ ছেলেপেলে বের হচ্ছে; যাদের ৫০ থেকে ৬০ ভাগের কোনো চাকরি নেই। বেকারত্ব যতটা না অর্থনৈতিক সমস্যা, তার চেয়ে অনেক বেশি সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা। কিন্তু সেটি গত দুবছরে সেভাবে আসেনি।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম. মাসরুর রিয়াজ বলেন, আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে ‘ফোর বাই ওয়ান ডাইমেনশন’ দিয়ে ধরতে পারবেন। অর্থাৎ চারটি স্থানীয় ইস্যু ও একটি বৈশ্বিক ইস্যু। চারটি ডোমেস্টিকের একটি হলো আমাদের অর্থনীতির যে চালিকাশক্তি, যেখান থেকে কর্মসংস্থান ও প্রোসপারিটি আসে, সেগুলো একেবারে স্থবির।

তিনি বলেন, দ্বিতীয় হলো- ৫ আগস্টের আগে আমাদের অর্থনৈতিক সুশাসন সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছিল। সেটা ব্যাংকের লুটপাট বলেন, জ্বালানিকে কেন্দ্র করে যে অলিগার্ক অবস্থা কিংবা সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার বিশৃঙ্খলা এবং সেখানে থেকে লুটপাট বলেন, পুরো জিনিসটাকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক সুশাসন এখনো ভঙ্গুর অবস্থায় আছে।

ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম বলেন, আমাদের দেশে ব্যাংকিং খাতে স্থবিরতার একটি বড় কারণ গভর্নেন্সের অভাব। রাষ্ট্রে যখন ম্যাক্রো লেভেলে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ ও এপরবর্তীতে আমরা দীর্ঘ সময় ফ্যাসিজম দেখতে পেলাম। এগুলোর একটি প্রভাব সব সেক্টরে পড়ে। আমাদের ন্যাশনালাইজড কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলো এখন কেউ অ্যাকাউন্ট খুলতেই নিরাপদ বোধ করেন না।

তিনি আরও বলেন, এখন বর্তমান সরকার একটি নিম্নমানের চালাকি করেছে যে, রেজ্যুলেশন হওয়ার আগে যারা ব্যাংকের মালিক ছিল, সরকার যে পরিমাণ তারল্য সহায়তা দিয়েছে, তার সাড়ে সাত পার্সেন্ট দিয়ে তারা আবার মালিকানা ফেরত চাইতে পারে। এখন ধরুন, ইসলামী ব্যাংককে সরকার ২৩০০ কোটি টাকা দিয়েছে। ইসলামী ব্যাংক আবার ১৫০০ কোটি টাকা শোধ করে দিয়েছে। বাকি ৮০০ কোটি টাকার সাড়ে ৭ ভাগ দিয়ে মালিকানা চাইতে পারবে। বিশেষ কিছু ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা দিতে তারা এ ব্যবস্থা করেছে।

শামস মাহমদু বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ বিগত কয়েক বছর ধরে কমছে। কারণ সরকার যে বাজেট করে, তার একটি বড় অংশ সে ব্যাংকিং খাত থেকে নেয়। ফলে একই জায়গায় যদি সরকার ঋণ চায় এবং আমিও চাই, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সরকারকে ব্যাংক ঋণ দেবে। ফলে যারা ক্ষুদ্রঋণ নেয়, তাদের পথ একদম বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের জুলাই অভ্যুত্থানের একটি বড় পার্ট ছিল চাকরি তৈরি। এখন যদি ব্যবসাগুলো ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে আমরা কীভাবে চাকরি তৈরি করবো।

তিনি বলেন, আমরা সবসময় দুর্নীতি বিষয়ে কথা বলি। কিন্তু এটা আমাদের এত গভীরে ঢুকে গেছে যে ধরেন আমি হজের টাকা চুরি করলাম, দেখবেন আমাকে তারপর কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতার প্রধান অতিথি করা হয়েছে। এই মৌলিক জায়গায় সমাধান করতে না পারলে আমরা পরিবর্তন আনতে পারব না।

এনএস/এমকেআর

 

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।