এনসিপির কনভেনশন

মানবাধিকার সর্বজনীন, সরকারের সমালোচনাকারীদের হয়রানি বন্ধ করতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:০৮ পিএম, ০৩ মে ২০২৬
এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত জাতীয় কনভেনশনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিয়ে সেশন/ছবি: সংগৃহীত

মানবাধিকার সর্বজনীন বিষয়। যারা ভিন্ন মতাদর্শ লালন করেন, তাদেরও এটি পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সরকারের সমালোচনা করার কারণে গ্রেফতার এবং জামিন না দিয়ে হয়রানি করা বন্ধ করতে হবে।

রোববার (৩ মে) বিকেলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত জাতীয় কনভেনশনের তৃতীয় সেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের মুক্তিযোদ্ধা হলে জ্বালানি, অর্থনীতি, সংস্কার ও গণভোট বিষয়ে এ কনভেনশন হয়।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার: বর্তমান ঝুঁকি ও করণীয় বিষয়ে সেশনটিতে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। বক্তব্য দেন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার সারা হোসেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার, সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট জায়মা ইসলাম, গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস, জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলাম এবং ফ্যাক্ট-চেকার ও মানবাধিকারকর্মী মিনহাজ আমান। সঞ্চালনায় ছিলেন এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আলামিন।

আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘৫ আগস্টের পর যখন সংবাদমাধ্যম দখল হওয়া শুরু করে, সময়ের পরিক্রমায় সেগুলো কেবল হাত বদল হয়েছে। গণমাধ্যম নিয়ে কাজ করতে গেলে যেকোনো সরকার চিন্তায় পড়ে যায়। এর পরিণতি কী হতে পারে- এটা নিয়ে তারা চিন্তিত হয়ে পড়ে। সাংবাদিকরা, মালিকরা ক্ষেপে যেতে এবং সরকারের বিরুদ্ধে চলে যেতে পারেন। এটা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও হয়েছে। আমাদের মূলধারার গণমাধ্যমের দল বদলের কারণে মানুষের বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। ফলে তারা নতুন গণমাধ্যমের দিকে ঝুঁকছে। অভ্যুত্থানের সময় যখন মূলধারা থেকে আমাদের কণ্ঠ প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন নতুন গণমাধ্যম অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।’

তিনি বলেন, ‘মানবাধিকার সর্বজনীন হওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের যথেষ্ট আইনি কাঠামো না থাকার কারণে আমরা তা অনুশীলন করতে পারছি না। আগের অনুশীলন রয়ে যাচ্ছে। সাংবাদিকদের অনেকেই গ্রেফতার অবস্থায় আছেন, আওয়ামী লীগের অনেকেই গ্রেফতার হয়ে আছেন। যথাযথ আইনি কাঠামো না থাকায় যারা ফ্যাসিবাদ হয়ে উঠতে সহায়তা করেছেন, তাদের এখন হিরো ট্রিটমেন্ট দেওয়া হচ্ছে। অথচ তাদের আরও ভয়াবহ শাস্তি হওয়া দরকার ছিল।’

ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ‘মানবাধিকার কেবল আমার দল ও মতাদর্শের মানুষের জন্য নয়, বরং এটি সবার জন্য হতে হবে। ভিন্ন মতাদর্শের যারা রয়েছেন, তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রযোজ্য হবে। বর্তমানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, জামিনই পাওয়া যাচ্ছে না। বিচারককে দশবার ভাবতে হয়, তিনি আসলে জামিন দেবেন কি না। আমরাও চাই, জুলাইয়ের হত্যাকণ্ডের বিচার সঠিকভাবে হোক, কিন্তু তদন্ত শেষ হচ্ছে না এবং অনেককেই প্রমাণিত হওয়া ছাড়া আটক রাখা হচ্ছে।’

ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, ‘এই সরকারের সময়ে ২২ দিনে পাঁচজনকে সরকারে বিরুদ্ধে লেখালেখির জন্য আটকের ঘটনা দেখেছি। অনেকে মনে করেন, আটকের পর জামিন দিলেই বোধহয় শেষ। আসলে এটি হয়রানির শুরু। কারণ এরপর মামলাগুলো চলতে থাকে। তাকে ভাড়া দিয়ে মামলার হাজিরা দিতে যেতে হয়। তাকে একজন উকিল নিয়োগ দিতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘এই সরকার যাদের গ্রেফতার করেছে, তারা বিস্তৃত এলাকার এবং কেউই খুব গুরুত্বপূর্ণ ফিগার নন। তাহলে তাদের আটক করার কারণ কী? কারণ সেই পুরোনো প্যাটার্ন, ভয় তৈরি করা।’

সাংবাদিক আশরাফ কায়সার বলেন, ‘বর্তমান সরকার অনেক বেশি অপতথ্য নিয়ে আলোচনা করছে। এর আগে একজন মন্ত্রী আরাফাত (তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত ) এরকম অপতথ্যের কথা বলতেন। সরকার যখন অপতথ্য-অপতথ্য বলে, তখন চিন্তায় পড়তে হয়। কারণ তখন অনেক গঠনমূলক সত্য তথ্যকেও অপতথ্য মনে হতে পারে।’

সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘যারা গুমের শিকার হয়েছেন, সেখান থেকে যারা বেঁচে ফিরেছেন, তাদের সবার এবং তাদের পরিবারের আলাদা দুঃখের কাহিনি আছে। কিন্তু সেগুলো সেভাবে প্রচার হয়নি। ফলে আমি যখন আয়নাঘরের কথা বলি, তখন ফেসবুকে আমাকে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হতে হয়। ফলে বিগত সরকারের সময়ের হাজার হাজার গুমের ঘটনার বিচার করতে হবে। যদি বিচার না হয়, তাহলে বর্তমানরা একই পথে পা বাড়ানোর সাহস পাবে। তাই অবশ্যই বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’

ফ্যাক্ট-চেকার ও মানবাধিকারকর্মী মিনহাজ আমান বলেন, ‘ভুয়া নিউজ কোনো ছোট বিষয় নয়। এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু সমস্যা হলো, কোনো ফ্যাক্ট-চেকিং সরকারের পক্ষে গেলে তারা গ্রহণ করে, তা না হলে করে না। ৫ আগস্টের পর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে অনেক সমালোচনা আছে। যেমন মানুষ ভুয়া নিউজ ছড়ালে তার বিচার হবে, কিন্তু সাংবাদিক ভুয়া নিউজ ছড়ালে তার কী হবে। আমার মনে হয়, এখানে সাংবাদিকদের একটি সেলফ রিয়েলাইজেশন দরকার। একটি স্যরি বলেও পুনর্মিলনের কাজ শুরু হতে পারে।’

জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগে মতপ্রকাশের কারণে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন, সাইবার সুরক্ষা আইনের মাধ্যমে গ্রেফতার না করে সরাসরি মানহানির মামলা করছে। জাতীয় যুবশক্তির ঠাকুরগাঁও জেলার যুগ্ম সদস্যসচিবকে বর্তমান মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে মন্তব্য করার কারণে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি, সেখানে বিচারক ভয়ে আছেন, যদি তাকে জামিন দেওয়ার কারণে তিনি কোনো রোষানলে পড়েন। এগুলোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্যোগ দরকার। যেটি আমরা দেখতে পাচ্ছি না।’

সাংবাদিক জায়মা ইসলাম বলেন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনে একটি স্বাধীন মিডিয়া কমিশনের কথা বলা ছিল। যেখানে কোনো সাংবাদিক যদি অফিস থেকে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েন, তাহলে অভিযোগ দিতে পারতেন। যদি কোনো জনগণ অসৎ সাংবাদিকতার শিকার হন, তিনিও সুবিচার চাইতে পারতেন। কিন্তু এটি খসড়া আইন হওয়ার পর আর আলোর মুখ দেখেনি।

এনএস/একিউএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।