১০ ডিসেম্বর ঘিরে দুই দলে উত্তেজনা, জনমনে উদ্বেগ

সালাহ উদ্দিন জসিম
সালাহ উদ্দিন জসিম সালাহ উদ্দিন জসিম , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৫৭ এএম, ০১ ডিসেম্বর ২০২২

১০ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকায় বিভাগীয় সমাবেশ করতে চায় বিএনপি। দলটি এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নয়াপল্টনে কর্মসূচি করার অনুমতি চেয়ে আবেদনও করেছে। নয়াপল্টনের পরিবর্তে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়ে এবং মিছিল নিয়ে না যাওয়াসহ ২৬ শর্তে অনুমতি দিয়েছে ডিএমপি। অবশ্য বিএনপি নয়াপল্টনে সমাবেশ করার ব্যাপারে অনড়।

এছাড়াও বিএনপির সমাবেশ ঘিরে এরইমধ্যে মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা ৯ ডিসেম্বর বায়তুল মোকররমের দক্ষিণ গেটে সমাবেশ করবে। ১০ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ঘোষিত কর্মসূচি নেই। তবে তাদের সতর্ক অবস্থান থাকবে। পাড়া-মহল্লায় তারা শক্ত অবস্থান নেবে। ঢাকার প্রবেশ দ্বারেও থাকবে মহড়া।

আরও পড়ুন: সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নয়, নয়াপল্টনে সমাবেশে অনড় বিএনপি

দুই দলের এই মুখোমুখি অবস্থায় সংঘাতের শঙ্কা করছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারা বলছেন, তারা সংঘাত চান না। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি করতে চান। তবে কেউ শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে সমুচিত জবাব দেবে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। এ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তারা বলছেন, সংঘাতের বিষয়টি অগ্রিম বলা যায় না। তবে প্রত্যেক দলকেই দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

‘১০ ডিসেম্বর কর্মসূচি দিয়েছে বিএনপি, আওয়ামী লীগও মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে, এতে সংঘাতের আশংকা করেন কি না?’ এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসির মামুন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সংঘাত হবে কি না, সেটা ভবিষ্যতের বিষয়, অগ্রিম বলা যাবে না। তবে যে দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এবং বিপক্ষের দুটো শক্তিই আছে, সেখানে দ্বন্দ্ব সংঘাত স্বাভাবিক ব্যাপার।’

আরও পড়ুন: নয়াপল্টনে কোন মতলবে সমাবেশ করতে চায় বিএনপি: কাদের

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, এরই মধ্যে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা তার নেতাকর্মীদের বলেছেন, তাদের (বিএনপি) সমাবেশে যেন কোনো বাধার সৃষ্টি না করা হয়। আমার মনে হয় না যে, এরপর আর সংঘাতের কারণ আছে।

সব দলকে সভা-সমাবেশের ক্ষেত্রে সড়ক পরিহারের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, রাস্তায় সমাবেশ করলে জনভোগান্তি বাড়ে। কোনো দলেরই উচিত না সড়কে/রাজপথে বড় ধরনের সমাবেশ করা। ছোটখাটো সমাবেশ রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে হতে পারে। যে ধরনের সমাবেশের চিন্তা বিএনপি করছে বা যে ধরনের সমাবেশগুলো আওয়ামী লীগ করে, তাদের পক্ষে খোলা ময়দান ছাড়া সমাবেশ করা ঠিক হয় না।

আরও পড়ুন: সমাবেশে খালেদা যোগ দিলে আদালত ব্যবস্থা নেবেন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ঢাবির এ অধ্যাপক বলেন, আমরা অতীতেও দেখেছি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যখন রাজপথে সমাবেশ করে পুরো শহর অচল হয়ে যায়। সেটা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা জরুরি। ১০ ডিসেম্বর যেহেতু সরকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুমতি দিয়েছে, এখন বিএনপি যদি রাজপথ ছেড়ে উদ্যানে যায় এবং সব রাজনৈতিক দলই যদি এ সিদ্ধান্ত নেয় আর কোনো সভা-সমাবেশ রাজপথে করবে না। যত সমাবেশ হবে মুক্ত ময়দানে/খোলা মাঠে বা বিভিন্ন মিলনায়তনে। এটা হবে উত্তম পদ্ধতি। এটা এক সময়ে সরকারের নিয়মও করা হয়েছিল। কিন্তু নিয়মটা অনেক রাজনৈতিক দলই অনুসরণ করছে না।

তিনি বলেন, আমরা সাধারণ নাগরিক হিসেবে নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে চাই, শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে চাই। এখানে সংঘাত-সংঘর্ষ-সন্ত্রাসও চাই না, রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু সমাবেশের কারণে বসে থাকতে চাই না। এমনিতেই ঢাকা শহরে চলাফেরা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছি। এর মধ্যে যদি কোনো জায়গায় সমাবেশ হয়, শুধু বিএনপি নয়, যেকোনো দলই যদি রাস্তায় সমাবেশ করে তাহলে সার্বিকভাবে পুরো ঢাকা শহর অচল হয়ে যায়। আমরা আশা করি, সব রাজনৈতিক দল দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

সংঘাতে জড়ালে সমুচিত জবাব দেবে আওয়ামী লীগ

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন, বিএনপির ১০ ডিসেম্বরের সমাবেশে সরকার কোনো বাধা দেবে না। বিএনপির সমাবেশের ধারে কাছেও যাবে না আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তবে আগুন ও লাঠি নিয়ে খেলতে এলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সমুচিত জবাব দেওয়া হবে। তখন আমাদের নেতাকর্মীরা ললিপপ চুষবে না।

আরও পড়ুন: বিএনপিকে ২৬ শর্তে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণসমাবেশের অনুমতি

বিএনপির কর্মসূচিতে সরকারের আপত্তি নেই জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, ‘আন্দোলন করেন, মিছিল করেন, মিটিং করেন, কোনো আপত্তি নেই। তবে একজন মানুষের ওপরও আক্রমণ হলে একটাকেও ছাড়বো না। মানুষের ওপর হামলা হলে সহ্য করবো না।’

নয়াপল্টনেই সমাবেশ করতে চায় বিএনপি-ফাইল ছবি

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন জাগো নিউজকে বলেন, ‘গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং বর্তমান দুর্যোগময় বিশ্ব পরিস্থিতিতে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সব প্রকার সংঘাত এড়িয়ে চলবে। বিএনপি-জামায়াত বা যে কেউ কোনো ধরনের সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করলে রাষ্ট্র আইনানুগ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

শান্তিপূর্ণ সমাবেশের জন্য ‘নয়াপল্টন’ চায় বিএনপি

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকার বলে তারা সংবিধান মতো চলে। সংবিধান আমাদের অধিকার দিয়েছে। আমরা কর্মসূচি করবো। পুলিশের অনুমতির বিষয়টি সংবিধানে নেই। ডিএমপির নিজস্ব আইনে মাইক ব্যবহার করার অনুমতির বিধান যুক্ত করছে। আমরা সে অনুমতিও চেয়েছি। সংঘাত এড়াতে হলে আমাদের সেভাবেই অনুমতি তাদের দেওয়া উচিত, যাতে সংঘাত না হয়।’

আরও পড়ুন: বিএনপির উদ্দেশ্য গন্ডগোল বাধানো: তথ্যমন্ত্রী

তিনি বলেন, ‘আমরা তো বেশিরভাগ সময়ই পার্টি অফিসের সামনে অনুমতি নিয়েই কর্মসূচি করে আসছি। এখনও সেখানেই বিএনপি অনুমতি চেয়েছে। কেন যে তারা এই অনুমতিবিমুখ হচ্ছে, এটা আমার বোধগম্য নয়।’

সোহরাওয়ার্দীতে সমাবেশের অনুমতি দিয়ে ২৬ শর্ত দিয়েছে ডিএমপি-ফাইল ছবি

বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্যসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করবো। এরই মধ্যে দলীয় কার্যালয়ের সামনে গণসমাবেশ করবো বলেই লিখিতভাবে ডিএমপি কমিশনার সাহেবকে অবহিত করেছি এবং আমাদের প্রতিনিধি দল সেখানে গিয়েছি। সেখানে ব্যাপক আলোচনা হওয়ার পর আরেকটা লিখিত দিয়েছি, সেখানেও বলা আছে- শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করার জন্য আমরা বিএনপি কার্যালয়ের সামনেই অনুমতি চাই।’

আরও পড়ুন: সময় সাড়ে ৪ ঘণ্টা, মিছিল নিয়ে সোহরাওয়ার্দীতে যাওয়া যাবে না

তিনি বলেন, ‘যেহেতু তাদের হীন উদ্দেশ্য আছে। তারা একটা কারসাজি করার চেষ্টা করছে। আমরা দেখছি, তাদের উদ্দেশ্য ভালো নয়। এখন পর্যন্ত চাচ্ছি- একটা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ হবে। এটা আমাদের দলগত সিদ্ধান্ত। কারণ এ সরকার শুধু ঢাকার ১০ তারিখের প্রোগ্রাম নয়, সারাদেশের সব বিভাগে এমন বাধার সৃষ্টি করেছে। তারপরও বিএনপি সেই প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে প্রত্যেকটা জায়গায় শান্তিপূর্ণভাবে প্রোগ্রাম শেষ করেছে। এটা বিএনপির ক্রেডিট, জনগণও এই ক্রেডিটের অংশ। জনগণই এই ক্রেডিটটা জাতির সামনে তুলে ধরেছে। সাধারণ মানুষ আমাদের যথেষ্ট আন্তরিকতা দেখিয়েছে, সহযোগিতা করেছে, আমাদের দাবিদাওয়ার বিষয়ে তারা একমত পোষণ করেছে। সুতরাং আগামী ১০ তারিখও আমরা সবাইকে সংযুক্ত করছি। সব চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেই ঢাকায় শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করবো, ইনশাআল্লাহ।’

এসইউজে/এসএইচএস/এএসএম

রাস্তায় সমাবেশ করলে জনভোগান্তি বাড়ে। কোনো দলেরই উচিত না সড়কে/রাজপথে বড় ধরনের সমাবেশ করা। ছোটখাটো সমাবেশ রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে হতে পারে। যে ধরনের সমাবেশের চিন্তা বিএনপি করছে বা যে ধরনের সমাবেশগুলো আওয়ামী লীগ করে, তাদের পক্ষে খোলা ময়দান ছাড়া সমাবেশ করা ঠিক হয় না

গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং বর্তমান দুর্যোগময় বিশ্ব পরিস্থিতিতে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সব প্রকার সংঘাত এড়িয়ে চলবে। বিএনপি-জামায়াত বা যে কেউ কোনো ধরনের সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করলে রাষ্ট্র আইনানুগ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে

সরকার বলে তারা সংবিধান মতো চলে। সংবিধান আমাদের অধিকার দিয়েছে। আমরা কর্মসূচি করবো। পুলিশের অনুমতির বিষয়টি সংবিধানে নেই। ডিএমপির নিজস্ব আইনে মাইক ব্যবহার করার অনুমতির বিধান যুক্ত করছে। আমরা সে অনুমতিও চেয়েছি। সংঘাত এড়াতে হলে আমাদের সেভাবেই অনুমতি তাদের দেওয়া উচিত, যাতে সংঘাত না হয়

যেহেতু তাদের হীন উদ্দেশ্য আছে। তারা একটা কারসাজি করার চেষ্টা করছে। আমরা দেখছি, তাদের উদ্দেশ্য ভালো নয়। এখন পর্যন্ত চাচ্ছি- একটা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ হবে। এটা আমাদের দলগত সিদ্ধান্ত। কারণ এ সরকার শুধু ঢাকার ১০ তারিখের প্রোগ্রাম নয়, সারাদেশের সব বিভাগে এমন বাধার সৃষ্টি করেছে। তারপরও বিএনপি সেই প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে প্রত্যেকটা জায়গায় শান্তিপূর্ণভাবে প্রোগ্রাম শেষ করেছে। এটা বিএনপির ক্রেডিট, জনগণও এই ক্রেডিটের অংশ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।